সমকালীন শিশুসাহিত্য ও শিশুসাহিত্যের দুয়োরানি

জসীম মেহবুব
maxresdefault

সমকালীন শিশুসাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দু’চার কথা না বললেই নয়। ইতিবাচক শিশুসাহিত্যের জন্য নেতিবাচকের উৎস সন্ধান করে তা থেকে উত্তরণের পথ বের করা আজ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা, আমাদের শিশুসাহিত্যকে দুয়োরানির কবল থেকে মুক্ত করতে না পারলে শিশুসাহিত্যকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া দুরূহ হয়ে পড়বে। সে বিষয়ে যৎসামান্য আলোকপাত করছি । আজ থেকে একশত আট বৎসর পূর্বে ১৯০৭ সালে চিরকালের কথক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার গ্রাম বাংলার উপ-কথার সমন্বয়ে প্রকাশ করেছিলেন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। দেশজ সংসকৃতির শেকড় প্রোথিত এই লোককাহিনীগুলো একশত বৎসর পার করে আজো সাধারণ মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা জুড়ে রয়েছে। কৃত্রিমতাবর্জিত মায়াবি যাদু আর ভাষায় সমৃদ্ধ এ বই বাঙালি সংসকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে টিকে আছে। বর্তমান ডিজিটাল সংসকৃতি আর হ্যারি পটারের ছোবলে কখনোই হারাবার নয় হাজার বছরের বাঙালি সংসকৃতির অহংকার এই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। যারা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র রস আস্বাদন করতে পারেনি তাদের মত দূর্ভাগা আর নেই। শৈশবে মা-ঠাকুমা, মাসি-পিসির কাছ থেকে শুনে কিংবা নিজে পাঠ করে যে এর রস আস্বাদন করতে পেরেছে তার মানস গঠন অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়েছে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় । ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র উপ-কথাগুলো মানুষের সারাজীবনের ওপর একটি প্রলেপ দিয়ে যায়। পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চেপে রাজপুত্রের ছুটে চলা, সোনার পালঙ্কে ঘুমন্ত রূপবতী রাজকন্যের সন্ধান স্বপ্নের চাদরে ঢাকা রয়েছে বাঙালির মানস হৃদয়ে ।
‘ঠাকুরমার ঝুলি’র উপ-কথায় রয়েছে সুয়োরানি দুয়োরানির কথা। দুয়োরানির অত্যাচারে রূপবতী রাজকন্যার বনবাস হয়। বনবাসে কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের জলে পুকুর হয়ে যায়। অনেক বছর পর রাজকন্যাকে খুঁজতে এসে রাজা সেই পুকুর পাড়ে বসে মাথায় হাত দিয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দেন। ভীনদেশী এক রাজপুত্র সেই রাজকন্যাকে নিয়ে সংসার পেতেছেন গভীর জঙ্গলে। রাজকন্যা জানালা দিয়ে পুকুর পাড়ে এক বৃদ্ধকে দেখে লোক পাঠিয়ে তাঁকে ডেকে পাঠালেন। খেতে বসে জানা গেল এই হচ্ছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যা। দুয়োরানির অত্যাচারে টিকতে না পেরে যাকে বনবাসে দিয়েছিলেন রাজা ।
‘ঠাকুরমার ঝুলি’র এ উপ-কথাগুলো যে একবার হৃদয়ে ধারণ করেছে, সেই পেরেছে শিশুসাহিত্যের সুলুক সন্ধান করতে । আমাদের শিশুসাহিত্যের ধারক-বাহকের ভূমিকা পালনকারী দৈনিক পত্রিকাগুলোতে শিশুসাহিত্যের একটি বিভাগ রয়েছে । যার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হলেন পত্রিকার মালিকপক্ষ । তাঁরা সবসময় খর্গ নিয়ে বসে থাকেন কখন ঘ্যাচ করে এ বিভাগটির কল্ল্লা কেটে নেবেন। বিজ্ঞাপনে টাকার হাতছানি কিংবা উগ্র বিনোদনের খপ্পরে পড়ে এ বিভাগটির মরনদশা দেখে খুব কষ্ট হয়। এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কীভাবে বাঁচবে আমাদের শিশুসাহিত্য ? এক পৃষ্ঠার বা অর্ধপৃষ্ঠার এ বিভাগটি কোনো কোনে সপ্তাহে হঠাৎ উধাও হয়ে যায় । আবার কখনো বা বেঁচে থাকার আশায় এক চতুর্থাংশ হয়ে পত্রিকার এক কোণায় নিভু নিভু হয়ে কোনোমতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এভাবেই আমাদের বর্তমান শিশুসাহিত্য বেঁচে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ যেন মূমূর্ষ রোগীকে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ারে নাকে নল লাগিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। এভাবে ক’দিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে শিশুসাহিত্যকে ? অবশ্য দু’একটি পত্রিকা এক্ষেত্রে সাহসী ভুমিকা পালন করছে । হাতে গোনা এইসব পত্রিকা আবার কবে মালিক নামক সুয়োরানির খপ্পরে পড়ে যায়, সে দুশ্চিন্তাতো থেকেই যাচ্ছে। আনসারুল হক এর ‘শিশুসাহিত্য, সৃজন নির্মাণ তত্ত্বতালাশ’ গ্রন্থের ভূমিকায় সাহিত্যসমালোচক বুদ্ধদেব গুহ বলেছে, ‘খুবই দুঃখের বিষয়, শিশু ও কিশোরসাহিত্য ক্রমশই তার মর্যাদার আসন হারাচ্ছে। তার প্রধান কারণ এই যে, যারা আদৌ শিশু বা কিশোর সাহিত্যিক নন, তাঁরাই এখন এ বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলেন।’ একথা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য। আমাদের দৈনিক পত্রিকা এবং দু’একটি মাসিক পত্র-পত্রিকার দিকে চোখ ফেরালেই এর শতভাগ সত্যতা মিলবে।
বাংলাভাষায় সবচেয়ে সহজলভ্য শিশুসাহিত্য হিসেবে ধরা হয় ঈশপের গল্পগুলোকে। এসব গল্পের আদেশ-উপদেশ আর সহজবোধ্যতায় বড় হয়নি এমন মানুষ পাওয়া দুস্কর। বহুবছর ধরে শিশুদের আনন্দের খোরাক জুগিয়ে আসছে ঈশপের গল্পগুলো। এসব গল্পে মানুষের মত কথা কয়ে উঠছে, গাছপালা, পশুপাখি এবং জন্তু-জানোয়ার। তাদের কল্পনা করার ক্ষমতা শিশুদের ভাবতে শেখায়। শিশুর মনোজগতকে প্রসারিত করে তাদের মানস গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। শিশুসাহিত্য হচ্ছে শিশুর মনের খাদ্য। দেহের যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি মনেরও খাদ্যের প্রয়োজন। তা না হলে শিশু রক্ত-মাংসের জড় পদার্থে পরিণত হবে। শিশু পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হলে তার মেধা আর মননের যে বিকাশ ঘটবে সেটা তার মনের খাদ্য। এটি অত্যন্ত জরুরি। আজকাল আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির খাঁচাবন্দী জীবনে শিশুর এ অধিকারটি ভুলে গেলে চলবে না। আর সে পরিবেশ যদি আমরা তাকে দিতে পারি, তাহলে তার সাফল্যও চোখে পড়বে।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)