সাংস্কৃতিক চেতনা ও  নীতিমালা প্রসঙ্গে

আরিফ চৌধুরী

কালচার  শব্দের মূল হলো সংস্কৃতি। আমরা যারা এ সমাজে সংস্কৃতি বলতে যা বোঝাতে চাই তা হলো মানুষের মনন ও চরিত্রের উৎকর্ষে ফসল। এই সমাজে সৃজনশীলতার চেতনায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি, সংগীত,চিত্রকলা, নৃত্য, নাট্যভিনয়সহ সব কিছুর মূলে মানুষের মনন চর্চার বিকাশ। এই মনন চর্চার সাথে যদি মানুষের মনের সংযোগ না ঘটে তা হলে সংস্কৃতি চেতনার মূলটাই খুঁজে গাওয়া যায় না। প্রাচীনকালে সংস্কৃতির তিনটি গুণের কথা উলেস্নখ করা হয়েছে। তা হলো- মনের স্বাধীনতা বা সজীবতা, বিশ্ব মানবতা ও শালীনতাবোধ। এই তিনটি গুণের মধ্যে দিয়ে একজন মানুষ সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারে একটি সমাজে। সংস্কৃতির এই তিনটি গুণের মধ্যে দিয়ে একটি বিষয় অনুধাবন করা যায় যে, মানুষের সমাজে জীনযাত্রার  মার্জিত রূপ হলো সাংস্কৃতিক চেতনা। মানুষের মাঝে সংস্কৃতি চেতনাই হলো সচল শক্তির স্বাধীনতা। যা মনের স্বাধীনতাকে বোঝায়, মানুষের মধ্যে মনের স্বাধীনতা না থাকলে তাতে মানুষ সৃষ্টিশীল হতে পারে না। যেখানে মনের স্বাধীনতা বিরাজমান সেখানে একজন মানুষ সংস্কৃতি চেতনায় নিজের গ-ি পেরিয়ে বিশ্ব মানবতার  মুক্তির পথে পথ খুঁজে নিতে পারে  সামনের পথে। এই পথ ধরেই বিংশ শতাব্দীর রেনেসাাঁর যুগ পেরিয়ে মানুষের মধ্যে নব জাগরণ সৃষ্টি হয়ে নতুন মূল্যবোধে মানুষ নিজের সৃষ্টিশীলতাকে ধারণ করে । মানুষের নিজস্বতায় উন্নত সৃজনশীল মনোভাব ও চেতনায় আজকের ঐতিহ্য ও মনন চিনত্মায় গতিময়তা ছিলো বলেইতো আজকে আমরা নিজস্ব সহজাত কালচার বা সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে চিনত্মা ভাবনায় ও সুষ্টিশীলতা ও নৈতিকতাবোধে পরিবর্তন আনার প্রয়াস পেয়েছি। সকল মানুষের সকল মনীষীদের কর্মময় জীবনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ই সাংস্কৃতিক পরিধি হিসেবে চিহ্নিত হয়। একজন মানুষের কৃতি মানে তার কাজের ফল যা তাকে যুগ যুগ ধরে পরিচয়ে এগিয়ে নিযে যায়। মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে, নিজের  মনন ও চেতনার বিকাশের মধ্যে দিয়ে মানুষ একজন সুন্দর মনের মানুষ হয়ে উঠতে পারে। যদিও সাংস্কৃতির মৌল উপাদান – যেমন ধর্ম, ভাষা, ভৌগোলিক অখন্ডতা প্রভৃতি একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রধাণ কারণগুলোর অন্যতম।  রাষ্ট্রই সংস্কৃতির বিকাশ সাধন করে একটি স্বরূপে তার বিকাশমান ও নিয়ন্ত্রণ করে নতুন ড়্গেত্র সৃষ্টি করতে পারে। তাইতো একটি দেশের সংস্কৃতির অভিন্ন দ্যোতনায় মানুষের পরস্পরের চাহিদা, আনত্মঃসংযোগ ও সংস্কৃতির রূপ চলমান হয়ে সংগঠিত হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটা দেশের সংস্কৃতির মৌল মত ও চাহিদা অনুযায়ী সংস্কৃতির পুনর্গঠনে সকলকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।  যেমন- মূলতভাবে দেশের নিজস্বতা নির্ভর হতে হবে, অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সহজাত স্বকীয়তা, আনত্মর্জাতিক সংস্কৃতির সহযোগিতা সহ নিজস্বতায় সমৃদ্ধি অর্জন বিকশিত হতে পারলে তবেই সংস্কৃতির নিজস্বতাবোধ জাগ্রত হয়ে  মানুষের কাছে পৌঁছাবে। সংস্কৃতি বিকশিত হয় শিল্পবোধের চর্চায়। এই শিল্পবোধের ব্যাপকতা ও উজ্জ্বলতার স্বরূপের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অভিন্ন ঐক্যবদ্ধ বিকাশ ও সার্বজনীন সৃজনশীল অগ্রসরতায় সংস্কৃতির শ্রীবৃদ্ধি সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে,  ১৯৮২ সালে মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর আনত্মর্জাতিক কনভেনশনে  বলা হয়েছে- সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আত্মিক বস’গত, বুদ্ধিগত ও আবেগগত চিনত্মা ও কর্মধারার প্রকাশ। একমাত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরড়্গণের দ্বারাই একটি দেশ জাতিগত স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য রড়্গা করতে পারে। ইউনেস্কোর সে কনভেনশনে ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে – শিল্পীর শিল্পকর্ম, সাহিত্যিকের সাহিত্য সাধনা, স’পতির নির্মাণকর্ম, সংগীত শিল্পীর সাধনা, নৃত্যশিল্পীর নৃত্য ব্যঞ্জনা, বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ও  অনুসন্ধান কর্ম, জনগণের ধর্মবোধ, সে সব মূল্যবোধের স্বীকৃতি  যা জীবনকে অর্থ দান করে।

সে লড়্গে  জাতিসংঘ ২১ মে কে বিশ্ব সংস্কৃতি দিবস হিসাবে ঘোষণা দিয়ে বিশ্বের সব দেশে সংস্কৃতির অনুসন্ধ্যান ও তার সংরড়্গণের ওপর জোর দিয়েছেন। ইউনেস্কোর সে ঘোষণার পর প্রায় চার দশকের অধিক সময় অতিবাহিত হতে চললো আমাদের দেশে আজ পর্যনত্ম পূর্ণাঙ্গ কোন সংস্কৃতি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। আমাদের দেশের যে ঐতিহ্য সংস্কৃতির যে ভা-ার ও উপাদান  বিদ্যমান তা দেশের আপামর জনগণের জীবনযাত্রার  সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এ দেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ইতিহাস ও দেশের নিজস্ব পরিচয়কে বিকাশমান  রাখা ও সংরড়্গণে সাংস্কৃতিক একটি নীতিমালা জরম্নরি হয়ে পড়েছে। প্রিজারভেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭ সালের অ্যাসিকুইটি অ্যাক্ট গুলোকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন  করে তার  যথাযথ প্রয়োগ ও বাসত্মবায়ন করতে পারলে তবেই দেশে বর্তমানে পুরোন স’াপনা, মোগল ও সুলতান আমলের দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, ঐতিহ্য,ইতিহাস ধংসের যে মহা উৎসব শুরম্ন হয়েছে তাকে রড়্গায় নীতিমালা প্রণয়ন করে আইনের আওতায় এনে তা রোধ করা সম্ভব।

এই নীতিমালা দেশ-বিদেশে আমাদের সাংস্কৃতিক আদান প্রদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এর বিকাশে মানুষের মাঝ থেকে সকল অন্যায়, অত্যাচার- বোধহীন অনৈতিক কর্মকা- থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এই নীতিমালাকে সকলের মাঝে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। তবেই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের চেতনায় জাগ্রত হয়ে মানুষ  এ দেশের  সংস্কৃতিকে ভালোবেসে এগিয়ে যাবে অনেকটা পথ। নতুন মূল্যবোধ চেতনায়, নতুন সম্ভাবনায়। তাই সাংস্কৃতিক নীতিমালা প্রণয়নে এগিয়ে এসে  সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ড়্গেত্রের সকল সংকট কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতায় এগিয়ে আসুন।