শেষবারের মতো দেখতে মানুষের ঢল

আইয়ুব বাচ্চুর নামে সড়ক ও সাংস্কৃতিক কমপেস্নক্সের নামকরণ হবে : মেয়র

মোহাম্মদ আলী

চট্টগ্রামের কৃতীসনত্মান সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে শেষবারের মত দেখতে লাইন ধরে অপেড়্গা করেছেন হাজার হাজার ভক্ত। এদের মধ্যে তরম্নণের সংখ্যাই ছিল বেশি। প্রিয় শিল্পীকে এক নজর দেখতে নারী-পুরম্নষ, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা ভিড় জমিয়েছেন।
গতকাল শনিবার সকাল পৌনে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বাচ্চুর লাশ আনা হয় তাঁর নানার বাড়ি মাদারবাড়িতে। রাখা হয় রেলগেট বালুর মাঠে। প্রয়াত শিল্পীকে একনজর দেখতে দূর-দূরানত্ম থেকে দড়্গিণ-পূর্ব মাদারবাড়িতে হাজির হন হাজার হাজার মানুষ।
সরেজমিন দেখা গেছে, পূর্ব মাদারবাড়িতে লাশ নেয়ার পর তা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মরদেহবাহী গাড়িতে রাখা হয়। সেখানে বাঁশ ও রশি দিয়ে লাইনের ব্যবস’া করা হয়, যাতে লাইন ধরে একে একে ভক্তেরা শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
শ্রদ্ধা জানাতে এসে অনেকে যেমন চোখের জলে ভেসেছেন, তেমনি শোকসনত্মপ্ত হয়ে ভক্ত-অনুরাগীরা বাচ্চুর সৃষ্টিকে স্মরণ করেন। অনেকে এসেছেন হাতে বাচ্চুর ছবি নিয়ে।
মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ তিনি আমার প্রিয় শিল্পী ছিলেন। তাই দেখার জন্য অনেক দূর থেকে এসেছি’
মাদারবাড়ি রেললাইন থেকে খরতাপের মধ্যে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে অপেড়্গা করেছেন তারা। বিশৃঙ্খলা এড়াতে ভক্তদের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করেছেন পুলিশ সদস্যরা। বাচ্চুর মরদেহ মামার বাড়িতে ত্রিশ মিনিট রাখার পর সর্বসত্মরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এসময় হাজার হাজার পুরম্নষের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে ভিড় করেন প্রিয় শিল্পীকে দেখার জন্য। পুরো এলাকার নিরাপত্তায় পুলিশ তৎপর ছিল।
উপ-পুলিশ কমিশনার (দড়্গিণ) এসএম মোসত্মাইন হোসেন বলেন, ‘বাচ্চুকে দেখতে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এসেছেন। প্রায় ১০০ জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছে। একটু হুড়োহুড়ি ছাড়া তেমন কোন সমস্যা হয়নি।’
মাদারবাড়ি বালুর মাঠে আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন আঞ্জুমান আরা, রেখা আলম চৌধুরী, তাঁর মামা আবদুল হালিমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতারা।
বিকাল আড়াইটা থেকে পৌনে তিনটার দিকে বাচ্চুর লাশ জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে আনা হয়।
ব্যান্ড সঙ্গীতের উজ্জ্বল নড়্গত্র ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। তিন দশকে দেশের সংগীতাঙ্গনকে দুহাত ভরে উজাড় করে দিয়ে গেছেন আইয়ুব বাচ্চু। অডিও জগতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের গানে পেয়েছেন আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা। সমৃদ্ধ করেছেন ব্যান্ড জগতকে। তবে তাঁর ভাগ্যে জোটেনি কোনো জাতীয় পুরস্কার। প্রয়াণের পর এই কিংবদনিত্ম শিল্পীকে মরণোত্তর পুরস্কারে ভূষিত করার দাবি উঠেছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে মাদারবাড়ির বালুর মাঠে বাচ্চুকে দেখতে এসে এ দাবি জানালেন সোলস-এর প্রাক্তন সদস্য ও বাচ্চুর বন্ধু সুব্রত বড়-য়া রনি।
তিনি বলেন, ‘১৯৮২ সাল থেকে টানা এক দশক সোলসে এক সঙ্গে বাজিয়েছি। অনেক কষ্ট করেছে বাচ্চু। তিন যুগ সঙ্গীতে উজাড় করে দিয়েছে। কিন’ দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়নি বাচ্চুকে।’
সুব্রত বড়-য়া রনি বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামের কৃতীসনত্মান। অনেকের নামে অনেক কিছুই হচ্ছে। তাঁর অকাল মৃত্যু হওয়াতে আমরা এই দাবি করছি। আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি বাচ্চু এতো তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।
মুসলিম হল সাংস্কৃতিক কমপেস্নক্সের কোনো একটি বিভাগ বা কড়্গের নাম আইয়ুব বাচ্চুর নামে করারও দাবি জানান রনি।
এদিকে প্রয়াত ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর নামে নগরীতে বাসত্মবায়নাধীন সাংস্কৃতিক কমপেস্নক্সের নামকরণের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। একই সাথে নগরীর একটি সড়ক আইয়ুব বাচ্চুর নামে নামকরণ করা হবে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে পূর্ব মাদারবাড়ির নানার বাড়িতে আইয়ুব বাচ্চুর লাশ হসত্মানত্মরকালে সিটি মেয়র এ ঘোষণা দেন। এছাড়া আইয়ুব বাচ্চু স্মরণে আবড়্গমূর্তি তৈরি করে নগরের যে কোনো একটি গুরম্নত্বপূর্ণ স’ানে বসানোর ঘোষণাও দেন নাছির।
আনুমানিক দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পূর্ব মাদারবাড়ির নানার বাড়িতে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহবাহী গাড়ি প্রবেশ করে। ১২টা ১০ মিনিটে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ পরিবারের নিকট হসত্মানত্মর করা হয়। পরিবারে পড়্গ থেকে তার মামা আবদুল আলীম মরদেহ গ্রহণ করেন। বাচ্চুর লাশ তার মামার হাতে হসত্মানত্মর করে সাংবাদিকদের দেওয়া সাড়্গাৎকারে মেয়র বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামের কৃতীসনত্মান। বাচ্চুর জন্য একটি সড়কের ও মুসলিম হলের নামকরণসহ যা যা করার দরকার সব নিজ উদ্যোগে করবো। বাচ্চু সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। দেশ ও দেশের মানুষকে প্রচ- ভালোবাসতেন। গানের বাইরেও তিনি উজাড় করে দান করতেন। আজকের দুনিয়ায় এটি বিরল।’
চসিকের উদ্যোগে নাগরিক শোকসভারও আয়োজন করা হবে বলে জানান মেয়র নাছির।
এর আগে শনিবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তাঁর মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স স্কয়ার হাসপাতাল থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। সাড়ে ১০টায় আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে ফ্লাইটটি শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করে। স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে, ছোট ভাই পার্থসহ পরিবারের ২৫ জন সদস্য সঙ্গে ছিলেন। বিকাল পৌনে ৩টা পর্যনত্ম বাচ্চুর লাশ পূর্ব মাদারবাড়ির বালুর মাঠে রাখা হয়। বিকাল ৩টায় নগরের দামপাড়া জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে নেয়া হয় মরদেহ।
গত বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রানত্ম হন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।