সংঘাতময় বিশ্বে মানবীয় প্রত্যাশা

আহমদ রফিক

বর্তমান বিশ্ব অসি’র, অশান্ত এবং উপদ্রুত। এর পেছনে কাজ করছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভুত্ববাদ যা আধিপত্যবাদী চরিত্রে প্রকাশ পায়। মূলত শক্তিমানের পরদেশ শাসন ও শোষণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অতি মাত্রায় বিকাশের ফলে যে আণবিক অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি হয়েছে, তাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না ঘটলেও আঞ্চলিক যুদ্ধ ঠিকই চলছে। তাতে দেখা যাচ্ছে হিংসাদ্বেষ, বিরূপতা বিরোধিতা, লোভ-লালসা ও আকাঙ্ক্ষার বিপুল প্রকাশ। উদাহরণ অনেক আমাদের চোখের সামনে।
কেন এমন হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাবে মানব প্রকৃতি ও মানবীয় চেতনার নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিষয়টি সামনে চলে আসে। আসে তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ। আর সেখানে অনেকগুলো দিক সংশ্লিষ্ট। মোটা দাগে ব্যক্তি ও সমষ্টি। কিছুটা বিশদ বিচারে ব্যক্তি, শ্রেণি, সমাজ ও জাতিগোষ্ঠী ও জাতিরাষ্ট্র। আসে ধর্মীয় বিশ্বাস ভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ মানব বিশ্বকে সাদাকালো ছকে বিভক্ত করে দিয়েছে এবং রেখেছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিচার ব্যাখ্যায় দেখা যায় মানব প্রকৃতি ও মানব চেতনার দ্বিভাজিত চরিত্র-সু এবং কু, ভালো ও মন্দ এ দুয়ের অস্তিত্ব। এদের মধ্যে যে প্রভাব অধিক শক্তিমান, তারই জিৎ। এ দুইয়ের অস্তিত্ব নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে-বিশেষ করে ভেতরের প্রভাব ও বাইরের প্রভাবকে কেন্দ্র করে। সুনির্দিষ্ট ভাষায় বলতে গেলে মানবদেহ কোষে নিহিত ‘জিন’ প্রভাব এবং পরিবেশ প্রভাব। সে পরিবেশ যতটা প্রাকৃতিক, তার চেয়ে, অনেক বেশি সামাজিক সাংস্কৃতিক।
এ বিষয়টি নিয়েও একসময় যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হয়েছিল প্রধানত গত শতাব্দির চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা পরিবেশ প্রভাবটিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক আদর্শ ও সেই ধারার নীতি। তাই লাইসেংকোবাদ প্রবল হয়ে উঠেছিল মেন্ডেলিয়ান বংশগতি তথা জিনতত্ত্ব অস্বীকার করে।
কিন’ গত পঞ্চাশের দশকে জীবন কুণ্ডলি ডিএনএ, আরএনএ আবিষ্কার ও পরবর্তী গবেষণায় জিনতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার পর এর প্রয়োগ প্রবণতার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে।
ধর্মবিশ্বাস থেকে মানব চেতনার ক্ষেত্রে ‘পূর্ব নির্ধারতি’ তত্ত্বের প্রভাব বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশে কেউ কেউ বিষয়টিকে ধর্মীয় মৌলবাদের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট করতে চাইছেন। এই ‘পূর্ব নির্ধারিত’ তত্ত্বটি বেশ পুরনো, ভাববাদী দার্শনিকদের দান বলা চলে। তাহলে কি মানতে হবে যে একজন ঘাতকের সন্তান তার জিনপ্রভাবে ঘাতক হয়ে জন্মাবে?
না, বিষয়টি এত সরল নয়। তাহলে সমাজে ঘাতকের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যেতো। এখানে আবার সেই পরিবেশ প্রভাবের সত্যতা লক্ষ্য করা যায়। সে প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, শ্রেণি ও সমাজগত। এমনকি জাতীয়তাবোধও যা কখনো কখনো মানব প্রকৃতি ও আচরণকে প্রভাবিত করতে দেখা যায়।
এর বিপরীতে মানব প্রকৃতিতে যে স্নেহ মায়া মমতা ভালোবাসা ও প্রেমের প্রকাশ সেগুলোর প্রভাবও তো কম নয়। ব্যক্তি থেকে পারিবারিক ক্ষেত্র থেকে শ্রেণি, সমাজ ও জাতি পর্যন্ত এর প্রকাশ। বৃহৎ পরিসর বিবেচনায় যুদ্ধের বা সংঘাতের পাশাপাশি শান্তি ও মানব সম্বন্ধ ও মানবপ্রেম শক্তিশালী। তাই হিটলার-মুসোলিনি-তোজো প্রমুখ যুদ্ধবাদীরা যেমন সত্য তেমনি সত্য বিশ্বের শান্তিবাদী মনীষীদের তৎপরতা-গত শতকে রুমী-বাবুল-জিদ-রাসেল-আইনস্টাইন প্রমুখের বিশ্বশান্তি প্রচেষ্টা। এখানে নানা পর্বে রবীন্দ্রনাথ সংশ্লিষ্ট।
মানবীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও এর একটি দিক। প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে এই মানবিক চেতনার জন্ম ও তৎপরতা। এখানেও পূর্বোক্ত ব্যক্তি শ্রেণি এবং সমাজ ও জাতিগত দিকের ভূমিকা রয়েছে। শেষোক্ত দিকটি এখন রাষ্ট্রিক পর্যায়ে পরিণত। তাই প্রাচীন রোমের বিদ্রোহ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাধীনতা বা মুক্তি সংগ্রাম, শ্রেণী শাসন থেকে সুস্পষ্ট সামন্তবাদী শাসনের বিরুদ্ধে শ্রমিক ও কৃষক বিদ্রোহ এবং বিপ্লব মানবীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ঘটতে দেখা গেছে।
এমন এক দ্বিমাত্রিক চরিত্র নিয়ে মানব সভ্যতার বিবর্তন ও বিকাশ। মানবিক ও অমানবিক চেতনার দ্বন্দ্বে দোলায়িত মানবসমাজ। তাই যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে একটি নিশ্চিত তাত্ত্বিক ও আদর্শিক মীমাংসায় পৌঁছনো যাচ্ছে না। মানব বিশ্ব অশান্তি থেকে মুক্ত হতে পারছে না। এই প্রভাব বিশ্ব পরিসর থেকে পরিবারও ব্যক্তিসত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত।
সংঘাতময় এই পরিবেশের বিরুদ্ধে সুস’ পরিবেশ ও শান্তির অন্বেষায় মনীষীদের যেমন আহ্বান, তেমনি লক্ষ করা যায় বৃহত্তর মানব সংখ্যায় শান্তিপূর্ণ সহাবস’ানের প্রবণতা। সভ্যতার সংকট ও মানব অস্তিত্ব নিয়ে এখানটাতেই ভরসার জায়গা। আর মনীষীদের প্রত্যয়-মানব প্রকৃতির মানবিক চেতনার দিকটিই বড় সত্য। এর চরম বিকাশই মানব বিশ্বের রক্ষা কবচ। রবীন্দ্রনাথ তাই শেষমুহূর্তেও মানব মহিমায় আস’া রেখে বলতে পেরেছেন ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে রচিত মানব ঐক্যই মানব প্রজাতিকে রক্ষা করতে পারে।