সাহিত্যবিশারদকে লেখা দু’টি চিঠি

প্রমথ চৌধুরী ও মোতাহের হোসেন চৌধুরী

সসম্মাননিবেদন

দেশের এই ঘোরতর দুর্দ্দিনে নিম্নলিখিতপ্রশ্ন সম্বন্ধে আপনার মতামত ভাণ্ডারে প্রকাশ করিলে বিশেষ বাধিত হইব। ইহা বৈশাখ মাসের মধ্যে ভাণ্ডারে কার্য্যালয়ে পৌছা অবশ্যক। যতশীঘ্র সম্ভব এই প্রশ্নের মীমাংসা প্রার্থনীয়।

বিনয়াবনত

শ্রী প্রমথ নাথ চৌধুরী
সহ: সম্পাদক

প্রশ্ন-সম্প্রতি বঙ্গদেশে হিন্দু মুসলমানে যে সংঘাতউপসি’ত হইয়াছে তাহার প্রতিকারের উপায় কি ?

দারোগাবাড়ী
কুমিল্লা
১৭/৯/৩৫
শ্রদ্ধাস্পদেষু

আপনার চিঠিখানা যথাসময়ে আমার হস্তগত হয়েছিল। কিন’ আমার উপর নানা কাজ ন্যাস্ত থাকায় বিশেষ ক’রে আমার মানসিক অশান্তির দরুণ চিঠির উত্তর দিতে বিশ্রীরকম দেরী হয়ে গেল, ক্ষমা করবেন। আপনি ঠিকই বলেছেনঃ আমি আপনার ভক্ত। এই যুগে যে-কয়েকটি আলোকাভিসারীর নাম মনে জাগে আপনি তাঁদের অন্যতম। আপনি অত্যন্ত সহজ ভাবেই বুঝেছিলেন, আরব তুরাগ-মিশর-ইরানের গৌরবকীর্ত্তনে আমাদের মুক্তি নেই, বরং জড়ত্ব ও অহংকারের রজ্জুতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে তা আমাদের মৃত্যুকে অনিবার্য্য করে তুলবে। তাই আপনি মুসলমান রচিত বাংলা সাহিত্যের আপনার দৃষ্টি নিবন্ধ করুন এবং যেদিকে দাবিধার [?] ন্যায় কঠোর সাধনায় ব্রতী হন। ফাঁকি দিয়ে জীবন কাটানোতে আনন্দ নেই, জীবনে লাবণ্য ফোটাতে হলে সাধনার প্রয়োজন, অতীত যুগে যে অল্প কতিপয় সাধক একথা সম্যক রূপে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন, সেই সব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আপনিই আজ পর্য্যন্ত জীবিত। তাই আপনার চরণে তরুণ মাত্রেরই শ্রদ্ধা নিবেদিত থাকবে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নাই।

আপনার ’আরকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’ আমার অনুরোধে স্কুলে রাখা হয়েছে। কুমিল্লা কলেজে ঈশ্বর পাঠশালাতে পাঠাতে পারেন। উক্ত কলেজ ও স্কুলের কর্ত্তৃপক্ষের অনুরোধে গ্রন’াগারে রাখা যাবে। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কেউই রাখবার নেই। মুসলমান সমাজে সাহিত্য আর সাহিত্যিকের কোন কদরই নেই। এত বড়ো গরষরঃরহব [?] সমাজ করে কিনা সন্দেহ।

যাক, আমি বইখানার কিয়দংশ পূর্ব্বেই পত্রিকায় পেয়েছি। আমার কাছে বেশ ভালোই লেগেছিল। অবশ্যই সম্পূর্ণ না পড়ে মতামত দেওয়া অন্যায়; তাই বর্ত্তমানে চুপ করে যেতে হল। কোনো ফাঁকে সম্পূর্ণ পড়ে ফেলবার চেষ্টা করব। সমালোচনা করা যাবে। আমি এক প্রকার শারীরিক ভালই, মানসিক জড়ত্ব নেই, আপনার মঙ্গল কামনা করি।

বিনীত মোতাহের হোসেন

সূত্র : নেহাল করিম সম্পাদিত আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদকে লেখা নির্বাচিত পত্রাবলি
(ঢাকা : আলোকপাত প্রকাশন, ২০১৮)