সত্যিকারের জনদরদী নেতা ছিলেন

ড. অনুপম সেন

পাঁচ দশক ধরে তাকে আমি চিনি। তার সাথে পরিচয় ৬০ এর দশক থেকে। পাকিস্তানের লাহোরে ছয় দফা উপস’াপনের পর দেশে ফিরে ঢাকায়ও যেতে পারেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি চট্টগ্রামে এসে লালদীঘি ময়দানে সেই দফা আবারো উত্থাপন করেন। তার সাথে ছিলেন এমএ আজিজ ও জহুর আহমেদ চৌধুরী। এছাড়া যে ছাত্রনেতারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বলীয়ান হয়ে ও তার শিষ্য হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তার মধ্যে ছিলেন মৌলবী সৈয়দ ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।
বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর সহায়ক হয়ে যারা সারা বাংলাদেশে মিটিং-মিছিল করেছেন, দেয়ালে পোস্টার লাগিয়েছেন এবং গ্রেফতার হয়েছেন তার মধ্যে একজন ছিলেন এই মহিউদ্দিন চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে ৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অন্যায়ের প্রতি সরব ছিলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
১৯৭৫ সালের আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদ জানান মৌলবী সৈয়দ ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। কিন’ এই প্রতিবাদের জন্য হত্যা করা হয় মৌলবী সৈয়দকেও। মহিউদ্দিন তখন দেশের বাইরে গিয়েও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যান তিনি। সেই সময় কলকাতায় থেকে কখনো পত্রিকা ফেরি করে, কখনো চা বিক্রি করেছেন তিনি।
পরে ১৯৮১ সালে যখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীও তখন ফিরে এসে তার সাথে যুক্ত হন। নেতৃত্ব দেন দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর জলচ্ছ্বাসে যখন লাখ লাখ লোক মারা গেলো, কর্ণফুলী নদী আর সমুদ্র তীরে মৃতদেহগুলো পড়ে ছিলো। মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজের হাতে সেইসব মৃতদেহ তুলে এনে দাফন করেছেন। ডায়রিয়ার প্রকোপে মৃতপ্রায় হাজার হাজার লোককে মুসলিম হলে স্যালাইন দিয়ে শুশ্রুষা করেছেন তিনি। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এসব দৃশ্য আমার চোখে দেখা।
এরপর ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রামের মেয়র হয়ে বদলে দিয়েছেন এই নগরীকে। ৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছেন তিনি। চট্টগ্রামে টেকনিক্যাল কলেজ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস’্যকেন্দ্র খুলেছেন। দুটি হাসপাতাল চালু করেছেন।
গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে অনেক মেয়ে পুড়ে গেছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাদের নিয়ে এসে নিজ হাতে দাফন করেছেন। রাস্তাঘাট যারা পরিষ্কার করে সেই মেথরদের
তিনি নাম দিয়েছেন সেবক। কারণ তারা আমাদের সেবা করেন। নিজের টাকা দিয়ে সেবকের ছেলেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন।
বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে বস্তির অনেক মেয়ে মারা যেতো। তাদের জন্য তিনি যাত্রীসেবা সহজলভ্য করেছেন। চট্টগ্রামে কোনো মরদেহ পরিবহনকারী গাড়ি ছিলো না। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকাকালে এ ধরনের গাড়ি তিনি জোগাড় করেছিলেন। তার এই উদ্যোগের জন্য পুরো চট্টগ্রামবাসী সুফল ভোগ করেছে। যারা এই রাজনীতিবিদকে অপছন্দ করতেন, তাদের মৃতদেহও এই মরদেহ পরিবহনকারী গাড়িতে বহন করা হয়েছে।
সত্যিকারের মানবদরদী কোনো নেতা যদি থেকে থাকে, মহিউদ্দিন চৌধুরী তার একজন। তিনি রাগতেন। কিন’ কিছুক্ষণ পরেই তার রাগ চলে যেত।
বন্দর দখলের প্রতিবাদ আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন এই জনদরদী নেতা। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। বন্দর দখলের জন্য বাইরে থেকে ভীষণ চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিলো। ভেতরে ভেতরে বঙ্গবন্ধু তনয়াও এতে সম্মত ছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী তখন মামলা করেন। নিজ দলের বিপরীতে অবস’ান নেন এই নেতা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াতে এক সাহসী উদ্যোগ নেন সাবেক এই মেয়র। আগে আগ্রাবাদ হয়ে হালিশহর, অলঙ্কার, একে খান সড়ক দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যেতে হতো। তিনি এই যাত্রা সংক্ষিপ্ত করে খুলশীর মধ্য দিয়ে জাকির হোসেন রোড চালু করেন। তার এই উদ্যোগের জন্য বিভিন্ন মহল তার প্রতি নাখোশ ছিলো। তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা দায়ের করা হয় শুধুমাত্র এই সড়কটি নির্মাণের জন্য।
এমন একজন নেতার কি আর তুলনা আছে? তিনি সড়কের মাঝখানে গাছ লাগিয়ে পুরো নগরীকে সবুজ করেছেন। প্রতি বছর বৃক্ষমেলার প্রচলন তিনিই করেছেন। আর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিজয় মেলার প্রচলনকারীও এই মহিউদ্দিন চৌধুরী।
মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার ছাত্র ছিলেন। তিনি বলতেন, চট্টগ্রামের জন্য, বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমি কাজ করতে চাই। এই দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে করতে মরতে চাই। এই চট্টগ্রামেই আমি মরতে চাই।
স্বাধীনতা আমাদের হাজার বছরের অর্জন। এই অর্জনে যারা সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। নেতা অনেক আছে। কিন’ বিশ্বের খুব কম নেতাকেই জনদরদী বলা যায়। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের জনদরদী নেতা।
অনুলিখন: কামরুন নাহার সানজিদা