সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হোক

রায়হান আহমেদ তপাদার

ভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। শিক্ষকদের পরে আরও নিশ্চয়ই একাধিক গ্রুপ রয়েছেন যারা নিজেদের স্বার্থ আদায়ে মরিয়া হয়ে আন্দোলন করবেন। সরকার কিভাবে কয়টি গ্রুপের দাবি কতখানি মেনে নেবে সেটা সরকারই ভাল জানেন কিন’ আমাদের কাছে লক্ষণটি নেতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে। সরকারকে রাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে, দলীয় স্বার্থ বা কায়েমী র্স্বাথবাদীদের স্বার্থে নয়। রাষ্ট্র সবার উপরে। রাষ্ট্রের স্বার্থকে উপেক্ষা করে সরকারি ব্যবস’াপনা তথা নীতি-কৌশলগুলোকে প্রভাবিত করে কেউ যদি ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চয়তা পেতে চায় সেটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কতখানি মজবুত তা নিয়ে নানাজনের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।অনেক ক্ষেত্রেই টাকার অভাবে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন’ সরকারের অনেক ক্ষেত্রে খরচের বাহার দেখলে দেশে টাকার কোন অভাব আছে বলে মনে হয় না। সরকার সমপ্রতি ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য প্রত্যেক উপসচিবকে ৩০ লক্ষ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেয়া এবং এই গাড়ি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে আরও ৫০ হাজার টাকা করে সরকারের কাছ থেকে ভাতা হিসেবে প্রদানের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে কতখানি সুফল আসবে, সেই প্রশ্ন অনেকের। এর দ্বারা জনগণের কি লাভ হবে?
উপসচিবদের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার এই ‘মগের মুল্লুক’ মার্কা সিদ্ধান্ত সরকারের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। শোনা যাচ্ছে তারাও এই সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তাদের আবেদন গৃহীত না হলে তারাও আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন।
আমাদের মত অর্থনীতির দেশে এটা কতখানি বাস্তবসম্মত কিংবা এটাই আমাদের সরকারি ব্যয় সংকোচনের উত্তম উপায় কি না তা নিয়ে জনমনে বিস্তর সংশয় রয়েছে। সরকারের টাকা যোগান দেয় জনগণ। সরকারের মাথাভারী প্রশাসনের বিশাল ব্যয় মেটাতে দেশের সাধারণ মানুর হিমশিম খাচ্ছেন। সে কারণে জনগণের কষ্টের টাকার উপর ট্যাক্স বসিয়ে অর্জিত অর্থ ব্যবহারে সরকারের ‘অগ্রাধিকার’ আরও গণমুখী হওয়া দরকার। অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ ইস-্য রয়েছে টাকার অভাবে যা করা যাচ্ছে না। সরকারকে সেগুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আমরা সবাই জানি, গতবছর সরকারি কর্মচারিদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, সেই বেতন পুনরায় বাড়ানোর জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কমিটি গঠন করেছে। এর উপরে আবার নতুন করে সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত গাড়ি লাভের সুযোগ! তাও আবার শুধু প্রশাসনিক ক্যাডারদের জন্য। এভাবে শুধু তাদেরকে সন’ষ্ট রাখলেই কি সব কূল রক্ষা হবে? সরকারি কাজে দায়িত্বরত সকল কমকর্তা-কর্মচারির জন্য বৈষম্যহীন নীতি থাকা অপরিহার্য। শিক্ষা, স্বাস’্য, কৃষির মতো ক্যাডারসহ ২৭টি ক্যাডার কর্মকর্তাদের এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার প্রভাব সরকারি কাজে পড়বে। যার সামগ্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জনগণের জীবনযাত্রার উপর।
তাছাড়া ঢাকায় শহীদ মিনার পাদদেশে বেতন বৈষম্য কমানোর দাবিতে শিক্ষকদের আমরণ অনশন শেষ হয়েছে। আলোচনা করে দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী। তবে নেতাদের এই অনশন ভাঙার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষকেরা। আমরা শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষেই দেখতে চাই, রাজপথে নয়।
সরকারের দায়িত্ব শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সমাজসহ সকলের জন্য একটি বৈষম্যহীন নীতি কাঠামো তৈরি করা যাতে কাউকেই আর আন্দোলনের জন্য রাজপথে নামতে না হয়। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষকরা সেই মেরুদণ্ডের বিকাশ ঘটান। একজন মন্ত্রী কিছুদিনের জন্য মন্ত্রী। কিন’ একজন শিক্ষক চিরদিনের জন্য শিক্ষক। তিনি অবসর নিলেও শিক্ষক। দুনিয়ার সকল সমাজেই শিক্ষকগণ বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এটাই শিক্ষক জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। তবে শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অবস’ার উন্নয়নটাও প্রাসঙ্গিক। আমরা কোনভাবেই শিক্ষকদের কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে দিতে চাই না। রাষ্ট্রকে সেটা নির্মোহভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষকদের দাবির ন্যায্যতা আছে কি নেই বা কি উপায়ে তাদের মনে জমে থাকা বৈষম্যবোধ কমিয়ে আনা যায়, সেটা সরকারকেই ভেবে দেখতে হবে। তাদের সাথে বসে আলোচনা করে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। ভেবে দেখতে হবে, শিক্ষকেরা যে দাবি তুলেছেন তার কতখানি অর্থনৈতিক আর কতটা তাদের সামাজিক মর্যাদা ও বিরাজমান বৈষম্যমূলক ব্যবস’াপনা অবসানের সাথে সম্পর্কিত।
আমাদের সংবিধান একটি বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে। তাই শুধু শিক্ষক নয়, সমাজের কোন স্তরেই বৈষম্য থাকা উচিত নয়। বৈষম্য ছিল বলেই ১৯৭১ সালে আমাদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কিন’ একটি বৈষম্যহীন, মানবিক সমাজ এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। সকল ধরনের শোষণ ও বৈষম্য অবসানের সেই ন্যায্য সংগ্রামের জন্য তাই আমাদের নতুন ভাষায়, নতুনভাবে শ্লোগান ধরতে হবে
যদিও সাধারণভাবে বেতন ঠিক করার অধিকার চাকরীদাতার, কর্মচারির নয়। সরকার কাকে কতটাকা দিবেন সেটা সরকারি বেতন কমিশন অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত। এখানে ব্যক্তির ইচ্ছা বা পছন্দ-অপছন্দের কোন গুরুত্ব নেই। তাহলে এই আন্দোলন কতখানি যৌক্তিক এমন প্রশ্ন কেউ কেউ হয়তো করতেই পারেন। কিন’ আন্দোলন করে দাবি আদায়ের শিক্ষাটা আমরা অতীতে আমাদের সমাজ থেকেই শিখেছি। বলা হয়ে থাকে, সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না। আন্দোলন করে দাবি আদায়ের নজির রয়েছে বলেই মানুষ আন্দোলন করে। বৈষম্য অবসানের জন্য আওয়াজ তোলা যে কারোরই মৌলিক অধিকার। ভাল সরকারের দায়িত্ব হলো আন্দোলনরত গোষ্ঠীর সাথে আলোচনায় বসা। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক উপায়ে সকল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মানসিকতা দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তিশালী ভিত তৈরি করা সম্ভব নয়। শিক্ষকদের আন্দোলন সরকারবিরোধি নয়। শিক্ষকেরা দাবি জানাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, বলছেন তাঁর আশ্বাসই পারে সমস্যার সমাধান করতে। সরকারের উচিত এই আস’ার ভিত্তিকে কাজে লাগানো। আমরাও চাই সংলাপ। অবিলম্বে আলাপ-আলোচনা করে যৌক্তিকভাবে সংকট নিরসন করতে হবে। আমরা সরকারের কাছে মানবিক পদক্ষেপ চাই। শহীদমিনারের পাদদেশে শিক্ষকগণ শুয়ে ছিলেন, এটা আমাদের কাছে স্বস্তিদায়ক ছিল না।সাধারণভাবে বেতন বাড়ানো এবং বিরাজমান বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামোর সংশোধন এক কথা নয়। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ এবার কিন’ বেতন বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করছেন না। তারা আন্দোলন করছেন বৈষম্য কমানোর জন্য।
সরকারের জন্য সেটা করা অবশ্য কর্তব্য কারণ আমাদের সংবিধান একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। সরকার সংবিধানের বিধি-বিধান মান্য করতে বাধ্য। সুতরাং বৈষম্যে নিরসনে দাবি যদি যৌক্তিক হয় তাহলে সরকারকে সেটা অবশ্যই মানতে হবে। সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনেকেই আছেন যারা এই সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য সচেষ্ট। ষড়যন্ত্রের জাল চারিদিকে পাতা। সাবধানে পা ফেলতে হবে নইলে ধরা খাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। যারা প্রশাসন চালান তারা একটুখানি বাড়তি সুবিধা চাইতেই পারেন কিন’ বিনিময়ে জনগণ কি পাবে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জনগণ তাঁদের জন্য টাকার যোগান দিবেন কেন? যে দেশে এখনও কুলখানিতে এসে, যাকাতের শাড়ি নিতে এসে ভিড়ের চাপে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মানুষ প্রাণ হারায় সেই দেশে বিলাসিতা খাতে আমরা কতখানি ব্যয় করব সেটা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে তা না হলে একটা ফাঁপা, অন্তঃসারহীন উন্নয়নের ঢোল আমরা বাজাতেই থাকব। জনগণের দুর্ভাগ্য তাতে কিছুই লাঘব হবে না।
রাষ্ট্র কোথায় টাকা খরচ করবে, কোন প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাবে সেটা দলীয় স্বার্থে নির্ধারণ করা ঠিক নয়। রাষ্ট্রের স্বার্থ তথা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অধিকার সবার আগে। ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যয় না বাড়িয়ে সেই অর্থটুকু সকলের জন্য শিক্ষা, স্বাস’্য, খাদ্য নিরাপত্তা, বাসস’ান ইত্যাদি খাতে ব্যয় করাটা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আমরা সংশ্লিষ্টদের এই কথাটা মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমাদের জনগণ উদার বটে কিন’ তারা বোকা নয়। যদি কেউ স্বেচ্ছায় নিজের কাজের দ্বারা নিজেকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিতে চায় তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের কিছু করার থাকবে না।
উল্লেখ্য, এক শ্রেণির কায়েমী স্বার্থবাদী ব্যক্তির সীমাহীন লোভ ও ক্ষমতার অপব্যবহার যেন দেশের মানুষের গলার কাঁটা না হয়ে ওঠে সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের সজাগ দৃষ্টি দেয়ার অনুরোধ জানাই। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বৈষম্যহীন, মানবিক এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাই। সরকার যদি বৈষম্যহীন, সর্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভ্রুক্ষেপ না দেয় তাহলে জনগণ তাঁর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই আগামীতে নতুন ভাষায় শ্লোগান ধরতে বাধ্য হবে। সেটাই যৌক্তিক। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি। রাষ্ট্রের সকলকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষকগণ আমাদের চেতনার বাতিঘর। আর বাংলাদেশের প্রাণ আমাদের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও কৃষক সমাজ। প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, সুস্বাস’্য নিশ্চিত করা, সকলের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরী দক্ষতা নিশ্চিত করার মত গণমুখী প্রকল্পগুলোতে ব্যয় না বাড়িয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে রাষ্ট্রের টাকা ব্যয় করার মত বিলাসিতা আমাদের সাজে না।
লেখক : কলামিস্ট