সাপ্লেকা গাড়ি

আখতারুল ইসলাম
Roborace_Perspective_Gree

টিনা বিশাল একটি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটির একটা অংশে স্বচ্ছ সিসার তৈরি একটা বড় আয়না আছে। অনেকটা মনিটরের মতো। টিনা নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে। অন্য অংশে দুজন করে দু’পাশে মোট চারজন তার অনুসারী ক্লোন মানব টিনার নির্দেশ মত গবেষণা কাজে কম্পিউটারসহ নির্দেশিত যন্ত্রে কাজ করছে। টিনা একটি অর্ধ্বস্বচ্ছ নিওপলিমার কাপড় জড়ানো আয়নার সামনে এলুমিনিয়ামের তৈরি বিশেষ চেয়ারে বসতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে ক্রিং করে একটা শব্দ হলো এবং তার সামনের আয়নায় ভেসে ওঠল একটা সার্কিট। সার্কিট এর ঠিক মাঝখানে একটা লাল বাতি জ্বলছে এবং ক্রিং ক্রিং শব্দ হচ্ছে। টিনা দ্রুত চেয়ারে বসে রিমোট হাতে নিয়ে ক্লোন মানবের দ্বিতীয় জন মিস্টার নিউ আইনস্টাইনকে নির্দেশ দিল ইঞ্জিন প্রজেক্টর এর রান বাটনে ক্লিক করে সমস্যা দেখে দ্রুত তাকে জানাতে। ঠিক এক সেকেন্ড পরে নিউ আইনস্টাইন ডিটেল টিনাকে জানালো। টিনা দেখলো একটা সমীকরণিক ভুল ছিল যা নিউ আইনস্টাইনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। টিনা রিমোট নিয়ে ক্লোন মানবের প্রথম বিজ্ঞানী নিউ নিউটনকে সমস্যা সমাধান করতে বলে।
টিনা, পুরো নাম ডি এল টিনা চার জনের ক্লোন বিজ্ঞানীর দলের প্রধান, তারা একটা ইঞ্জিন প্রজেক্ট এ হাত দিয়েছে দীর্ঘ এক বছর কাজটি প্রায় শেষ পর্যায়ে। টিনার তৈরি করা ক্লোন মানবের চতুর্থ পর্যায়ে নিউ চার্লস ব্যাভেজ আছে। টিনা চিন্তা করলো পৃথিবীর সেরা সেরা বিজ্ঞানীরা যা দিয়েছে, মৃত্যুর পর তাদের কাছ থেকে নতুন কোন গবেষণা আসছে না। টিনা তাদের পরবর্তী বংশধরদের কোষ হতে বিশেষ নিষেক বা ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় শ্রেষ্ঠ চারজন বিজ্ঞানী তৈরি করে যারা ৯০% পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের অনুরূপ। ফলে এই সব নিউ বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্ক থেকে টিনার হাতে মোটর ইঞ্জিন প্রজেক্টর সুনিপুণভাবে তৈরি করা সম্ভব হবে।
টিনাকে নিউ নিউটন সবুজ সংকেত পাঠালো। কাজটি হয়েছে। টিনা উচ্ছ্বসিত, টিনা উঠে পুনরুজ্জীবন কক্ষে গেল। নিউ আইনস্টাইন এর শরীরের সব জীর্ণ কোষগুলো বদলে দিয়ে, মস্তিষ্কের নিউরন সেলেও কিছুটা পরিবর্তন আনলো, দেখা গেল নিউ আইনস্টাইন ভালো কাজ করছে, পুনরুজ্জীবন ঘর থেকে বের হবার পর নিজেকে অনেক হাল্‌কা বোধ করছে টিনা। টিনার প্রজেক্ট হল-
“অনেকদিন টিনা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে দেখলো, গাড়ি দুর্ঘটনাজনিত কারণে অনেক লোকের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। লঞ্চ ডুবে শত শত অসহায় মানুষ মারা যাচ্ছে। বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে মারা যাচ্ছে। টিনা চিন্তা করলো এসব থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দিতে চাই সমন্বিত প্রচেষ্টা, ডি. এল. টিনা ও তার দল কাজ করছে গাড়ি, জাহাজ, বিমান এর ইঞ্জিনের সমন্বয় করে এমন একটি যান আবিষ্কার করতে যা পানিতে চলবে, ঘূর্ণিঝড়, টর্ণেডো, জলোচ্ছ্বাসেও সেই যানটি ডুববে না, ধ্বংসও হবে না এমন কি এর কোন যাত্রীর ক্ষতি হবে না। সেই যানটি পানিতে চলার পাশাপাশি চলবে স্থলভাগে গাড়ির মতো কোন দুর্ঘটনার পূর্বে সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে তা উড়ার প্লেনের মত কাজ করতে পারবে, এমনকি যদি কোন যানযট সৃষ্টি হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে না থেকে দ্রুত গতিতে চাকার নিচ অংশগুলো ধীরে ধীরে প্লেট হয়ে পাখার মত ঘুরবে যা টারবাইনের মতো কাজ করবে। ঘুরতে ঘুরতে নিজ অবস্থান থেকে উপরের দিকে উঠে শুন্যে বা হাওয়ায় ভেসে উড়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে সক্ষম হবে এবং বিমানের মতো ওই ইঞ্জিনের যাত্রী বহন করে উড়তে পারবে। ইচ্ছে করলে যখন-তখন যত্র তত্র যে কোন স্থানে ল্যান্ড করতে পারবে।
অর্থাৎ এমন একটি যানবাহন আবিষ্কার করবে, যা নতুন পৃথিবীর পরিবর্তিত পরিবেশে যে কোন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। টিনা যে কাজ করতে বিভিন্ন সার্কিট ও ইঞ্জিনের সমন্বয় করছে তা নিউ নিউটনকে বলল ইঞ্জিনের সমন্বয়ে যে সার্কিট ড্রায়াগ্রাম তৈরি করা হয়েছে তাতে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে। নিউ নিউটন, নিউ ব্যাভেজ সহ অ্যাডজাস্টেবল ভোল্টেজ রেগুলেটেড পাওয়ার সাপ্লাই থেকে ৫ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ ঠঙঈ আউটপুট ও ৫ কোটি সঅু সন্নিবেশ করে যন্ত্রটি চলাচলে উপযোগী হতে যাচ্ছে, এমন তত্ত্ব টিনাকে দিল।
টিনা বলল, এটা সাধারণ গাড়ির যন্ত্র হবে। লক্ষ্য অর্জিত হবে না এতে আউটপুট কারেন্ট ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইঞ্জিন কোড ও স্টেপ ডাউন ট্রান্সফরমার ব্রিজ রেকাটিফারের সিলিকন ও লোহার কানেকশন দিন। নিউ আইনস্টাইন এসে বলল, আমার আবিষ্কৃত ঊ = সপ২ সূত্র ব্যবহারে অনেক কিছু সমাধান করা সম্ভব, পদার্থের ভরকে আলোর বেগের বর্গ দ্বারা গুণ করলে যে শক্তি পাওয়া যায় সেটাই হল ঐ পরিমাণ পদার্থের আবদ্ধ শক্তি। আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কোটি মিটার (১,৮৬,০০০ মাইল)। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ শক্তি আছে।
ব্যাভেজ বলল, না তোমার এই সূত্র এখানে প্রয়োগ করা যাবে না, আমরা কম্পিউটার ব্যবহৃত শক্তি ব্যবহার করব, টিনা, আগের বিজ্ঞানীদের এমন কথাবার্তায় শুকনো এক ধরনের হাসি দিয়ে বলল! থাক! যথেষ্ট হয়েছে। এবার কাজের কথায় আসা যাক।
ওপ, খস, ওঘ ইত্যাদি নতুন পদ্ধতি সংযোজন করে বার্বুরেটেড ইঞ্জিন, ফুয়েল ইঞ্জেকটেড ইঞ্জিন দিয়ে চক্রায়মানের সাহায্যে গাড়ি স্থলে, জলে ও আকাশে উড়বে।
সাথে জাম্বো জেট, ডিসি টেন ও কনকর্ড এই ধরনের বিমানের প্রযুক্তি অবকাঠামোর সমন্বয় করুন। সাথে অ্যাসবেসটস লাগানো হয় যা আগুনে পোড়ে না, অম্ল ও ক্ষার ক্ষতি করতে পারে না, ৫,০০,০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেও পুড়েনা। টিনা সাথে সাবমেরনি ব্যবহারের ইস্পাতের নিশ্ছিদ্র চেম্বার। সেখানে তেল ও গ্যাস চালিত ইঞ্জিনের সাথে রিসারগামকে ডোবানো, ভাসানো ও চলাচলের পরিকল্পনা করে, চার্জেস বিহীন উৎপাদন পদ্ধতি, যার ভিতরটাকে ৮০০০ সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত উষ্ণ করে তোলা যেতো। এছাড়া এতে পারমাণবিক শক্তিচালিত, পদ্ধতি ও রোবট চালিত বস্তুগুলোর সমন্বয় করে।
ধীরে ধীরে ডায়াগ্রামটি সম্পূর্ণ করে, শসার আকৃতি নতুন মহাযান সাপ্লেকা নামক গাড়ি তৈরি করে, সা হল সাবমেরিন, প্লে হল প্লেন, কা হল কার এর সমন্বয়ে যে গাড়ি এসবের কাজ করবে তার যথার্থ নাম দেয়া হয় সাপ্লেকা।
টিনা নিউ আইনস্টাইনকে চালানোর দায়িত্ব দিলেন, যাত্রী হিসেবে নিউ নিউটন, নিউ ব্যাভেজ ও নিউ মাদামকুরি থাকবে, সব ঠিকঠাক আছে, টিনা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ডিভাইসগুলো ভালো করে পরীক্ষা করে সর্বশেষ দেখে নিল, নিউ আইনস্টাইন ওঠে বসলেন, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪ টা সিলেটের এক বিখ্যাত স্থান হতে যাত্রা করবে।
টিনা হলুদ বাটন টিপ দিল, স্টার্ট দিল নিউ আইনস্টাইন কিছু পিচঢালা রাস্তায় চলল, তার পর টিনা সবুজ বাটন টিপল, সাথে সাথে নিউ আইনস্টাইন গিয়ার পরিবর্তন করে ওড়ার জন্য সাপ্লেকা’র ঢাকনাগুলো ভেতরে চ্যাপ্টা হয়ে প্লেনের পাখার মত তিনটি পাখা ঘুরতে ঘুরতে উপরে আকাশে উড়লো, উড়তে উড়তে পাখির মত উড়েই চলছে, ১০ মি. এসে পৌঁছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে, টিনা আবার হলুদ বাটন টিপে সাথে সাথে গাড়ি হিসাবে চলল, টিনা দেখল সব ঠিক আছে এবার নীলবাটন টিপতে গাড়িটি সাবমেরিন জাহাজের মত বঙ্গোপসাগরের নীল জলে ঘুরে বেড়ায়, ডুব দেয় ভেসে ওঠে। টিনা খুশিতে আত্মহারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে।