আমিরাতে ভিসা বন্ধের ছয় বছর

সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিতে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের ভিড়

কামরুল হাসান জনি, ইউএই

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা অভ্যন্তরীণ কারণ দেখিয়ে সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয় ২০১২ সালের আগস্ট মাসে। নতুন ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া বন্ধের সাথে সাথে বন্ধ রাখা হয় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্যে অভ্যন্তরীণ মালিক পরিবর্তন তথা ভিসা ট্রান্সফার প্রক্রিয়াও। হিসাবের খাতায় প্রায় ছয় বছর কেটে গেছে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার। এর মাঝে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-আমলা আমিরাত সফর ভিসা খোলার স্বপ্ন দেখায় প্রবাসীদের। বাস্তবে সেই আশার পূর্ণতা পায়নি। যদিও চলতি বছর কূটনৈতিক তরফ থেকে প্রাইভেট সেক্টরে ১৯ ক্যাটাগরি এবং ডাক্তার-প্রকৌশলীসহ পেশাজীবীদের ভিসা খোলার বিবৃতি প্রকাশ করে। কিন্তু গৃহকর্মী, গাড়ি চালক ও ব্যবসায়িক পার্টনার ছাড়া অন্যকোনো ভিসা না হওয়ার অভিযোগ প্রবাসীদের। এমনকি প্রকৌশলীদের খোলা ভিসার বিবৃতিরও কার্যকর নেই বলে দাবি করেন আমিরাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা। তবে ভিজিট ভিসা সহজীকরণে অনেক বাংলাদেশিরা আমিরাতে প্রবেশের সুযোগ পান। যাদের অধিকাংশই বর্তমানে অবৈধ তালিকায়। পাশাপাশি ভিসা বন্ধের দীর্ঘসূত্রিতায় কর্মক্ষেত্রে নানা জটিলতার পরও মালিক পরিবর্তন করতে না পেরে অবৈধ হয়েছে অনেক শ্রমিক।

এদিকে আরব আমিরাত সরকার অবৈধ অভিবাসীদের জেল-জরিমানা ব্যতিত বৈধ হওয়া ও দেশ ত্যাগের জন্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। ১ আগস্ট থেকে ঘোষিত এই সাধারণ ক্ষমার কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। বেঁধে দেয়া এই তিনমাস সময়ের মধ্যে অবৈধ অভিবাসীরা স্ট্যাটাস বদল করে বৈধ হতেই এখন তৎপর। প্রতিদিন হাজার হাজার অবৈধ প্রবাসী ভিড় করছে আবুধাবিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটে। এদের অধিকাংশই নতুন পাসপোর্ট প্রত্যাশী। নতুন পাসপোর্ট নিয়ে বৈধতা নিশ্চিত করতেই এখন যুদ্ধ তাদের। ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার খরতাপে লাইনে দাঁড়িয়ে তথ্য সেবা নিতেই লেগে যাচ্ছে দিনের পুরোটা সময়। কেউ কেউ লাইন শেষ করে কাউন্টারে এলেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ তুলছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত এই দুটি প্রতিষ্ঠান। তবে নিয়মিত কার্যক্রমসহ সকাল সাতটা থেকে রাত আট পর্যন্ত টানা কাজ করে যাচ্ছেন কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমনটাই জানান দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল এস বদিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি চাই অবৈধ প্রবাসীরা আমিরাতের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বৈধতা নিয়ে আবার কাজ শুরু করুক। এতে করে নিজের পরিবারের যেমন লাভ হবে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও হবে। আর যারা জরিমানা মওকুফ করে দেশের ফিরতে চান তাদের জন্যে স্বল্প খরচে আউটপাসেরও ব্যবস্থা করছি আমরা।’ দূতাবাস ও কনস্যুলেটে ভিড় করা অবৈধ প্রবাসীদের অনেকেরই পাসপোর্ট তামিম (মালিক থেকে পলাতক) করা বলে জানান এস বদিরুজ্জামান। যাদের পাসপোর্ট তামিম রয়েছে, তারা প্রথমে স্থানীয় ইমেগ্রেশন থেকে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে এরপর দূতাবাস ও কনস্যুলেটে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

নতুন পাসপোর্ট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাদ্ধতার রয়েছে বলে জানান দুবাই কনস্যুলেটের প্রথম সচিব (পাসপোর্ট ও ভিসা) নুর-এ-মাহবুবা জয়া। সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০০৬ সাল বা এর পূর্বের পাসপোর্টধারীদের নতুন পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ না করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাসপোর্ট দেয়া মানেই একটি দেশের নাগরিকত্ব দিয়ে দেয়া। ১০ বছর এর অধিক পুরনো পাসপোর্টধারীদের ক্ষেত্রে দেশে পুলিশ ভেরিফিকেশনের একটি ব্যাপার রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সত্যতা প্রমাণ করতে মা-বাবার জাতীয় পরিচয় পত্র জমা দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ওইসব অবৈধ প্রবাসীরা এখানে ভিসা নিয়ে বৈধতা নেয়ার উপযুক্ত কিনা সেটিও বিবেচনা করে দেখা হচ্ছে।’ তবে ১২ বছরের অধিক পুরনো পাসপোর্ট দেয়া হচ্ছে না বলে সরাসরি জানান আবুধাবি দূতাবাসে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ডা. মুহাম্মদ ইমারন।

অন্যদিকে, সাধারণ ক্ষমাকে কেন্দ্র করে কমিউনিটির সচেতন মহলকে দূতাবাস ও কনস্যুলেটে প্রবাসীদের বিভিন্নভাবে সেবা দিতে দেখা গেছে। বিশেষ করে তথ্য সেবা দিয়ে সময়ের দূরত্ব কামানোর চেষ্টা করছেন তারা। কমিউনিটির সচেতন মহল মনে করেন, যেহেতু জেল ও জরিমানা সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে, সেহেতু সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের আউটপাস নিয়ে সরাসরি দেশে চলে যাওয়া উচিত। তারা জানান, ‘একটি পাসপোর্ট সম্পূর্ণরূপে তৈরি প্রক্রিয়া শেষে প্রবাসীদের হাতে আসতে সময় লাগবে দেড় মাস বা এরও অধিক। আবার এরই মধ্যে ঈদ ও নানা সরকারি ছুটিতে চলে যাবে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রায় এক মাস। পরবর্তী সময়গুলোতে নিজেদের বৈধতা নেয়াটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে তাদের। বৈধ না হতে পারলে আবার মুখোমুখি হতে হবে জেল-জরিমানা ও শাস্তির।’ তারা অভিমত প্রকাশ করে বলেন, হয়ত সাধারণ ক্ষমা গ্রহণ করে অবৈধ প্রবাসীরা বৈধ হলে অথবা দেশে ফেরত গেলেই বাংলাদেশের জন্যে শ্রমিক ভিসা খোলার ব্যাপারটিও বিবেচনায় রাখতে পারে আমিরাত সরকার।