সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি : পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায়

কাজী জাহিন হাসান

ধীরে ধীরে গলছে এন্টারটিকার বরফ। সেইসঙ্গে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশকে যে চরম ভুগতে হবে সে আলাপটা এখন আর নতুন নয়। শিল্পবিপ্লবের সময়ে পৃথিবী উষ্ণতর হয়ে ওঠার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে পরবর্তী শতকগুলোতেও। তাতে কোনও কোনও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়ে। তবে এর শেষ কোথায় তা কারও জানা নেই। আইইউসিএন ওয়েবসাইটে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইনডিউচড মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আবুল কালাম মো. ইকবাল ফারুক লিখেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের দেশান্তরিত হওয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে অধ্যায় যুক্ত হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ কেবল বাংলাদেশেরই ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে অন্যত্র সরে যেতে হবে।’
সায়েন্টিফিক আমেরিকান ওয়েবসাইটে ‘দ্য আনফোল্ডিং ট্র্যাজেডি অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে লেখা আরেকটি নিবন্ধে রবার্ট গ্লেনন লিখেছেন, কোনও কোনও বিজ্ঞানী ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৫-৬ ফুট বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছেন, যার মধ্য দিয়ে ৫ কোটি মানুষ স্থানচ্যুত হতে পারে।’
বাংলাদেশকে অবশ্যই এসব ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বাংলাদেশে ভূমিহারা গ্রামীণ পরিবারগুলো সাধারণত কাজের সন্ধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর অভিমুখী হয়। কেননা, শিল্প-কারখানাজনিত কর্মসংস্থানগুলো এ দুই শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি ছোট শহরকে বড় শিল্পায়িত শহরে রূপান্তরের পরিকল্পনা করাটা এখন বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য সমাধান। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদেরকে অন্তত ২০টি ছোট শহর বেছে নিতে হবে এবং সেগুলোকে পরবর্তী দশকগুলোতে বড় শহরে পরিণত করতে হবে। এ শহরগুলোর প্রতিটিকে ২০৫০ সাল নাগাদ ৭ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দার শহরে পরিণত করতে হবে। অর্থাৎ ২০৫০ সাল নাগাদ এ ২০ শহরকে ১ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যা ধারণের সক্ষমতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কোন শহরগুলোকে বড় শহরে রূপান্তরিত করা উচিত?
অনেক জেলায় সরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে। প্রতিটি এসইজেড-এর কাছের শহরে একটি সরকারি হাসপাতাল, একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি স্কুল এবং একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে; আর তা কার্যকরভাবে প্রতিটি নতুন এসইজেডকে নতুন একটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করবে। আরেকটি প্রশ্ন হলো, কোন শহরগুলোকে শিল্পনগরে পরিণত করা উচিত নয়? অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানী মনে করেন, পরবর্তী এক কিংবা দুই শতকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩ থেকে ৪ মিটার বাড়বে। নিম্নাঞ্চলীয় শহরগুলোকে পানির ওপরে ধরে রাখার জন্য আল ও বাঁধ তৈরিতে প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। কিছুসংখ্যক নিম্নাঞ্চলীয় শহর ক্রমাগত পরিত্যক্ত হবে; সবসময় পানিতে তলিয়ে থাকা শহরে কেউ বসবাস করতে চাইবে না। এ কথাগুলো মাথায় রেখে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শহরগুলোর সমপ্রসারণে আমাদের উদ্যোগী হওয়া উচিত হবে না। সমপ্রসারণের জন্য বাছাইকৃত শহরগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অন্তত ৫ মিটার উপরে থাকতে হবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট সমস্যার কথা কয়েক দশক ধরেই আমাদের জানা। যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতিতে আমাদেরকে এ সমস্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। লাখ লাখ বাংলাদেশি তাদের বাড়ি-ঘর এবং জমি হারাবেন এবং অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হবেন; আমাদেরকে এমন এক শহর গড়ে তুলতে হবে যেখানে এ বাস্তুচ্যুত লোকজন কর্মক্ষেত্র খুঁজে পাবেন, মানসম্পন্ন জীবন-যাপন করতে পারবেন।

লেখক : প্রাবন্ধিক