সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স কেন প্রয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক
theater-institute-ctg.-helal-(1)

বন্দরনগরীখ্যাত চট্টগ্রাম অঞ্চলের রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সমুদ্র বন্দর হওয়ায় এবং এখানকার ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যের কারণে এক বিচিত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ সংস্কৃতিরও যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে এখানে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। এখানে রাজনৈতিক তৎপরতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এগিয়েছে হাত ধরাধরি করে। তবে সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, এখানকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে তা এগিয়ে যায়নি। থিয়েটার, আবৃত্তি, নাচ, গান, মুকাভিনয়সহ বিভিন্ন মাধ্যমভিত্তিক অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে চট্টগ্রামে। এখানকার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রাম, মুসলিম ইনস্টিটিউট, থিয়েটার ইনস্টিটিটিউট চট্টগ্রাম ও ডিসি হিলকে কেন্দ্র করে। তবে এসব হল সাংস্কৃতিক কর্মীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না। চট্টগ্রাম নগরীতে নেই কোনো মুক্তমঞ্চ। হলগুলোর আসন সংখ্যাও সীমিত। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ত্বরান্বিত করতে এখন সাংস্কৃতি বলয় প্রতিষ্ঠা করা সময়ে দাবি বলে মনে করেন সংস্কৃতিকর্মীরা।

পরিত্যক্ত মুসলিম ইনস্টিটিউট মিলনায়তন
চট্টগ্রামের একসময়কার প্রধান মিলনায়তন মুসলিম ইনস্টিটিউট মিলনায়তন। নান্দনিকতার আবরণ ফেলে বর্তমানে মুসলিম হল প্রায় পরিত্যক্ত। ভালো মানের একটি অনুষ্ঠান করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই এখানে। ঐতিহ্যবাহী এ মিলনায়তনটির শেষবার সংস্কার হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। চট্টগ্রামের এক সময়ের সুপরিচিত এই মিলনায়তন বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সরকারি মিলনায়তন হওয়ার পরও কোনোরকম অর্থ বরাদ্দ ও তদারকি না থাকায় মুসলিম হলের বর্তমানে করুণ দশা।
জানা গেছে, এখন যারা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নেয়, তাদের শুধু মিলনায়তনটাই দেওয়া যায়। লাইট, সাউন্ড বক্স, জেনারেটরের ব্যবস্থা আয়োজকদেরই করতে হয়। আজকাল কেউ এখানে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আগ্রহও দেখায় না। মাঝে মাঝে দু একটি অনুষ্ঠান হতে দেখা যায়। অথচ এক সময় যাত্রা এবং নাটক মঞ্চায়নের জন্য এই হলটি বিখ্যাত ছিল। যাত্রা দেখার জন্য দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়তেন এখানে। এই নাটক করে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য নায়িকা অঞ্জু ঘোষ। এই হলে মঞ্চস্থ হওয়া প্রয়াত আবদুল গফুর হালির ‘সাম্পানওয়ালা’ ও ‘দুবাইওয়ালা’ নাটকের কথা এখনো স্মরণ করেন নাট্যজনেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো ভবন ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে ভেতরের লোহার শিক দেখা যাচ্ছে। মিলনায়তনেলর উপরের সিলিং ভঙ্গুর। মিলনায়তনের ছাউনি টিনের হওয়ায় বর্ষাকালে সিলিং থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, মিলনায়তনের ৮৫ পিস স্পটলাইটের মধ্যে বর্তমানে ১৮টি মাত্র জ্বলে। বর্তমানে ১২টি এনার্জি লাইট ও ৭টি টিউবলাইট দিয়ে চালানো হচ্ছে আলোকব্যবস্থা। মঞ্চের জন্য হ্যালোজেন লাইট জ্বলে দুটি। এগুলো শুধু মঞ্চ আলোকিত করার জন্য। মুসলিম হলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৮টি স্পটলাইট সেমিনারের জন্য যথেষ্ট কিন্তু, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য নয়। চারটি সাউন্ডবক্সের মধ্যে কাজ করে না একটিও।
তিনটি গ্রিন রুমে পর্যাপ্ত লাইট ও ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। কিছুদিন পর পর মঞ্চের পাটাতন আলগা হয়ে যায়। এতে যেকোনো সময় শিল্পীরা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। একসময় ১২০০ লোক একসাথে বসতে পারতো এ মিলনায়তনে। এখন ৭০০টি আসনের বদলে ভাঙাচোরা ৬০০টি আসন অবশিষ্ট আছে। বাথরুমগুলোর অবস্থাও করুণ। দেয়াল ভেঙে গেছে। দুর্গন্ধ। অপরিচ্ছন্ন হওয়ার কারণে শিল্পীরা ঢুকতে চান না।
এ ব্যাপারে প্রবীণ নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘মুসলিম হনস্টিটিউট এখন প্রায় পরিত্যক্ত। এক সময় এটি নাটক মঞ্চস্থের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এখন এখানে আর অনুষ্ঠান করার মতো পরিবেশ নেই। সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অবস্থার উন্নতি হবে।’
এ ব্যাপারে মুসলিম হলের সদস্যসচিব মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘এটা-সেটা সমস্যা তো আছেই। সংস্কারের প্রয়োজন। আমরা সরকারকে জানিয়েছি। আমরা তো বসে নেই। কাজ করছি। অনুষ্ঠান হচ্ছে।’ কালচারাল কমপ্লেক্সের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এই ব্যাপারে আরো কিছু কাগজপত্র লাগবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্ল্যান পরিকল্পনা অধিদপ্তরে গেছে। ইতিমধ্যে গণগ্রন্থাগার একটি ডিপিপি তৈরি করেছে। আবার মন্ত্রণালয়ে প্ল্যানিং যাবে। তারপর কাজ শুরু হবে।’
উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের তৎপরতায় মুসলিম ইনস্টিটিউটকে সরকারি তত্ত্বাবধানে আনা হয়।

দেড় বছর ধরে বন্ধ শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের মূল মিলনায়তন
নগরীর সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনস্থল জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রাম। কিন্তু এখানে আশানুরূপ সেবা পাচ্ছেন না সংস্কৃতিকর্মীরা। সংস্কারের নামে বিভিন্ন সময় মূলমিলনায়তন বন্ধ থাকে। স্থায়ী সংস্কার না করে কেন বারবার অস্থায়ী সংস্কার করা হয় তা নিয়েও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন। মূল মিলনায়তন ভবনটিরও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এটি ভেঙে নতুন ভবন করা উচিত বলে জানান একাধিক সংস্কতিকর্মী। নির্ধারিত এক বছর মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত ছয় মাস পরেও চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির আধুনিকায়ন কাজ শেষ হয়নি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আধুনিকায়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ চলছে ঢিমেতালে। ফলে দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে মূল মিলনায়তনটি। মূল মিলনায়তনটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে শিল্পকলাভিত্তিক নাট্যদলগুলোর কার্যক্রম। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক চর্চা। সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, অনতিবিলম্বে আধুনিকায়ন কাজ শেষ করে মূল মিলনায়তনটি খুলে দেওয়া হোক।
শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের মূল আকর্ষণ অডিটোরিয়াম বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত। বিশেষ করে মঞ্চনাটকের জন্য এই হল অনুপযোগী ছিল। স্বল্প পরিসর, ছোট মঞ্চ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অভাব, নড়বড়ে চেয়ার, সংকীর্ণ গ্রিনরুম, শব্দনিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে জর্জরিত মিলনায়তনটি। ফলে সংস্কৃতিকর্মীদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না শিল্পকলা একাডেমি। সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, যথাযথ মনিটরিং না থাকার কারণে শিল্পকলা একাডেমির সংস্কার কাজ শেষ হচ্ছে না। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমির কার্যকরী পরিষদ না থাকাতে কাজের জবাবদিহিতাও নেই বলে মনে করছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। শিল্পকলা একাডেমির সংস্কৃতিকর্মীদের প্রথম পছন্দের জায়গা হওয়াতে এখানে বরাদ্দ পেতেও বেগ পেতে হয় তাদের। এমন পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ সাংস্কতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলেন মনে করেন তারা।
এ ব্যাপারে নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী বলেন, ‘দেড় বছর ধরে সংস্কারের নামে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ আছে এখানে। গ্রুপ থিয়েটার চর্চার কেন্দ্রস্থল শিল্পকলা একাডেমি সংস্কারের নামে বিভিন্ন সময় বন্ধ থাকে। মেয়াদোত্তীর্ণ হল ভেঙ্গে তিনটা হল করা যেতে পারে।’ সবকিছু মিলিয়ে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প ত্বরান্বিত করার দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের।

বছর জুড়েই অবহেলায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
ভাষা শহীদের স্মরণে বন্দরনগরীর একমাত্র স্মৃতিস্তম্ভ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। কিন্তু এটি বছরজুড়েই থাকে অবহেলিত। শহীদ মিনারের পাদদেশ থাকে হকার ও টোকাইদের দখলে। রাত-বিরাতে দেখা মেলে ছিন্নমূল মানুষের ঢল। নেই কোন নিরাপত্তাকর্মী কিংবা পরিচ্ছন্নকর্মী। বেদিতে যত্রতত্র ছড়ানো-ছিটানো থাকে আবর্জনা। ফুটপাতসহ রাস্তার দু’পাশজুড়ে ঘিঞ্জি পরিবেশ। যানবাহনের কালো ধোঁয়া আর ভ্যানগাড়িতে ব্যস্ত চারপাশ। নিয়মিত হয় না পরিচর্যা।
২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর কিংবা রাজনৈতিক সভা-সেমিনার ও বিক্ষোভের দিনগুলোতে এখানে দেখা যায় চরম অব্যবস্থাপনা। সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা ও আগত দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ। এসব দিনে শহরের হাজার হাজার মানুুষ শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসেন। প্রবেশ ও বের হওয়ার সংকীর্ণ পথের কারণে তাদের দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট, মুসলিম হল, কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি এলাকা নিয়ে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মীরা। কিন্তু এখনো আলোর মুখ দেখছেনা প্রকল্পটি। থমকে আছে একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায়। তাই শিগগিরই শহীদ মিনার এলাকায় ‘সাংস্কৃতিক বলয়’ তৈরির বাস্তবায়ন চান চট্টগ্রামের আপামর সংস্কৃতিকর্মীরা।
কালচারাল কমপ্লেক্স প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামবাসীর একটি স্বপ্ন পূরণ হবে বলে মনে করেন আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা ব্যাপারটি শুনে আসছি। প্রকল্পে যেন আধুনিক মিলনায়তন ও সকল সুযোগ-সুবিধার সম্মেলন করা হয়।’ কাজটি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের সকল কাজে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। আমরা চাই, এই প্রকল্পটি যেন আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করা হয়। চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মীদের স্বপ্ন যেন পূরণ করা হয়।’