সংস্কৃতি ও মোতাহের হোসেন চৌধুরী

মোহাম্মদ আজম
Untitled-1

মোতাহের হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশের ভাগ্যবান লেখকদের একজন। ব্যাপারটা মোটেই এ নয় যে, তিনি যতটা খ্যাতি পেতে পারতেন, তারচেয়ে বেশি পেয়েছেন। বরং বলা উচিত, তিনি যথার্থ সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। বাংলাদেশের মননশীল লেখকদের খুব ছোট্ট তালিকায়ও তাঁর ঠাঁই হয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক হিসাবেও তিনি সবসময়েই স্বীকৃতি পেয়ে আসছেন। এ দুটোই আসলে তাঁর পরিচয়। তিনি মননশীল। তিনি প্রাবন্ধিক। প্রথমটির জন্য তাঁর প্রধান ঋণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে, আর দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে তিনি প্রধানত প্রমথ চৌধুরীর অধমর্ণ। তাঁর প্রবন্ধগুলোতে এ দুইয়ের সমন্বয় ঘটেছে।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দুটি। একটি সংস্কৃতি-চিন্তা, অন্যটি শিক্ষা-চিন্তা। একদিক থেকে বলা যায়, তিনি আসলে সংস্কৃতি নিয়েই ভেবেছেন এবং লিখেছেন। অন্য বিষয়গুলো তো বটেই, এমনকি শিক্ষা সম্পর্কিত তাঁর প্রধান বিবেচনাও আসলে সংস্কৃতি-চিন্তারই নামান্তর। কথাটা একটু খুলে বলা যেতে পারে। শিক্ষার একটা উপযোগিতার দিক আছে। বাস্তবলিপ্ততার ব্যাপার আছে। অনেকের কাছে, বিশেষত নব্যউদারনীতিবাদীদের কাছে, আজকাল দ্বিতীয়টিরই প্রাধান্য। পুরনো লিবারেল জমানায়ও এ ধরনের চিন্তার মানুষ ঢের ছিলেন। কিন্তু শিক্ষার আরেকটা দিক আছে, সেদিকটি বাস্তব উপযোগিতার কথা অস্বীকার না করেও জোর দেয় অন্তরের সাধনা ও বিকাশের উপর। মোতাহের হোসেন চৌধুরী এ ঘরানার শিক্ষা-চিন্তক ছিলেন। তিনি রুটি-রুজির কথা উল্লেখ করেছেন বটে, কিন্তু সবসময়েই জোর দিয়েছেন মনুষ্যত্বের বিকাশের ধারণায়। আর মনুষ্যত্বের বিকাশ বলতে তিনি যা বোঝাতেন, তা তাঁর সংজ্ঞায় সংস্কৃতি-সাধনারই নামান্তর। ফলে মোতাহের হোসেন চৌধুরীকে যে অনেকে সংস্কৃতি-সাধক আখ্যা দিয়ে থাকেন তা মোটেই অযথার্থ নয়।
তিনি শিখা গোষ্ঠীর তরুণতর সদস্য। এ গোষ্ঠীর সদস্যরা নজরুল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু চিন্তার ধরণ, পদ্ধতি আর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের অবলম্বন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিখা গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে আবুল হুসেনের মতো লোকও ছিলেন, যিনি সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে অনেক বেশি লিপ্ত ছিলেন। বেশ কতকটা বিজ্ঞানলিপ্ত কাজী মোতাহার হোসেনও ছিলেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এঁরা সবাই ছিলেন সাহিত্যপ্রবণ। কথাটার মানে এ দাঁড়ায় যে, ব্যক্তির চরম বিকাশ ছিল তাঁদের মূল অন্বিষ্ট, আর সেই বিকশিত ব্যক্তির ভাবনা-প্রাণনা প্রকাশিত হবে সাহিত্যে – এই ছিল তাঁদের চিন্তার এবং চিন্তা বিস্তারের মূল পদ্ধতি। এঁদের চিন্তার পদ্ধতি সম্পর্কে আরো বলা যায়, ভাবনাটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক – এ অর্থে যে, বিকশিত ব্যক্তির গুণই চুঁইয়ে পড়বে সমষ্টির মধ্যে, আর এভাবে আলোকিত করবে দশকে। তার মানেই হল, পদ্ধতিটি অবরোহী।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সংস্কৃতি কথা’য় এ দুইয়েরই নিপুণ সমাবেশ ঘটেছে। সংস্কৃতি বলতে সমাজবিজ্ঞান বা নৃবিজ্ঞানে যা বোঝানো হয়, অথবা, সংস্কৃতি কথাটার মধ্যে যে সামষ্টিকতা আছে, এ প্রবন্ধের ধারণা তা থেকে মেরুদূর। জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক কর্মকাণ্ডেই সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে বলে মনে করা হয়। কিন্তু মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংজ্ঞা ধরলে বলতে হয়, সামষ্টিকতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠার নামই সংস্কৃতিবান হওয়া। কথাটা অনেকটা শিল্পভোগের ক্ষমতা অর্জনের মতো। নিষ্ঠার সাথে সাধনা করলেই কেবল এই উপভোগের ক্ষমতা জন্মায়। ঠিক তেমনি ব্যক্তিত্ব হাসিলের জন্য নিষ্ঠাবান সাধনাই ভেতরের ভোঁতা আর জৈবিক ব্যাপারগুলোকে পাশে সরিয়ে দিয়ে বা জয় করে মার্জিত স্বভাব আর রুচি তৈয়ার করতে পারে।
সংস্কৃতি সম্পর্কে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এ চিন্তার মধ্যে একটা জনবিচ্ছিন্নতার ব্যাপার আছে। রাজনৈতিকভাবে এ চিন্তা তাই মোটেই নিরীহ ব্যাপার নয়। উদারনীতিবাদী চিন্তার যে ধারা ‘আধুনিক’ পশ্চিমে শত শত বছর ধরে বিকশিত হয়েছিল, ‘বিকশিত মানুষে’র ধারণার ছত্রছায়ায় যে চিন্তা থেকে ‘অবিকশিত’ জনগোষ্ঠীকে উপনিবেশিত করা বৈধ বিবেচিত হয়েছিল, আর উপনিবেশিত কলকাতার ভদ্রলোকশ্রেণির মধ্যে যার এক ধরনের প্রকাশ ও বিকাশ দেখা গেছে, চৌধুরী তার সাক্ষাৎ উত্তরসূরি। এ ব্যাপারে তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা বোধ হয় সতর্ক ছিলেন না। কিন্তু দুটি কথা বলতেই হয়। প্রথমত, তাঁর কল্যাণচেতনার কোনো কমতি ছিল না। তিনি মনে করতেন, এভাবেই মানবমুক্তি সম্ভব। দ্বিতীয়ত, মানুষের বিকাশ সম্পর্কে এটি একটি বিশিষ্ট চিন্তাধারা। বাংলা ভাষায় সম্ভবত মোতাহের হোসেন চৌধুরীই এ ধারার চিন্তার সর্বোত্তম সাহিত্যিক প্রকাশক।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক