সংস্কৃতিকর্মী

হাসান শহীদ

ওর সাথে আমার পরিচয় হয়েছে কলেজে পড়তে এসে। ছাত্রাবস’া থেকে আমি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলাম। ও সময় ওকে আমি রাজনীতিতে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। মানে ওর স্কুল জীবনে। ’৬২ তে যখন ছাত্র আন্দোলন হচ্ছিল সে সময় ও দৃশ্যে ছিল না। কিন’ পরবর্তীকালে কলেজে এসে দেখলাম, আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম তবে পরবর্তী সময়ে আমাকে সিটি কলেজে ভর্তি হতে হয়। তখন ওর সাথে আমার পরিচয় হয়। প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছি ও ছিল অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে যা সচরাচর দেখা যেত না। ছাত্রজীবনের মহিউদ্দিনের সাথে পরবর্তী জীবনের মহিউদ্দিন চৌধুরী কিছু ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায় না। ছাত্রজীবনে ও ছিল অত্যন্ত ভদ্র, নম্র। পরবর্তী জীবনে মহিউদ্দিন অনেক জোকস্ করতো, গালাগাল করতো বলেও শুনেছি। তবে তা তার ছাত্রজীবনের সাথে সম্পূর্ণ ডিফারেন্স, ওতো ছিল অত্যন্ত মার্জিত এবং কর্মঠ। সত্যিকার অর্থে তা বলা যায় কর্মবীর। ও সাহিত্যের ছাত্র ছিল না, সাহিত্যচর্চা করতো না কিন’ প্রকাশনার প্রতি ওর অত্যন্ত আকর্ষণ ও আগ্রহ ছিল। তখনকার সময়ে ছাত্রলীগের যে প্রশংসনীয় প্রকাশনাগুলো হয়েছিল তার পেছনে ওর অবদানটিই বেশি। টাকা সংগ্রহ করা, প্রেসে যাওয়া, লেখা সংগ্রহ করা ইত্যাদি সে করতো। এখন হয়ত এসব অনেকে জানে না। পরে রাজনীতিতে নিজেকে সম্পূর্ণ জড়িয়ে ফেললেও প্রকাশনার প্রতি ওর আকর্ষণ ছিল বেশি। আপনি খেয়াল করবেন ও স্বাধীনতার পর একটি দৈনিক পত্রিকাও বের করেছিল আন্দোলন নামে। আমার মনে আছে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুতে ও শিরোনাম করেছিল, ‘নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’।
গ্রহণের কাল, কিংসুক নামে একুশের একটি সংকলন করেছিল। এটা ওর ব্যতিক্রমী দিক সেটা অনেক জানে না। আমি খুব ঘনিষ্টভাবে জানি, তার সাথে অনেক সময় কাটিয়েছি, কম্পোজ করা, প্রিন্ট করা সব কাজই সে করতো। এক পর্যায়ে ও একটা প্রেস দেবে এমন ভাবনাও ওর ভেতর কাজ করতো। এটা স্বাধীনতার আগে বলছি।
তারপর পরবর্তীকালে রাজনীতিতে আসল। ও ফুলহার্টেটলি রাজনীতি করতেন। পরবর্তীকালে ও শ্রমিক রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়। একটা বিষয় বলতে হয়, ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে থাকলেও আমি কিন’ কখনো ছাত্রলীগের সদস্য হইনি কখনো। তবে ছাত্রলীগের এইসব প্রকাশনার পেছনে আমার সামান্য ভূমিকা আছে। হেনা ইসলাম আর মহিউদ্দিন অর্থ সংগ্রহ করা, প্রেসে থাকা, কম্পোজ করার কাজগুলো করতো। এসব ওর ব্যতিক্রমী কাজ। সাধারণত ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে তা দেখা যেত না। ছাত্র ইউনিয়নের কিছু কর্মী এসব করত।
ও যখন শ্রমিক রাজনীতি করতো, তাও আন্তরিকভাবে করত। বিশেষ করে লবণ শ্রমিকদের সাথে কাজ করতো। ও ছিল জহুর আহমদ চৌধুরীর ঘনিষ্ট । জহুর আহমদ চৌধুরী যেহেতু শ্রমিক রাজনীতি করতে বিশেষ করে ডক শ্রমিকের নেতা ছিলেন। আরেক নেতা ছিলেন জামশেদ সাহেব। এদের সংস্পর্শে এসে ও শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এই যে জহুর হকার মার্কেট হলো সেই হকারদের সংগঠিত করেছিল সে।
ওই সময়ের আমার যে স্মৃতি তাহলো ও ছিলো নেহায়েত এক ভদ্রলোক। খুবই শোভন আচরণ করতো সবার সাথে। এখনতো অনেকের ভেতর তা নেই। সে সময়ের অনেক ছাত্রনেতার তা ছিল না। এখন শুনে অনেকে ভাবতে পারে যে আমি গল্প করছি। আসলে তা না, সত্যিকার অর্থে সে ওরকমই ছিল। যার ফলে আমার সাথে ঘনিষ্টতা হয়েছিল। আমার অধিকাংশ বন্ধু-বান্ধুব ছিল ছাত্র ইউনিয়নের। ওরা জিজ্ঞেস করতো ওর সাথে আমার কী করে হয়। একটা মজার ব্যাপার এসএম ইউসুফ আমার খাস বন্ধু ছিল। সে ধরে নিয়েছিল মহিউদ্দিন একটু রাফ ধরনের হবে। তাই একদিন বলেই বসল, তুই ওর সাথে মিশিস কীভাবে। আমি বললাম, তুইতো ওকে চিনিস না। ওর আরেকটা দিক আছে, ওর সেই দিকটা আমার খুব ভালো লেগেছে। আসলে নিবেদিতপ্রাণ ছাত্রনেতা বলতে যা বোঝায় তা ওর সাথে যারা মিশেছে তারাই উপলব্ধি করেছে। পরবর্তীকালে যা হয়েছে। যুদ্ধকালীন ওকে যে গ্রেফতার করে পাকিস্তানি আর্মি তখন ওর ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল। সেটা আমি জানতে পেরেছি মোছলেম উদ্দিনের কাছ থেকে। সেও একই সাথে গ্রেফতার হয়েছিল। মহিউদ্দিনকে কী অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে তা অবিশ্বাস্য। ওর বুকে ভারি বাটখারা চাপিয়ে দেওয়া হতো। তা দিয়ে তার বুকে আঘাত করা হতো। পোর্ট থেকে মাল খালাসের কাজও করানো হয়েছিল তাকে দিয়ে। ফলে তাতে তার কিছুটা মানসিক সমস্যাও হয়েছিল। যখন ও ভারতে চলে গেল সেখানে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। সুস’ হয়ে সে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিল। যদি সংক্ষেপে বলতে হয় আমি বলব, মহিউদ্দিন ছিল কর্মবীর। যে কোনো কাজে সে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ওর সময়ে ওর মতো এতো ভভ্র, নম্র ছাত্রনেতা খুবই কম ছিল। এটা একেবারে সত্যভাষণ। আজ অনেকে বলে সেতো স্ল্যাং ভাষা বলতো, হাসি-ঠাট্টা করতো অনেক গালিগালাজও করতো। কিন’ ছাত্রজীবনে ওর মুখে আমি কখনো গালাগাল শুনিনি।