সংস্কতি ও জীবন

সাইফ চৌধুরী

বৃহৎ রাজনৈতিক বিপর্যয়ে মানবজাতির অগ্রগতিতে যে ক্ষতিসাধন হয়েছে তা যদি কেউ পরিমাপ করেন তবে একথা তাঁকে মনে রাখতে হবে যে, সংস্কৃতি তার সর্বোচ্চ স্তরে একটি কোমল ও সুন্দর চারাগাছ। মানব সমাজে প্রচলিত আচার ব্যবহার, রীতি-নীতি, চাল-চলন, কথা-বার্তা প্রভৃতির সমন্বয়ে যে বিশেষ পরিবেশ গড়ে উঠে তাকে সংস্কৃতি বলে। সংস্কৃতি শব্দটি খুবই সরল বলে মনে হলেও একই সময়ে অনুভূতির দিক থেকে এটি খুবই বিস্তীর্ণ এবং অস্পষ্ট।
সংস্কৃতি শব্দটি বয়সে অতি নবীন। ১৯২২ সালের আগ পর্যন্ত “কালচার” এর প্রতিশব্দ হিসেবে “কৃষ্টি” শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ১৯২২ সালেই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সংস্কৃতি শব্দটির প্রতি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রবীন্দ্রনাথ কালচার এর প্রতিশব্দ হিসেবে “সংস্কৃতি” শব্দটির ব্যবহার “কৃষ্টি” শব্দের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য বলে অনুমোদন জ্ঞাপন করেন। যদিও তারপরে দীর্ঘ অনেক বছর ‘সংস্কৃতির ’ চেয়ে ‘কৃষ্টি’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বেশি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। কিন’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষ্টির জায়গা দখল করেছে ‘সংস্কৃতি’।
সংস্কৃতি শব্দটি আজ নানাভাবে ব্যবহৃত হয়ে বাংলা শব্দ জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। সংস্কৃতি সমাজতান্ত্রিক নয়, ব্যক্তিতান্ত্রিক। এটি বংশগত উপাদান এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায়। একজন স্বতন্ত্র লোক তার সমাজ থেকে যে বিশ্বাস, রীতি, কলা-কৌশল, খাদ্যাভ্যাস ও দক্ষতা লাভ করে তার সমষ্টিকে আমরা সংস্কৃতি বলে জানি। এগুলো তার নিজের সৃষ্টি না বরং আনুমানিক বা ধারাবর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে অতীত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বস’র মতন তার কাছে এসেছে। নিজেকে মহান করো, সুন্দর করো, বিচিত্র করো এ-ই সংস্কৃতির উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্যের সফলতার দিকে নজর রেখেই তা সমাজতন্ত্রের সমার্থক। সমাজতন্ত্র তার কাছে লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ।
সংস্কৃতি ব্যক্তিতান্ত্রিক এ কথা বললে এ বুঝায় না যে, সংস্কৃতিবান মানুষ সমাজের ধার ধারে না, সে দলছাড়া, বা গোত্র ছাড়া জীবন সুতরাং নিজের স্বার্থের দিক নজর রেখেই সংস্কৃতিবান মানুষ সমাজের কথা ভাবে এমনকি প্রয়োজন হলে সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেও প্রস’ত থাকে। সংস্কৃতিবান মানুষ ব্যক্তিতান্ত্রিক এই অর্থ যে, সমাজ বা অর্থনীতির কথা ভেবে সে নিজের অসৌন্দর্যকে ক্ষমা করে না এই সমাজে। সে চায় নিজের সৌন্দর্যবোধের সম্পূর্ণ উন্মোচন, নিজের প্রতিভার সম্পূর্ণ বিকাশ। এই জন্যে শুধু সমাজের দিকে তাকিয়ে নিজেকে প্রকাশ করা তার মনঃপুত নয়। জীবনের শ্রেষ্ঠ ও বহুভঙ্গিম প্রকাশ নিজের দিকে তাকিয়েই হয়, সমাজের দিকে তাকিয়ে নয়।
সাহিত্য, শিল্প, সংগীত কালচারের উদ্দেশ্য নয়- উপায়। সমাজ সাধারণভাবে মানুষকে সৃষ্টি করে। মানুষ আবার নিজেকে গড়ে তোলে শিক্ষাদীক্ষা ও সৌন্দর্যসাধনার সহায়তায়। এই যে নিজেকে বিশেষভাবে গড়ে তোলা এরি নাম সংস্কৃতি। তাই সংস্কৃতিবান মানুষ স্বতন্ত্রসত্তা। নিজের চিন্তা, নিজের ভাবনা, নিজের কল্পনার বিকাশ না হলে সংস্কৃতিবান হওয়া যায় না। সেজন্য লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে সংস্কৃতি সম্পূর্ণই মানবীয় ব্যাপার। জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে মানুষের নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করার যে প্রবণতা, চিন্তা ও প্রয়াস লক্ষ করা যায় তারই মধ্যে নিহিত থাকে তার সংস্কৃতি। ব্যক্তির জীবনে যেমন তেমনি সমষ্টির জীবনেও সংস্কৃতির চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। সংস্কৃতির মর্মে আছে উন্নত হওয়ার ও উন্নত করার, সুন্দর হওয়ার ও সুন্দর করার এবং সমৃদ্ধ হওয়ার ও সমৃদ্ধ করার প্রবণতা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও চেষ্টা।
সংস্কৃতির সঙ্গে সর্ম্পক আছে রুচি, পছন্দ, দৃষ্টি, শ্রুতি, চিন্তাশক্তি, শ্রমশক্তি, সমাজবোধ, পরিপার্শ্ব, বিবেক বুদ্ধি, বিচারক্ষমতা, গ্রহণ-বর্জন ও প্রয়াস-প্রচেষ্টার। কোনো ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর উৎপাদন সামর্থ, ন্যায়নিষ্ঠা, কল্যাণচেতনা, সৌন্দর্যবুদ্ধি এবং উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির চিন্তা ও চেষ্টা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পরিবেশে সর্বোপরি ভৌগোলিক ও জলবায়ুর পার্থক্য অনুযায়ী এ বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বাংলাদেশ, জার্মান, ফ্রান্স, সৌদিআরব, ইংল্যান্ড প্রমুখ দেশের সংস্কৃতির রূপ যেমন ভিন্ন তেমনি বিচিত্র তার ছন্দ। পৃথিবীর সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে কয়েকটি প্রাথমিক বিষয়ে অচ্ছেদ্য বন্ধন রয়েছে। প্রত্যেক জাতির মানুষের মধ্যে কতকগুলো সাধারণ চাহিদা ও অনুভূতি দেখতে পাওয়া যায়। সব মানুষেরই খাদ্য, পরিধেয় ও আশ্রয় প্রয়োজন। সব মানুষই বংশ বৃদ্ধি করে, সন্তান এবং নারীদেরকে রক্ষার বিশেষ তাগিদ অনুভব করে। স্বাচ্ছন্দ ও সামাজিক অবস’ার জন্য কোন না কোন মত অনুসরণ করে। পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে তাই এক “মনস্তত্ত্বিক একাত্মবোধ” রয়েছে। পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস’া যাই হোক না কেন মানুষ তার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে সংস্কৃতির জীব হিসেবে মানুষের সংস্কৃতিবান নামের সার্থকতা এখানেই।
কেবল নৃত্য-গান ও শিল্প সাহিত্য, আবৃত্তি-নাটক, মূকাভিনয়, যন্ত্র সংগীতকে অনেকে সংস্কৃতি মনে করেন কিন’ তা পুরোপুরি ঠিক নয়। এমন ধরনের আচরণের পিছনে রয়েছে সংস্কৃতি সম্বন্ধে একটা খণ্ডিত, অস্বচ্ছ বা ভ্রান্ত ধারণা। এ সবও সংস্কৃতির অঙ্গ বটে, কিন’ এ-সবই শেষ নয়। সংস্কৃতি আরও ব্যাপক, আরো বিস্তৃত, জীবন যাত্রার সঙ্গে আরও সম্পর্কিত। সংস্কৃতি শুধুমাত্র অবসর বিনোদরে উপায় নয়, চিত্ত বিনোদনের ক্ষেত্র নয়। নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক ও শিল্প-সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে যেমন তেমনি দর্শন বিজ্ঞান-ইতিহাসের চর্চা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চিন্তা ও চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত পারিবারিক-সামাজিক, জীবনযাত্রার সকল চিন্তা ভাবনা ও কর্মকাণ্ড ইত্যাদি সবকিছুর মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ও সমষ্টির সংস্কৃতি।
মানুষের সকল চিন্তা, কর্ম ও সৃষ্টিই তার সংস্কৃতির বাহন। কোন জাতির সংস্কৃতির অভিব্যক্তি ঘটে সেই জাতির কৃতি ও কীর্তির মধ্য দিয়ে। একজন সংস্কৃতিবান মানুষ জীবনে যা কিছু করেন তা ভালোবাসার তাগিদে। সত্যকে ভালোবাসা সৌন্দর্যকে ভালোবাসা, বিনা লাভের আশায় ভালোবাসা, নিজের ক্ষতি স্বীকার করে ভালোবাসা- এরই নাম সংস্কৃতি। একজন সংস্কৃতিবান মানুষের নিকট কাজ তার ভালোবাসার অভিব্যক্তি বলে তার আনন্দ আর আনন্দই তার পুরস্কার। সে তার ভালো কাজের মাধ্যমে নিজের স্বর্গটি নিজেই সৃষ্টি করে নেয়।
সংস্কৃতি মানে জীবনে মূল্যবোধ সম্বন্ধে ধারণা। তার জীবনের একটি আলাদা স্বাদ, আলাদা ব্যঞ্জনা থাকে। সে মতবাদীর মতো বুলি আওড়ায় না, তার প্রতিকথায় আত্না স্পন্দিত হয়ে উঠে। যেমন প্রেমের ব্যাপারে, সৌন্দর্যের ব্যাপারে এমন কি সাধারণধর্মী কল্যাণের ব্যাপারেও তার আত্মার ঝলকানি দেখতে পাওয়া যায়। কল্যাণের ব্যাপারে সাম্যকে স্বীকার করলেও প্রেমের ব্যাপারে সৌন্দর্যের ব্যাপারে, চিন্তার ব্যাপারে সে স্বাতন্ত্র্য তথা বৈচিত্র্যের পক্ষপাতী।
সাধারণ লোকের কাছে প্রগতি আর সভ্যতার কোন পার্থক্য নেই। যা সভ্যতা তাই প্রগতি। কিংবা যা প্রগতি তাই সভ্যতা। কিন’ সংস্কৃতিবান লোকেরা তা স্বীকার করে না। উভয়ের সূক্ষ পার্থক্য সম্বন্ধে তারা সচেতন। প্রগতি তাদের কাছে মোটের উপর জ্ঞানের ব্যাপা্র। কেননা জ্ঞানের ক্ষেত্রেই পরিবর্তনশীলতা অবধারিত, সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে নয়। তাই জ্ঞান বিশেষ করে বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানপ্রসূত কল্যাণকেই তারা প্রগতি মনে করেন। কিন’ সভ্যতা শুধু প্রগতি নয়, আরো কিছু। প্রগতির সঙ্গে সৌন্দর্যের সম্বন্ধ, প্রেমের সম্বন্ধ স’াপিত না হলে সভ্যতা হয় না। অতএব, সংস্কৃতির অনিবার্য শর্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। মূল্যবোধ ছাড়া সংস্কৃতি অসম্ভব।
সংস্কৃতি কখনই সি’র, নিশ্চল ও অপরিবর্তনীয় নয়। সবসময় সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। মানুষের নতুন নতুন ভাবনাই প্রভাবিত করে সংস্কৃতির মূল উপাদানগুলোকে, মানুষের সংস্কৃতিকে। কারণ মানবজাতির সংস্কৃতি তার শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সংস্কৃতির মধ্যে বেঁচে থাকার টিকে থাকার যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তাই মানুষের যে কোন শাখার সংস্কৃতিকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে। পক্ষান্তরে কোন নির্দিষ্ট আচার ব্যবহার, কর্মপদ্ধতি, বিশ্বাস প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য অবলুপ্ত বা অপসারিত হলে অধিকতর উপযোগী নতুন বৈশিষ্ট্য তাদের জায়গা দখল করে। কিন’ নতুনের সাহচর্যে পুরানো সংস্কৃতি বহুলাংশে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন’ মূল সংস্কৃতির পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটে না। কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট জাতির প্রত্যেক মানুষের মৃত্যু ঘটলেই সংস্কৃতির প্রকৃত মৃত্যু সম্ভব। উপরের আলোচনায় এটি প্রমাণিত হয় যে, সংস্কৃতির জন্য সাধনার প্রয়োজন আছে সংস্কৃতি আপনাআপনি ধরা দেয় না। সেজন্য প্রয়োজন আছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের। কিন’ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রেম ও ভালোবাসার। সূক্ষ জীবনের প্রতি টান সংস্কৃতির জন্য একান্ত প্রয়োজন।