ভারতে টাটা গ্রুপের সম্মেলনে ড. ইউনূস

সামাজিক ব্যবসা এখন টেকসই পথ দেখাচ্ছে

ভারতে টাটা গ্রুপের সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ভারতে টাটা গ্রুপের সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের ভুবনেশ্বরে ‘টাটা সাসটেইন্যাবিলিটি কনক্লাভ অন ফিউচার-প্রুফ বিজনেস’ শীর্ষক টাটার এক সম্মেলন ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে ২৪০টি টাটা কোম্পানির প্রধান নির্বাহীগণ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোন ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কথা বলছি? আমরা কি সেই ভবিষ্যতের সাথে খাপ খাওয়াতে নিজেদেরকে প্রস’ত করবো যা এমন সব শক্তি দিয়ে তৈরি যার উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, নাকি আমাদের প্রয়োজন মাফিক একটি ভবিষ্যৎ আমরা নিজেরাই তৈরি করে নেবো? আসল প্রশ্নটি হলো- কী ধরনের ভবিষ্যৎ আমরা চাই এবং সেটা আমরা কীভাবে তৈরি করবো?
দরিদ্র মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কীভাবে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন সে কাহিনী তিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের কাছে বর্ণনা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময়ে তিনি কীভাবে দুর্ভিক্ষ, যুগ যুগ ধরে চলে আসা মহাজনী প্রথা, দুর্বল স্বাস’্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব ইত্যাদি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি সেসব বিষয়ে বলেন।
যখন তিনি দেখতে পেলেন যে, প্রথাগত অর্থনৈতিক তত্ত্ব যা তিনি ক্লাশরুমে পড়াচ্ছিলেন এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস’া কোনটিই কোন কাজে আসছিল না, তিনি তখন দরিদ্র মানুষদেরকে তাঁর নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ঋণ দেবার অপ্রচলিত পথে পা বাড়ালেন। এ থেকেই সৃষ্টি হলো একটি নতুন ব্যাংকের যা এখন গ্রামীণ ব্যাংক নামে সুপরিচিত।
এ থেকে সৃষ্টি হলো আরো কিছুর- স্যানিটেশন, স্বাস’্যসেবা, পুষ্টি এবং আরো অনেক সমস্যার সমাধান। প্রতিটি সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি সৃষ্টি করলেন একটি নতুন ধরনের ব্যবসা- সামাজিক ব্যবসা। সামাজিক ব্যবসার এই তত্ত্ব সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে। সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবসা, ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়।
এই তত্ত্ব এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। মুনাফা জমিয়ে তা পরহিতকর কাজে ব্যবহার করার পরিবর্তে সামাজিক ব্যবসা এখন একটি নতুন, টেকসই পথ দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, টাকা কামানোয় সুখ আছে, কিন’ অন্য মানুষকে সুখী করা পরম সুখের।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, অন্যের জন্য কাজ করতে মানুষ জন্ম নেয় না। প্রতিটি মানুষই জন্মগতভাবে একজন উদ্যোক্তা। চাকরি খোঁজার জন্য নয় বরং কাজ সৃষ্টি করতেই মানুষের জন্ম।
তিনি বলেন, আমাদের উচিত তরুণদেরকে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করা। প্রতিটি মানুষই যাতে তার নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারে সেজন্য উপযুক্ত ইকো-সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। একটি যথাযথ আর্থিক কাঠামো এই ইকো-সিস্টেমের একটি অপরিহার্য অংশ হতে হবে।
এর ফলে স্বল্প থেকে স্বল্পতর কিছু মানুষের হাতে পৃথিবীর সম্পদ কেন্দ্রীভূত হবার ভয়ংকর প্রবণতাটিও উল্টে যাবে। বর্তমান ব্যবস’াটি সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে বাধ্য। পৃথিবীর সব সম্পদ চুষে সম্পদ পিরামিডের শীর্ষে থাকা গুটিকয়েক ব্যক্তির কাছে কেন্দ্রীভূত হবার বর্তমান প্রবণতাটি লক্ষ লক্ষ উদ্যোক্তার ব্যবসাগুলো রুখে দেবে।
সামাজিক ব্যবসা তহবিল সৃষ্টি ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সামাজিক ব্যবসা চালুতে সহায়তা করে বিভিন্ন ব্যক্তি, কোম্পানি ও অন্যরা এখন সামাজিক ব্যবসায়ে আরো বেশী আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রফেসর ইউনূস পৃথিবীজুড়ে এর বেশ কয়েকটি উদাহরণ দেন। বহু খ্যাতনামা বিজনেস স্কুল এখন সামাজিক ব্যবসা পড়াচ্ছে এবং তরুণদের মধ্যে এ বিষয়ে প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
প্রফেসর ইউনূস মনে করেন যে, এই ধরনের কর্ম ও আগ্রহ থেকেই তাঁর তিনটি বৈশ্বিক লক্ষ্য- অর্থাৎ শূন্য দারিদ্র, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নীট কার্বন নিঃস্বরণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
তাঁর বক্তৃতার পর ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। সামাজিক ব্যবসায়ে জড়িত হবার জন্য প্রফেসর ইউনূস টাটা গ্রুপের কোম্পানিদের ধন্যবাদ জানান। বিজ্ঞপ্তি

আপনার মন্তব্য লিখুন