আজ বিশ্ব আবহাওয়া দিবস

সবুজায়নের বিধান অমান্য

ভবন নির্মাণে প্লটের চার ভাগের এক ভাগ সবুজ রাখার বিধান রয়েছে: সিডিএ

ভূঁইয়া নজরুল

দশ কাঠার একটি প্লট। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী ৫০ শতাংশ (পাঁচ কাঠা) জায়গায় ভবন এবং ৫০ শতাংশ জায়গা খালি থাকবে। এই খালি ভূমির আবার অর্ধেক ভূমি ( আড়াই কাঠা) সবুজায়ন থাকবে। কিন্তু আমরা কতটুকু মানছি?
নগরীতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও তদারককারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ বিষয়ে কথা হয় সংস্থাটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘মূলত নগরীতে সবুজায়নের পরিমাণ বাড়ানো এবং ভূ-গর্ভস্থ পানি রিচার্জের উদ্দেশে নগরীতে গড়ে উঠতে যাওয়া ভবনগুলোর জন্য এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু এটা কেউ মানছে না। ৫০ শতাংশ জায়গা খালি রেখে ভবন নির্মাণ হয় কিন্তু সেখানে যে সবুজায়ন করার বিধান রয়েছে এটা কেউ মানছে না।’
কিন্তু কেউ না মানলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ কি আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুযোগ অবশ্যই আছে। কিন্তু ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে যেখানে সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় না, সেখানে সবুজায়ন না রাখার জন্য অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে। এরজন্য মানুষের জনসচেনতা প্রয়োজন।
বর্তমানে ঢাকা শহরে গড়ে উঠতে যাওয়া ভবনগুলোর খালি জায়গায় সবুজায়ন কিংবা ওয়াটারবডি নির্মাণের উদ্যোগ চোখে পড়ছে বলে জানান বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন। তিনি বলেন,‘ চট্টগ্রামে কেন যে হচ্ছে না তা বোধগম্য হচ্ছে না। ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বাধ্যবাধকতা করে দেয়ার পরও তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। এখানে সিডিএকে আরো শক্তিশালী ভূমিকায় মাঠে থাকতে হবে।’
সেই সবুজায়ন জায়গায় কি করার বিধান রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফুলের বাগান বা গাছপালা লাগাতে হবে। কিংবা জলাধার নির্মাণ করবে। তবে কোনোভাবেই সেই জায়গা ইট সিমেন্ট দিয়ে কার্পেটিং করা যাবে না। কারণ কার্পেটিং করা হলে ভূ-গর্ভস্থ পানি রিচার্জ হবে না এবং সবুজায়ন থাকবে না।
নগরীর ভূ-গর্ভস্থ পানি নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত বলেন,‘ নগরীর পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে মাটির ঘনত্ব যেমন কমে যাচ্ছে তেমনিভাবে পরিবেশও উত্তপ্ত হচ্ছে। সেজন্যই একটি প্লটে সবুজায়ন রাখার কথা বলা হয়েছে।’
দেশে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদার (আয়তনের ২৫ শতাংশ) অর্ধেকও সংরক্ষিত বনভূমি নেই, আবার যেটুকু রয়েছে সেগুলোও দিন দিন সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ছেড়ে দিতে হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোহাম্মদ জগলুল হোসেন। তিনি বলেন,‘ বনভূমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে সরকার ছাদ বাগান কিংবা প্লটে সবুজায়ন রাখার বিধান চালু করে। এর মাধ্যমে প্রতিটি প্লট বা বাড়ি থেকে যদি দিনে অন্তত ১০ মিলিগ্রাম পানিও প্রশ্বেদন আকারে বায়ুমন্ডলে যুক্ত হয় তাহলে পরিবেশ কিছুটা হলেও মানুষের উপযোগী থাকতে সহায়ক হবে।’
তিনি আরো বলেন, নগরায়নের কারণে একসময়ের বনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের পরিবেশের প্রয়োজনেই সবুজায়ন রাখতে হবে।
অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে বর্তমানে নগরগুলো একেকটি হিট আইল্যান্ডে রুপান্তরিত হচ্ছে জানিয়ে বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ২০০৮ সালে জাতিসংঘের চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. আতিক রহমান বলেন,‘ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারাবিশ্বে তাপমাত্রা বেড়েছে। সেই অনুযায়ী এখানকার তাপমাত্রা বেড়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির হারের প্রভাব গ্রামের চেয়ে শহরে বেশি। শহরে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এখানে সবুজায়নের পরিমাণ কম। তাই এখানে গরমও বেশি অনুভূত হয়।’
তিনি আরো বলেন, নগরে জায়গা স্বল্পতার কারণে ভবনে যে পরিমাণ জায়গা খালি রাখার দরকার তা রাখা হচ্ছে না। এতে বাতাসের চলাচলের রাস্তা যেমন বন্ধ হচ্ছে তেমনিভাবে গরমের মাত্রাও বাড়ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এদেশে পড়ছে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু স্থানীয়ভাবে আমরা নিজেরা নিজেদের আবহাওয়া কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমরা নগরগুলোতে যে পরিমাণ পুকুর-দীঘি বা জলাশয় ছিল দিন দিন তা ভরাট করে ফেলছি। নগরীর পাহাড়গুলো কেটে নির্মাণ করছি ভবন। উপকূলীয় এলাকার বনায়ন কেটে কোথাও শিপ ইয়ার্ড কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প নিচ্ছি। এতে উত্তপ্ত হচ্ছে পরিবেশ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শহরাঞ্চলের এই বাড়তি তাপ ধারণ করার জন্য অনেক উন্মুক্ত স্থান ও জলাধার ছিল। এসব জলাধারগুলো আবহাওয়াকে শীতল রাখতো। কিন্তু নগরায়নের থাবায় ভরাট হয়ে গেছে এসব জলাধার। এর ফলেও নগরীতে বাড়ছে গরমের মাত্রা। আর তা থেকে রক্ষা পেতে শহরে উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ যেমন বাড়াতে হবে তেমনিভাবে বন্ধ করতে হবে জলাধার ভরাট ও পাহাড় কাটা।
আজ বিশ্ব আবহাওয়া দিবস। এবারের বিশ্ব আবহাওয়া দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সূর্য, পৃথিবী এবং আবহাওয়া’। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ভিডিও, স্লাইড ও আবহাওয়া যন্ত্রপাতি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করবে।