সাজেক যেন মেঘ পাহাড়ের পথ

হাদিরাতুল তালুকদার
Untitled-1

চেকপোস্টের কাছাকাছি হতেই নামতে হল। পরিচয় পেশা নাম ঠিকানা আগমনের কারণ জানতে চাওয়া হল। এসব বলে যখন রওনা হলাম তখন বেলা প্রায় সাড়ে প্রায় এগারোটা বাজে। তারপর তো বাহন মহেন্দ্র অটোরিকশা আমাকে আর বুশরাকে নিয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলা শুরু করল তার দূরন্ত গতিতে।
এবার শুধু দেখার পালা। চলছি আর দেখছি, কত সুন্দর এই দেশ আমার। কত চড়াই উৎরাই আর সবুজ বাঁশবন দেখে দেখে এগিয়ে চলা। ওহহো, কোথায় যাচ্ছি তাই তো বলা হয়নি। আমরা দু-বোন মিলে সাজেক যাচ্ছি। বহুদিন ধরে সাজেক নামে গন্তব্যটি মনের মধ্যে লালিত ছিল। তাই গত বছরের শেষ মাসে শেষ দুদিন আগে আমি আর বুশরা শান্তি পরিবহনের বাসে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পরদিন সকাল আটটায় দিঘিনালা পৌঁছি।
সেখানে নেমেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। ততক্ষণে মফিজ ভাই আমাদের জন্য মহেন্দ্র নিয়ে চলে এসেছেন। তার সঙ্গে কথা বলে অটোতে উঠে দিঘিনালার এক আদিবাসি হোটেলে নাস্তা সেরে যাত্রা শুরু করতে করতে দশটা বেজে যায়।
সেদিন শনিবার হাঁটবার থাকায় যাত্রা আগে হাটটাও ঘুরে দেখে নেই। তারপরই চেকপোস্ট পার হয়ে বাঘাইহাটের পথ ধরে ছুটে চলা। এক সময় মাইনি নদী পার হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে নেই মাসালং ও কাসালং নদী দুটো। মাইনি নদী দেখে আফসোস হয়, মাসালং নদীতে অল্প জল। এভাবেই পথ থেকে পথে এগিয়ে ঠিক সাড়ে তিন ঘণ্টা পর আমাদের বাহন সাজেকের রুইলুই পাড়া পৌঁছে। শেষ পর্যন্ত সাজেক চলেই এলাম বলে বুশরা মহেন্দ্র থেকে নেমে পা রাখে রুইলুই পাড়ার মাটিতে। তবে আমরা রুইলুই পাড়ায় থাকবো না আগেই ঠিক হয়ে ছিল। এখানে রাস্তার ধারের এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে আবার মহেন্দ্রতে চাপি। সেখান থেকে কংলাকপাড়া অল্প সময়ের গন্তব্য। কোনো এক লেখায় পড়েছিলাম রুইলুই পাড়াই সাজেকের প্রাণ। সেই প্রাণকেন্দ্র ধরে আমরা সাজেক উপত্যকার দ্বিতীয় হেলিপ্যাডের কাছে চলে আসি। তারপর তৃতীয় হেলিপ্যাড আরও পেছনে ফেলে কংলাক পাড়ায়। এখানে এক পাংখো পরিবারের সঙ্গে আমাদের সাজেক বসবাসের ব্যবস্থা হয়। কারবারি থান লেয়াং পাংখোয়া ও তার অসাধারণ পরিবারের গল্প আজীবন মনে থাকবে। চারপাশে পর্যটক কোলাহল নেই। ছিমছাম নিরিবিল পরিবেশ। মফিজ ভাই আমাদের জন্য থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থাই করেছিলেন। শুধু ভালো বলা যাবে না, বলতে হবে অতি-অসাধারণ।
বিশাল ঘর, যে ঘরে আবার তিনটি বিছানা। আমরা রুম থেকে বের হয়ে রাতে কি খাব বলে রাখি, তারপর ফ্রেশ হয়ে সামনের পাহাড় দেখি, আকাশ দেখি। কংলাক পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতায় একবার ঘুরে এসে আমাদের রুমের পাশের ছোট্ট টিলা মতো জায়গা ঘেরা বাঁশঝারে বসে গল্প করি। এভাবেই রাত নামে, সে রাতে আকাশে ছিল আধ ফালি চাঁদ। চাঁদের আলোয় কখন আমরা কম্বলের তলে আশ্রয় নিলাম, সে মনে নেই। তবে, ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে পড়েছিলাম বেশ মনে আছে। আমরা বের হয়েই আবার আকাশ দেখি, দেখি সামনের পাহাড়। ভোরের আকাশে উপভোগ্য হয়ে ওঠে মেঘেদের অপার শোভায়। চারিদিকে শুধু মেঘ আর মেঘ। মেঘেদের সরিয়ে মাত্রই সূর্যমামা জেগে উঠছে। রুইলুই পাড়ার পর্যটকদের দেখা গেল কংলাক পাহাড়ের উচ্চতায় দল বেঁধে উঠছে, আমরাও সে কাফেলায় সামিল হলাম।
কংলাক পাড়ার চার্চ পেরিয়ে সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ উচ্চতায় বা কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পড়ি। সে এক অসাধারণ দৃশ্য আর অসাধারণের কোনো ভাষা নেই। মেঘের জন্য পাহাড়গুলো আর পাহাড় ছিল না, মেঘ পাহাড়ের পথ যেন! এক অন্য পৃথিবী, সে সৌন্দর্য বর্ণনা আমার পক্ষে সম্ভব না।
আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে পুরো সাজেক এলাকার অনেক দূর অবধি তাকাই। মনে হয় এ শুধু চেয়ে দেখার দিন। অপার মুগ্ধতা নিয়ে আমরা দুবোন মেঘে ঢাকা সাজেককে চেয়ে শুধু দেখলাম, দেখতেই থাকলাম আর অবাক হলাম!

প্রয়োজনীয় তথ্য
সাজেক ভ্যালিতে আমাদের খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হলেও আসলে সাজেক পড়েছে রাঙামাটি জেলায়। তবে জেলা যাই হোক, সাজেক আপনাকে যেতে হবে খাগড়াছড়ি আর দিঘিনালা হয়ে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পথটি অসাধারণ। পুরো পথই পাহাড় আর ঘনবনে ঘেরা। চলতি পথে মাঝে মাঝে ঝিরির মতো ছোট ছোট নদী ও কালভার্টের দেখা মিলবে। আর দেখা পাবেন বিচ্ছিন্ন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ি গ্রাম।
মেঘে মোড়া রঙিন ক্যানভাসের সাজেক সৌন্দর্যের সঙ্গে এই পথ সৌন্দর্যটুকু বাড়তি পাওনা। আর একটা পাওনা হল মাসালং ও কাসালং নদী সৌন্দর্য উপভোগ। অবশ্য শুরুতেই আপনার সঙ্গে মাইনি নদীর দেখা হয়ে যাবে। আর শীতের তীব্রতায় ঝরনার পানি উধাও হলেও এক ঝলক হাজাছড়া ঝরনা দেখে আসতে পারবেন।
খাড়গড়াছড়ি যাওয়ার সরাসরি সব ধরনের বাস সার্ভিস রয়েছে। এসিবাস সেন্টমার্টিন বা শান্তি পরিবহণের রয়েছে। নন এসি বাস শান্তি পরিবহন সহ শ্যামলি, ঈগল, হানিফ, এস আলম।
দিঘিনালা থেকে চান্দের-গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। সে ব্যবস্থা আগে থেকে করে গেলেই ভালো। না করলে একটা সুবিধা হচ্ছে দরদাম করে একটা গাড়িতে চড়ে বসা যায়। লোক সংখ্যা তিন বা চার হলে একটা মহেন্দ্র অটো রিকশা নিয়ে নেবেন। আর যাত্রার সময় সকালের নাস্তা দিঘিনালাতে কোনো এক পাহাড়ি রেস্তোরাঁয় সেরে নিতে পারবেন।
আরেকটা কথা, সাজেক থাকার ব্যবস্থা এখন অনেক। বিজিবি পরিচালিত রূনময় রিসোর্ট, সেনাবাহিনি পরিচালিত সাজেক রসোর্ট আর প্রাইভেট রিসোর্ট আলো রিসোর্টসহ এখন কত যে রিসোর্ট আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। রিসোর্ট আর মানুষ মিলে সাজেক এখন মেলায় পরিণত। তাই নিরিবিলির খোঁজে কংলাক পাড়া চলে যান। একদু রাত বাস করে আসুন পাংখো বা লুসাইদের ঘরে, খুব ভালো লাগবে বলতে পারি। আমরা দুদিন ছিলাম, রুইলুই পাড়ায় বিকেলে কেবল বেড়াতে যেতাম। তবে যেখানেই থাকেন সে ব্যবস্থ্যা ঢাকা থেকেই করে যাবেন। সেক্ষেত্রে মফিজ ভাই এর সহযোগিতা নিতেই পারেন। মফিজ ভাইর মোবাইল +৮৮০১৮৬৩২৩৪৮২১। আর খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা নেই। যে বাসায় থাকবেন তাদের সঙ্গেই খাবেন। আমরা তাই করেছি, দারুণ আতিথেয়তা আর মজাদার খাবারের কথা মনে থাকবে বহুদিন।