শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম বিশ্বজিৎ ঘোষ

চিরকালের মতো চলে গেলেন সমকালীন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ও প্রাতিস্বিক ব্যক্তিত্ব মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম। চলে গেলেন বটে, কিন’ আমাদের জন্য রেখে গেলেন অতুলনীয় কিছু বৈভব, অনুপম কিছু সৃষ্টি। লেখক, গবেষক, সম্পাদক, সংস্কৃতিকর্মী, শিড়্গাবিদ, সমাজচিনত্মক- সর্বোপরি একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সমকালে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম চিনত্মক ছিলেন মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের এক অগ্রণী মানুষ, পথিকৃৎ চিনত্মাবিদ- কালের সাড়্গী। সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত, কাজী নজরম্নল ইসলাম এবং বাঙালি মুসলিম মানসের আধুনিকায়ন বিষয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সঞ্চার করেছে স্বকীয় মাত্রা। উত্তরজীবনে টেলিভিশন-উপস’াপক হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। এমন একজন গুণী মানুষকে হারিয়ে আমরা বিষণ্ন বিপন্ন বিহ্বল।
মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইতিহাস খ্যাত মহাস’ানগড়ের ঐতিহ্যিক মাটি গায়ে মেখে করোতোয়া নদীর তীরে। ১৯২৭ সালের ১লা মে। কালের দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে বিরানব্বই বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন অননেত্মর পথে। তাঁর জীবন সময়ের দিক থেকেই কেবল দীর্ঘ-নয়। উলেস্নখযোগ্য কর্ম ও সাধনার জন্যও তা বিশিষ্ট। পিতা সা’দত আলী আখন্দের প্রত্যড়্গ তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছিলেন মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম। এরপর তিনি কাটিয়েছেন এক বর্ণাঢ্য জীবন। সে বর্ণাঢ্য জীবনে অনেক পরিচয়ে তিনি ছিলেন বিশিষ্ট। শিড়্গক-গবেষক হিসেবেই তাঁর প্রধান পরিচয়। করাচি, রাজশাহী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনি শিড়্গকতা করেছেন। শেষ জীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে সংশিস্নষ্ট ছিলেন। শিড়্গকতা পেশায় অনন্য অবদানের জন্য মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম জাতীয় অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। তিনি যেমন শিড়্গকতা করেছেন তিন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তেমনি শিড়্গার্থীও ছিলেন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের- কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি। এতগুলো শিড়্গা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যড়্গ সম্পর্ক মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের শিড়্গকতা জীবনকে বর্ণাঢ্য করে তুলতে সাহায্য করেছে। জীবনে তিনি অগণন শিড়্গার্থী তৈরি করেছেন, জাতির শিড়্গা-উন্নয়নে রেখেছেন অনন্য অবদান। শিড়্গক হিসেবে শিড়্গার্থীর চেতনায় তিনি সঞ্চার করতেন শুদ্ধ মানুষ হওয়ার বীজমন্ত্র। ভালো শিড়্গার্থী তৈরি করার চেয়ে ভালো মানুষ সৃষ্টি করার দিকেই ছিল প্রধান নজর। শ্রেণিকড়্গে পড়ানোর সময় শিড়্গার্থীর বোধে-চেতনায় তিনি সঞ্চার করতেন ইতিবাচক জীবনবোধ প্রগতিশীল বিশ্ববীড়্গা।
একজন গবেষক হিসেবে মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। ‘ইবহমধষর গঁংষরস চঁনষরপ ঙঢ়রহরড়হ ধং জবভষবপঃবফ রহ ইবহমধষর চৎবংং’ বিষয়ে ১৯৭১ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। এই অভিসন্দর্ভ তাঁকে উচ্চমানের গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। মুসলিম সমাজচেতনার বিকাশ ও স্বরূপ অনুধাবনে এখন এ বই পালন করছে আকর গ্রনে’র ভূমিকা। তাঁর এই অভিসন্দর্ভটি ‘ইবহমধষর গঁংষরস চঁনষরপ ঙঢ়রহরড়হ’ শিরোনাম নিয়ে প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। একই ধারার তাঁর আর একটি উলেস্নখযোগ্য গবেষণা দু’খ-ে রচিত ‘সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত’ (প্রথম খ–১৯৭৭; দ্বিতীয় খ–২০০৪)। বিপুলায়তন এই গ্রনে’ সাময়িকপত্রে প্রতিফলিত জীবন এবং এ অঞ্চলের মানুষের নানামাত্রিক মত- অভিমত সংকলিত হয়েছে।
মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের আর একটি উলেস্নখযোগ্য গবেষণাকর্ম ‘সমকালে নজরম্নল ইসলাম’ (১৯৮৩)। ১৯২০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যনত্ম বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সাময়িকপত্রে কাজী নজরম্নল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্ম-বিষয়ক রচনার সংকলন ‘সমকালে নজরম্নল ইসলাম’। নজরম্নল-গবেষণায় এ বই
আকর গ্রনে’র মর্যাদা পেয়েছে। কেননা যে সব সাময়িকপত্রে নজরম্নল বিষয়ক রচনা প্রকাশিত হয়েছে, তার অধিকাংশই এখন দুর্লভ। তাই এ বইয়ের শরণ ছাড়া উত্তরকালীন গবেষকদের কোনো বিকল্প নেই।
গবেষণা-গ্রন’ ছাড়াও মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম বিভিন্ন শাখায় বই লিখেছেন। তাঁর বিভিন্ন বইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য: শিশু-কিশোর সাহিত্য: ভীষণ প্রতিশোধ (১৯৫৫), জাপানী ভূত (১৯৫৫); গবেষণা/প্রবন্ধ : মুসলিম বাংলা সাহিত্য (১৯৬৮), মুনশী মোহাম্মদ মেহেরম্নলস্না (১৯৭০), সময়ের মুখ তাঁহাদের কথা (১৯৯৭), আপন ভুবন (২০০১), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০৪); সম্পাদনা: নজরম্নল ইসলাম (১৯৬৯), উচ্চ শিড়্গায় এবং ব্যবহারিক জীবনে বাংলা ভাষার প্রয়োগ (১৯৭৬), আমাদের মাতৃভাষা চেতনা ও ভাষা আন্দোলন (১৯৮৪), বাংলাদেশ : বাঙালি আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (১৯৯০), নজরম্নল ইসলাম : নানা প্রসঙ্গ (১৯৯১), আবহমান বাংলা (১৯৯৩), আমাদের বাঙালিত্বের চেতনার উদ্বোধন ও বিকাশ (১৯৯৪), অমর একুশের প্রবন্ধ (যৌথ, ২০০২), পূর্বমেঘ : নির্বাচিত প্রবন্ধ (যৌথ, ২০০২), শিখা সমগ্র (২০০৩), সেরা সুন্দরম (২০০৭); আত্মজীবী : নিবেদন ইতি (পূর্ব খ–২০০৫, উত্তর খ–২০০৬), অনুবাদ : কাউন্ট অব মন্টোক্রিস্টো (১৯৫৫), বাংলাদেশে মুসলিম শিড়্গার ইতিহাস এবং সমস্যা (১৯৬৯) ইত্যাদি।
মুসত্মাফা নূরউল ইসলামরে বিভিন্ন বইয়ের মধ্যে আত্মজীবনী ‘নিবেদন ইতি’র কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। ‘নিবেদন ইতি’ মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের ব্যক্তি জীবনের কথা, তাঁর হয়ে ওঠার কাহিনী- তবে একথা ও কাহিনী যতটা তাঁর নিজের, তার চেয়ে অনেক বেশি তাঁর কালের কথা, তাঁর সময়ের স্বদেশের কাহিনী। বস’ত, আত্মকথার আড়ালে মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম তুলে ধরেছেন তাঁর সময় ও সমকালকে, দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন তাঁর স্বদেশকে। বাংলাদেশের ইতিহাস আর সংস্কৃতির সঠিক পরিচয় পেতে এ বই পাঠকদের সাহায্য করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার ভুবন। তিনি ‘সংবাদ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন ‘মিলস্নাত’ পত্রিকার। যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত ‘বেগম’ পত্রিকার সঙ্গে। ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ (১৯৪৯) পত্রিকার সঙ্গে তাঁর সংশিস্নষ্টতার কথাও সুবিদিত। জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী এবং মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত ‘পূর্বমেঘ’ (১৯৬০) সাময়িকপত্রের কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উলেস্নখ করতে হয়। ষাটের দশকে পূর্ববাংলায় উন্নত সাহিত্যরম্নচি বিকাশে ‘পূর্বমেঘ’ পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৬০ থেকে ১৯৭১-একটানা এগারো বছর ‘পূর্বমেঘ’ প্রকাশ করেছেন মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম।
‘সুন্দরম’ (১৯৮৬) পত্রিকা সম্পাদনা মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের সাহিত্য সাধনার এক অনন্য কীর্তি। ‘সুন্দরম’ এর প্রতিটি পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকতো তাঁর মেধা মনন রম্নচি আর প্রযত্নের স্বাড়্গর। প্রায়-একাই তিনি পত্রিকার গোটা কাজ করতেন।
নিপুণ হাতে তিনি সম্পাদনা করতেন ‘সুন্দরম’। প্রবীণ-নবীন-উভয় ধরনের লেখকের রচনা ছাপা হতো ‘সুন্দরম’-এ। ‘সুন্দরম’ পত্রিকায় লেখা মুদ্রিত হওয়া এক সময় তরম্নণদের কাছে ছিল আনন্দ আর আবেগের উৎস। এমন ঝকঝকে রম্নচিশীল পত্রিকা উভয় বাংলায় ছিল একেবারে হাতে গোনা। কম-বেশি যা-ই হোক না কেন, ‘সুন্দরম’ এ প্রকাশিত প্রতিটি রচনার জন্য লেখকদের তিনি সম্মানী দিতেন। এটাও স্যারের কাছ থেকে একটা শিড়্গণীয় বিষয়।
রেডিও-টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম রেখে গেছেন একটা স্মরণীয় বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মুক্তধারা’ কিংবা ‘বাঙালির বাংলা’ এটিএন বাংলার ‘কথামালা’ অনুষ্ঠান ছিল অতি জনপ্রিয় শিড়্গণীয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান উপস’াপনায় তাঁর স্বকীয়তা ছিল সবিশেষ আকর্ষণীয়। আর অনুষ্ঠানের বিষয়-নির্বাচন তো ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর ও কৌতূহলোদ্দীপক। ভাবা যায়, অনুষ্ঠানের বিষয় ‘তুমি’, ‘বাজে কথা’, ‘কেমন আছেন’, ‘গুজব’, ‘কিংবা কি কথা তাহার সাথে’? ষাটের দশকে বেতারে নানা অনুষ্ঠান উপস’াপনায় মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম রেখেছেন তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাড়্গর।
মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম আজ আর আমাদের মাঝে নেই- কিন’ আছে তাঁর নানামাত্রিক সৃষ্টিসম্ভার। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি ছিল তাঁর অবিচল আস’া। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তিনি গড়তে চেয়েছেন তাঁর প্রিয় শিড়্গার্থীদের-এই যে মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম, তিনি সব সময় থাকবেন আমাদের সাথে, অনাগত কাল ধরে আমাদের বলে যাবেন এগিয়ে যাবার যথার্থ পথ, দূর থেকে জানিয়ে যাবেন জাতিসত্তার প্রকৃত ঠিকানা।