সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় সম্ভাবনা জাগাবে শুঁটকি শিল্প

বঙ্গোপসাগরের তীরে আনোয়ারা উপজেলার দুটি গ্রাম। ছয় মাস আগে আঘাত হানা রোয়ানুর তাণ্ডবলীলার চিহ্ন এখনো মোছেনি। বেড়িবাঁধ ভেঙে সাগরের পানিতে ভেসে যাওয়া বাড়িঘরের এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। কিন্তু এরপরও সেখানে জীবন থেমে থাকেনি।
মানুষ জেগে উঠেছে। হাল ধরেছে নিজেদের। বাঁচার পথ বের করে নিয়েছে তারা। এখন সেখানে জীবনযাপনের উত্তাপ। এখন সেখানে শুঁটকি উৎসব। এই উৎসব শুরু হয়েছে গত ডিসেম্বর থেকে। প্রকৃতি যদি আবার বিরূপ না হয় তা চলবে এপ্রিল- মে পর্যন্ত। এই কাজে ব্যস্ত আছে এখন দু গ্রামের প্রায় পাঁচ শত পরিবার।
এই উৎসব শুধু আনোয়ারায় নয়। দেশের দক্ষিণ পূর্বের প্রায় সব উপকূলীয় এলাকার চিত্র এটি। বছরের এই সময়ে এসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার জেলার নদী ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে শুরু হয় শুঁটকি শুকানোর মওসুম। এই সময় পতেঙ্গা, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, টেকনাফ, সেন্টমার্টিনসহ নানা স্থানে শুঁটকির বাজার বসে। যদিও সারা বছরই এসব এলাকায় শুঁটকি বিক্রি হয়। এই পর্যটন মৌসুমে তা ভিন্ন মাত্রা পায় শুধু। এ ছাড়া জেলার শুঁটকির আড়তগুলোয় চলে প্রচুর কেনাবেচা।
শুঁটকি একটি প্রাচীন খাবার। খাদ্য সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা উদ্ভাবনের আগে মানুষ মাছ শুকিয়ে মজুদ করে রাখতো। মাছের ঘাটতি পূরণ করার জন্য তাদের নির্ভর করতে হতো শুঁটকির ওপর। শুঁটকি আমিষের অভাব পূরণ করে। আমিষ জাতীয় খাদ্য হলেও এতে কোলেস্টেরল ও ফ্যাটের মাত্রা কম থাকে বলে অনেক ধরনের রোগীর জন্য শুঁটকি আমিষ হিসেবে চাহিদা পূরণ করতে পারে। বিশ্বের নানা দেশে শুঁটকি খাওয়ার প্রচলন আছে। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে।
বাংলাদেশে প্রচুর শুঁটকি উৎপাদিত হয়। এবং এর চাহিদাও রয়েছে বিপুল। কিন্তু দুঃখজনক হলো বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের শুঁটকির ওপর আস্থা হারিয়েছে মানুষ।
পোকার আক্রমণ থেকে শুঁটকি রক্ষা করার জন্য উৎপাদক থেকে বিক্রেতা পর্যায়ে ব্যবহার করা হয় কীটনাশক।
অতীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় পোকা থেকে রক্ষার জন্য শুঁটকিতে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষ ডিডিটি, অ্যানড্রিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। চিকিৎসকের মতে, এই ধরনের কীটনাশক দেয়া খাবার পানি দিয়ে পরিষ্কার কিংবা রান্না করার পরও বিষমুক্ত হয় না। এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হতে পারে ক্যান্সারের মতো রোগও।
সরকারি পর্যায়ে একটু কঠোর হলে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। এবং তাতে মানুষের অনিষ্ট হওয়া থেকে রক্ষার সাথে সাথে এই শিল্পের প্রসারেও ভূমিকা রাখতে পারতো। যেমন সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপ, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ও উৎপাদক-বিক্রেতাদের সচেতনতায় এখন ফল – সবজি ইত্যাদিতে বিষ, কার্বাইড, ফরমালিনের ব্যবহার অনেক কমেছে।
এই ধরনের পদক্ষেপ যদি শুঁটকি পল্লীতে নেওয়া যায় তাতে এই শিল্পের বিকাশ হতো।
সে সাথে মৌসুমের আগে ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ, শুঁটকি পল্লীতে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা করতে পারলে এই শিল্প খুব দ্রুত একটি অর্থকরী খাতে পরিণত হবে। প্রণোদনা পেলে উৎপাদকরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করতে পারতো।

আপনার মন্তব্য লিখুন