ওরা বাড়ি এলো নিথর হয়ে

শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে স্বজনদের কাছে গেলো ২৩ মরদেহ

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা
29343239_414782882279083_4939049003030546894_n

ঠিক এক সপ্তাহ আগের দিনটায় তারা উড়াল দিয়েছিলেন। পেশাগত কাজ, বেড়ানো কিংবা হানিমুন- একেকজনের একেক উদ্দেশ্য। অনেকের ছিলো প্রথম আকাশযাত্রা। পাখির মতো উড়ে চলা উড়োজাহাজে উঠবেন বলে কতরকম অনুভূতি। ইমিগ্রেশন শেষ করে উড়োজাহাজে ওঠার তর যেন সইছিলো না অনেকের। মুহূর্তটা স্মৃতির ফ্রেমে বেঁধে রাখতে ইচ্ছেমতো ছবি তুলছিলেন। বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে আনন্দটুকু ভাগাভাগি করতে ছবিগুলো ফেসবুকেও দিয়েছিলেন।
এক সপ্তাহ পরের দিনটায় তারা ফিরলেন। কে জানতো ছবিটা বদলে গিয়ে এমন হবে! এবার আর কোনো অনুভূতি নেই। স্মৃতি বেঁধে রাখার তাড়াও নেই। তারা যে স্মৃতি হয়ে রইলেন। ছবি হয়ে রইলেন। স্বজনদের কান্নার সাগরে ভাসিয়ে তারা পাড়ি দিলেন না ফেরার দেশে। অনেকের সেই প্রথম আকাশযাত্রাই হয়ে উঠেছিলো জীবনেরই শেষযাত্রা।
পাহাড়ঘেরা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শুনতে মুখিয়ে ছিলেন যারা, সেই স্বজনদের হাতেই কাল উঠলো একেকটি কফিন। যে কফিনে বন্দি হয়ে গেলো তাদের সারাজীবনের স্বপ্ন। অনেকের বেঁচে থাকার প্রেরণাও। বুকের ভেতরে বেদনার পাহাড় বয়ে বুঝে নিতে হলো প্রিয়জনের মরদেহ।
১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুতে ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারান ২৬ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে শনাক্ত ২৩ জনের মরদেহ সকল আনুষ্ঠানিকতা সেরে গতকাল দেশে আনা হয়। বিমানবন্দর থেকে মরদেহগুলো নেওয়া হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। এ সময় প্রিয়জনহারা মানুষের গগনবিদারি আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিসি’তির সৃষ্টি হয়।
সেখানে অনুষ্ঠিত জানাজায় নিহতদের স্বজনেরা ছাড়াও কয়েকজন মন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উর্ধ্বতন নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তাঁর সামরিক সচিব, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় সেনাবাহিনীর প্রধান ও বিমানবাহিনীর প্রধান সেখানে উপসি’ত ছিলেন।
গত রোববার থেকেই শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলো দেশে আনার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথম দিকে ১৭ জনের মরদেহ আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যেই আরও ছয়জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হলে রাতে ২৩ জনের মরদেহ প্রস’ত করা হয়। নিহতদের শেষ গোসল করানোর পরে কফিনে রাখা হয়। গতকাল সোমবার সকালে মরদেহগুলো নেওয়া হয় কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে। সেখানে নিহতদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
তারপর মরদেহগুলো নেওয়া হয় ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে; যেখানে অবতরণ করতে গিয়ে ঠিক এক সপ্তাহ আগেই বিধ্বস্ত হয় ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিএস-২১১। ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ৪৯ জন; যার মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহগুলো তোলা হয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ উড়োজাহাজে।
বিকেল চারটার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে মরদেহবাহী উড়োজাহাজটি। সেখানে আগে থেকে উপসি’ত ছিলেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিমান পরিবহন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান, বিমানবাহিনীর প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একে একে নামানো হয় ২৩টি মরদেহ। সোয়া চারটার দিকে ওবায়দুল কাদেরের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করেন বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার। এরপর সেগুলো তোলা হয় বিমানবন্দরে অপেক্ষমান ১৯টি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে।
কফিনের ওপর যুক্ত নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে গাড়িতে মরদেহগুলো ওঠানো হয়। এক নম্বর গাড়িতে ওঠানো হয় ইউএস বাংলার পাইলট আবিদ সুলতানের মরদেহ। পাশেই রাখা ছিলো দুই নম্বর গাড়ি; যেখানে জায়গা হয় ওই উড়োজাহাজের কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদের মরদেহ। বিধ্বস্ত হওয়ার আগে উড়োজাহাজটি তারা পরিচালনা করছিলেন পাশাপাশি থেকেই। এ ছাড়া একটি গাড়িতে একসঙ্গে রাখা হয় একই পরিবারের তিন সদস্য রাফিকুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী সানজিদা হক ও ছেলে অনিরুদ্ধ জামানের মরদেহ। অন্য একটি গাড়িতে জায়গা হয় প্রতিভাবান আলোকচিত্রী এফএইচ প্রিয়ক ও তার শিশু কন্যা তামারা প্রিয়ন্ময়ীর মরদেহ। আরেকটি গাড়িতে একসঙ্গে রাখা হয় বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু ও মো. ইমাম হাসানের মরদেহ।
এ ছাড়া অন্য গাড়িগুলোতে রাখা হয় কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মোহাম্মদ সাফি, শারমিন আক্তার, যাত্রী আহমেদ ফয়সল, বিলকিস আরা, আক্তারা বেগম, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, রাকিবুল হাসান, আঁখি মণি, মিনহাজ বিন নাসির, মতিউর রহমান, এস এম মাহমুদুর রহমান, তাহিরা তানভীন শশী, উম্মে সালমা ও নুরুজ্জামানের মরদেহ।
এরপর অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহগুলো নেওয়া হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন নিহতদের স্বজনেরা। দুপুরে ইউএস বাংলার একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে নেপাল থেকে হতাহতদের স্বজনদের ঢাকায় আনা হয়। সেখান থেকে তারা আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছান। এখানে তাদের অন্য স্বজনেরাও যোগ দেন।
বিকেল ৫টায় মরদেহবাহী গাড়িগুলো আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। গাড়ি থেকে একে একে সবগুলো কফিন কাঁধে করে নামান সেনা সদস্যরা। স্টেডিয়ামের মঞ্চে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় এগুলো। এ সময় প্রিয়জনহারা মানুষদের আহাজারি শুরু হয়। তৈরি হয় বেদনা বিধুর শোকাবহ পরিবেশ। অনেকের বুকফাটা আর্তনাদ আর দীর্ঘশ্বাসে সাধারণ মানুষও শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন।
জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে লাশগুলো স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একেকজনের নাম ডেকে ডেকে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। এ সময় ২৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা আলাদা আলাদা ফাইলে তথ্য সংগ্রহ ও ফরম পূরণ করে ছবি ও পাসপোর্টের তথ্য মিলিয়ে দেখেন।
মরদেহ বুঝে পাওয়ার পর আর্মি স্টেডিয়াম থেকে স্বজনেরা ছুটে চলেন নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির পথে। এর পরের প্রক্রিয়া হবে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে। একদল স্বপ্নবাজ মানুষ পেশাগত কাজে, বেড়াতে কিংবা হানিমুনে যেতে চাইছিলেন হিমালয়কন্যা নেপালে। অবতরণের আগমুহূর্তে উড়োজাহাজের জানালায় উঁকি মেরে দেখছিলেনও পাহাড়ঘেরা শহর। দেখাটা আর শেষ হলো না। নিয়তি তাদের নিয়ে গেলো না ফেরার দেশে। যেখান থেকে এই ভূবনের আর কিছুই দেখা যায় না।