বে টার্মিনাল

সাইফ পাওয়ার টেকের ড্রেজারে শুরু মাটি ভরাট

ভূঁইয়া নজরুল

সাইফ পাওয়ার টেক চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কাজ করেই মূলত বেশি পরিচিত। কিন’ এখন আর শুধু অপারেশনাল নয়, নির্মাণেও জড়িত প্রতিষ্ঠানটি। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিংয়ের কাজ করছে সাইফ পাওয়ার টেকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ই ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি এবার বে টার্মিনালের মাটি ভরাটের কাজও করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাইফ পাওয়ার টেকের প্রধান নির্বাহী (অপারেশন) ক্যাপ্টেন তানভির হোসাইন বলেন, ‘একথা সঠিক সাইফ পাওয়ার টেক বন্দরের অপারেশনাল কাজ করলেও ই ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানটি আমাদের অনেক পুরনো। ইতিমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওভার ফ্লো ইয়ার্ড নির্মাণও করা হয়েছে। বর্তমানে কর্ণফুলী ড্রেজিং ও বে টার্মিনালে কাজ করছে ই ইঞ্জিনিয়ারিং।’
কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের পর বে টার্মিনালেও কাজ পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ই ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মেজর (অব.) সিরাজুস সালেকীন বলেন, ‘বে টার্মিনালে চলমান মাটি ভরাটের কাজটি ছোটো কাজ। আগামীতে সুযোগ পেলে আরও ব্যাপকভাবে কাজ করা যাবে।’
কিন’ কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ে আপনারা (ই ইঞ্জিনিয়ারিং) সাব কন্ট্রাক্টর হিসেবে চায়না হারবারকে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে নিয়েছেন, পরবর্তীতে বড় কাজ পেলে কি অন্য কোম্পানিকে নেবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী ড্রেজিং অনেক বড় কাজ, তাই বড় ড্রেজার আনতে আমরা চায়না হারবারকে নিয়েছি। তবে আমাদের নিজস্ব যেহেতু ৫-৬টি ড্রেজার রয়েছে তা দিয়ে বে টার্মিনালের মূল কাজ করার সামর্থ্য রয়েছে।’
এদিকে গত সোমবার দুপুরে হালিশহর আনন্দবাজার এলাকার সাগর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সাগর পাড়ে বে টার্মিনালের মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর পক্ষে সাবকন্ট্রাক্টে মাটি ভরাট কাজ করছে ই ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
সাগরের ভেতরের অংশে স্কেভেটর দিয়ে একদিকে মাটি খনন ও অপরদিকে ড্রেজার দিয়ে চলছে মাটি ভরাটের কাজ। উপকূল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে ২০ ইঞ্চি ব্যাসের সাকশান ড্রেজার দিয়ে চলছে ভরাট কার্যক্রম।
মাটি ভরাট সম্পর্কে জানতে চাইলে ই ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ড্রেজিং প্রকল্পের ব্যবস’াপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত ৭ মার্চ থেকে আমরা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাটি ভরাটের কার্যক্রম শুরু করেছি। আমরা দুটি স্পটে মাটি ভরাটের কাজ করবো। প্রতিটি স্পটে পাঁচ লাখ ঘনমিটার মাটি ভরাট করা হবে।’
মাটি ভরাট করে তা কি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আউটার রিং রোডের সমান করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা রোডের লেভেলে মাটি ভরাট করবো।
কিন’ সাগর থেকে মাটি ভরাট ও উপকূলীয় এলাকায় পরবর্তীতে জেটি নির্মাণ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার আরিফুর রহমান বলেন, ‘সাগরের ওই এলাকায় জেটি নির্মাণের সময়ে স্বাভাবিকভাবে ড্রেজিং করতে হবে। তাই এখন মাটি ভরাটের জন্য আমরা কিছু ড্রেজিং করে এগিয়ে নিচ্ছি।’
মাটি ভরাটের কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে দুটি ব্লকে মাটি ভরাট করা হবে। প্রতিটি ব্লক ৩৫০ মিটার দীর্ঘ ও সাগরের দিকে ৫০০ মিটার চওড়া হবে। এই ব্লকগুলোতেই নির্মিত হবে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড।
কিন’ এখন ডেলিভারি ইয়ার্ড ও পরবর্তীতে বে টার্মিনালের মূল স’াপনা নির্মাণ করতে গেলে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া নিয়ে সমস্যা হতে পারে কিনা প্রশ্ন করা হলে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকৌশল বিভাগ জানায়, এজন্য সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটির একটি টিম ভিজিট করতে আসার কথা রয়েছে। ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণে তাদের মতামতও নেয়া হবে। কারণ পরবর্তীতে যাতে তা আবার ভাঙতে না হয় কিংবা মূল টার্মিনালে নির্মাণে সমস্যা না হয়।
এদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে বে টার্মিনালে সবার আগে কনটেইনার ডেলিভারি টার্মিনাল তৈরি করবে। বে টার্মিনালে সবার আগে কি নির্মিত হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বিভিন্ন সময়ে সুপ্রভাতকে বলেছিলেন, সবার আগে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। আর তা করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কাজের গতি অনেকাংশে বেড়ে যাবে। একইসাথে শহরের ভেতরের যানজটও কমে যাবে।
তিনি আরো বলেছিলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার ট্রাক নগরীতে প্রবেশ করে। এতে শহরের ভেতরে দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়। বে টার্মিনালে সার্ভিস ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মিত হলে ট্রাকগুলোকে আর শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে না। বে টার্মিনাল থেকে পণ্য নিয়ে পোর্ট এক্সেস রোড দিয়ে চলে যেতে পারবে। এজন্য পোর্ট এক্সেস রোড ও বে টার্মিনালের ডেলিভারি ইয়ার্ড বন্ডেড এলাকার আওতায় আনা হবে।
উল্লেখ্য, হালিশহর সাগর পাড়ে বে টার্মিনাল প্রকল্পের অধীনে এখন ৬৭ একর জায়গা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই ৬৭ একরে এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন’ প্রকল্পের বাকি আরো ৮২০ একর জায়গার বরাদ্দ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তীর থেকে সাগরের দিকে জেটি নির্মাণের সময়ও পাওয়া যাবে আরো ভূমি। সব মিলিয়ে ২৩০০ একর জায়গা নিয়ে বে টার্মিনালের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ টার্মিনালে জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, বাঁকা চ্যানেল কিংবা ড্রাফটের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এখানে যেকোনো দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। বর্তমান চ্যানেলে মাত্র ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারে। বিদ্যমান পোর্ট জেটিতে একসাথে ১৬টি জাহাজ বার্থিং করা গেলেও বে-টার্মিনালে গড়ে প্রায় ৫০টি জাহাজ একইসাথে বার্থিং করা যাবে। ইতিমধ্যে বে টার্মিনালের নির্মাণের সম্ভাব্যতা জরিপের কার্যক্রম শেষ করে জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান বন্দরের কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের মাধ্যমে বে টার্মিনাল গড়ে তুলবে। বে টার্মিনালে তিনটি টার্মিনাল থাকবে। একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল ও দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হবে। বর্তমানে বে টার্মিনালের ডিপিপি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।