সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন একীভূত হচ্ছে শিপিং কোম্পানিগুলো

ভূঁইয়া নজরুল

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত শিপিং কোম্পানিগুলোতে একীভূত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। গত এক বছরে প্রায় সাতটি কোম্পানি একীভূত হয়েছে এবং পাইপ লাইনে রয়েছে আরো পাঁচ কোম্পানি। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে না পেরে ছোটো কোম্পানিগুলো বড় কোম্পানিগুলোর সাথে একীভূত হয়ে যাচ্ছে। আর এই একীভূত হওয়ায় দেশে শিপিং লাইনে কর্মসংস’ানের সুযোগ যেমন কমছে, তেমনিভাবে পণ্য পরিবহনে মূল্য হার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও দেখা দিচ্ছে। আর পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রকারান্তরে এর মাশুল গুনতে হবে ভোক্তাকে।

শিপিং ব্যবসায় নিয়োজিত ও বিভিন্ন শিপিং কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত এক বছরে বিশ্ব বাজারের অনেক বড় বড় কোম্পানি একীভূত হয়েছে। বিশ্বে কনটেইনার পরিবহনে ১৮৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সিঙ্গাপুরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট লাইন্স (এপিএল) বর্তমানে ১২তম স’ানে রয়েছে। বিশ্বে ৪ হাজার ৩০০ কর্মী নিয়ে ৫০টি দেশে কাজ করা এই কোম্পানিটি গত বছর কনটেইনার পরিবহনে বিশ্বে তৃতীয় স’ানে থাকা ফ্রান্সের সিএমএসিজিএম গ্রুপের সাথে। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির ২২ হাজার কর্মী রয়েছে। এপিএলের মতো চায়না শিপিং কোম্পানি একীভূত হয়েছে কসকো শিপিং কোম্পানির সাথে। ১৯৭৬ সালে চালু হওয়া দুবাইয়ের ইউনাইটেড আরব শিপিং কোম্পানি (ইইউএসসি) বিশ্বের ২৪০টি বন্দরে কাজ করলেও একীভূত হয়েছে জার্মানির হেপাগের সাথে। হেপাগ বর্তমানে ১১৭টি দেশের ৩৫০ বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে কাজ করছে।

কনটেইনার পরিবহনে বিশ্বে শীর্ষ সপ্তম স’ানে থাকা জার্মানির হামবুর্গ এসইউডি গ্রুপ একীভূত হয়েছে কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষ স’ানে থাকা ডেনমার্কের মায়েরসক গ্রুপের সাথে। সর্বশেষ জাপানের তিনটি কোম্পানি এনওয়াইকে লাইন, কে লাইন ও মিতসুই একীভূত হয়ে গঠন করেছে ওয়ান লাইন কোম্পানি। একীভূত হওয়া তিনটি কোম্পানি বিশ্বের শীর্ষ ২০টি শিপিং লাইনের মধ্যে ছিল। সর্বশেষ তাইওয়ানের তিনটি (এভারগ্রিন, ওয়ান হাই ও ওয়াইএমএল) কোম্পানি একীভূত হওয়া পাইপ লাইনে রয়েছে। ওওসিএল কোম্পানিটিও শিগগিরই কসকো শিপিং লাইনের সাথে একীভূত হওয়ার পথে রয়েছে। তবে ওওসিএলের মহাব্যবস’াপক ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন বলেন,‘ আমরা এখনো একীভূত হইনি এবং হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে কসকো শিপিং এর একটি কোম্পানি আমাদের কোম্পানিটি কেনার কথা রয়েছে, তারা কিনলেও আমরা পৃথকভাবে আমাদের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ থাকবে।’

কিন’ বিভিন্ন শিপিং কোম্পানিগুলো একীভূত হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বড় কোম্পানিগুলো ছোটো কোম্পানিগুলোকে কিনে নিচ্ছে অথবা কয়েকটি কোম্পানি একত্রিত হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে শিপিং কোম্পানিগুলো একীভূত হয়ে যাওয়ায় আমাদের দেশে আমদানি-রপ্তানিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে কন্টিনেন্টাল গ্রুপের মহাব্যবস’াপক রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলেও কোম্পানিগুলো একীভূত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে এতে আমাদের দেশে কর্মসংস’ানের সুযোগ কমছে। একটি কোম্পানির অফিস থাকলে কমপক্ষে ৩০ জনের চাকুরির সুযোগ হতো। এখন তিনটি কোম্পানি একসাথে হলে ৩০ জনকে দিয়ে অফিস চালানো হবে।’

কথা হয় কে লাইন শিপিং এর উপ ব্যবস’াপনা পরিচালক সাহেদ সরোয়ারের সাথে। তিনি বলেন,‘ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না পেরে গত দুই বছর আগে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার হ্যানজিন শিপিং লাইন। শিপিং কোম্পানিগুলো হয়তো ক্ষতি কমাতে হয় বন্ধ করে দিচ্ছে নয়তো একীভূত হয়ে যাচ্ছে। এতে হয়তো কোম্পানিগুলো টিকে থাকছে কিন’ আমদানি রপ্তানিতে নিয়োজিত ব্যবসায়ীদের সুযোগ কমছে। আগে কেউ এক কোম্পানির কাছে বেশি দাম হলে অন্য কোম্পানির কাছে যাওয়ার সুযোগ পেতো। কিন’ এভাবে কোম্পানি একীভূত হতে থাকলে সেই সুযোগ কমে আসবে।‘

একই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘শিপিং কোম্পানিগুলো একীভূত হয়ে যাওয়ায় এবং বড় কোম্পানিগুলোর অধীনে এই ব্যবসা চলে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের সুযোগ কমে আসবে। এতে অনেক কিছুর রেট বেড়ে যেতে পারে।’

এই পদ্ধতিতে পরিবহন রেট বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা জানিয়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, ‘প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে না পেরে শিপিং কোম্পানিগুলো একীভূত হয়ে যাচ্ছে। আর এতে ব্যবসায় মনোপলির সুযোগ বাড়ছে। কিছু কোম্পানি যা রেট দেবে সেই রেটে পণ্য পরিবহন করতে হবে। এতে পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, আর পণ্যের খরচ বেড়ে গেলে ক্রমান্বয়ে তা ভোক্তার কাঁধে গিয়েই পড়বে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে দিন দিন কনটেইনার পরিবহন বাড়ছে। গত বছর প্রায় ২৫ লাখ কনটেইনার পরিবহন হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। দিন দিন এই কনটেইনার পরিবহন বাড়ছে। আর এই কনটেইনার পরিবহনে চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করছে প্রায় ৩০টি শিপিং কোম্পানি। এই ৩০টির মধ্যে ২০টি কোম্পানি রয়েছে বড় কোম্পানি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহনে সবার উপরে রয়েছে মায়েরসক এবং এর পরেই রয়েছে এমএসসি শিপিং কোম্পানি।