সংবাদপত্র : পাঠকের প্রত্যাশা ও বঞ্চনা

মো. লোকমানুল আলম

বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার খ্যাত বন্দর নগরী চট্টগ্রাম বিগত তিন দশক ধরে সারাদেশের মানুষের নিকট বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবেও পরিচিত। চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় তার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। যুগে যুগে চট্টগ্রাম জাতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে যে অবদান দীর্ঘদিন ধরে রেখে আসছে তা অনেকের নিকট ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।
চট্টগ্রামের দৈনন্দিন রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন কর্মকান্ডের সংবাদাদি দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখা যায়। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, বিভিন্ন জেলা শহর থেকেও প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তবে, দেশের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকা ‘প্রথম আলো’ও চট্টগ্রাম থেকে বেশ কয়েক বছর ধরে প্রকাশ করছে। ফলত: চট্টগ্রামের পাঠক মহল খুব ভোরে ‘প্রথম আলো’ পাঠ করার সুযোগ পায় বটে, কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় কি সারা দেশের খবরাখবর মেলে ?
চট্টগ্রামের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ঘটে যাওয়া যেসমস্ত অঘটনগুলো পত্রিকায় সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয় তা কি জাতীয় পর্যায়ে বা যেখানে নীতি নির্ধারণকারী অথবা সমগ্র বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এই সমস্ত খবরা-খবরগুলো পায় কি ? অথবা সারা দেশের মানুষ কোথায় কি ঘটছে তা জানে কি ? বা দেশের জটিল এবং কঠিন বাস্তবতার নিরিখে আমরা ও নীতি নির্ধারণকারীরা যে ব্যস্ত জীবনে অভ্যস্ত তাতে কি প্রথম পাতার প্রথম কলাম করে সংবাদ ছাপানো হয়েছে কিন্তু কোন ছবি নাই। প্রথম পৃষ্ঠার ঢাকা সংস্করণে প্রথম পৃষ্ঠার ৪র্থ কলামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত সংবাদ ‘বিক্ষোভের মধ্যে ফল প্রকাশ’ অন্যদিকে চট্টগ্রাম সংস্করণে ৪র্থ কলামে ‘তর্ক করায় গুলি করেন নেতা’ এই শিরোনামে, ঢাকা সংস্করণে ৫ম পৃষ্ঠায় দেশ’র খবর চট্টগ্রামের সংস্করণে চট্টগ্রামের খবর, ঢাকা সংস্করণের ৮ম পৃষ্ঠায় রাজধানীর খবর চট্টগ্রাম সংস্করণে চট্টগ্রামের খবর, ৯ম পৃষ্ঠায়ও ঢাকা সংস্করণে রাজধানীর এবং চট্টগ্রাম সংস্করণে চট্টগ্রামের খবর ছাপানো হয়। এতে একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, চট্টগ্রামের একজন পাঠক সারাদেশে আগের দিন কি ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, অবনতি প্রভৃতি ঘটনা কি হয়েছে তা জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো অঞ্চলভিত্তিক পত্রিকা ছাপানোর ফলে এক অঞ্চলের খবরাখবর অন্য অঞ্চলের মানুষের জানার সুযোগ হচ্ছে না। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের যারা ঢাকায় অবস্থান করেন এবং বর্তমান জটিল ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কর্মব্যস্ত থাকেন তারা চট্টগ্রাম বা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ঘটে যাওয়া জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-আশয়ে এবং যে অঘটনগুলো সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে তা জানা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। চট্টগ্রামের একজন অধিবাসী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ের একটি পত্রিকা কর্তৃক বিভাগওয়ারী বা জেলাওয়ারী এধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ন সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পুরো দেশের চিত্র জাতীয়ভাবে এক মলাটের মধ্যে প্রতিফলিত না করা, বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সংবাদগুলো শুধু চট্টগ্রামের পাঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উপরনু্ত নীতিনির্ধারণী মহলের গোচরীভূত না করে চট্টগ্রামকে অবহেলা ও অবজ্ঞার নামান্তর তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
প্রসঙ্গতঃ সংবাদপত্র সমাজ ও রাষ্ট্রের বিচিত্র কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করে জাতীয় জীবনে সামাজিকীকরণসহ দেশীয় ও ভিনদেশী সমাজ সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের মনের সংকীর্ণতা দুর করে, পারস্পরিক সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও বিশ্বজনীনতার বোধ সৃষ্টি করার যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা তা দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাসমূহে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকা যদি সারা দেশের সংবাদসমূহ অঞ্চলভিত্তিক সংস্করণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে এক অঞ্চলের খবরাখবর সম্পর্কে অন্য অঞ্চলের মানুষ থেকে আড়াল করে রাখে তাহলে যাত্রাকাল থেকে সংবাদপত্র যে ভূমিকা পালন করে আসছে তা কতটুকু সম্পন্ন হচ্ছে তা নিয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমরা চট্টগ্রামের সংবাদপত্র পাঠক হিসেবে এ ধরনের বৈষম্যমূলক সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থেকে পুরো দেশের সংবাদগুলো পাঠককে পড়ার সুযোগ করে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণে শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক