চন্দনাইশ

শুক্লাম্বর দীঘির মেলায় লাখো পুণ্যার্থীর ঢল

মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ

আচার অনুষ্ঠান ও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে গতকাল মঙ্গলবার শেষ হয়েছে চন্দনাইশের শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য দীঘি মেলা। প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তিতে দীঘি সংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে বসে প্রাচীন মেলা।
জানা গেছে, শত শত বছর ধরে সনাতনী সম্প্রদায়ের মহামিলন ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে এখানে বসে ঐতিহ্যবাহী শুক্লাম্বর দীঘির মেলা। মনোবাসনা পূরণের মেলা হিসেবে সনাতনী সম্প্রদায়ের লাখো পুণ্যার্থীর ঢল নামে এ মেলায়। মেলা উপলক্ষে ১৪ জানুয়ারি থেকে দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি ও পায়ে হেঁটে মানতের উদ্দেশ্যে মেলায় আসেন দেশি-বিদেশিসহ লাখো ভক্ত। বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান থেকে পুণ্যার্থী আসেন বলে জানান বরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মেলা কমিটির সভাপতি।
দক্ষিণ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পরিমল দেব জানান, জনশ্রুতি আছে প্রায় সহস্রাধিক বছর আগে শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য ত্রিপাঠি নামক এক সাধক ভারতের নদীয়া থেকে চন্দনাইশের বাইনজুরী গ্রামে আসেন। তিনি নিজে অশ্বথের চারা রোপণ করে সেখানে শক্তির আরাধনা শুরু করেন। কঠোর আরাধনায় তিনি ত্রিপুরা দেবীর কৃপা লাভ করে সেই অশ্বথমূলেই সিদ্ধি লাভ করেন। পরবর্তীতে সেখানে খনন করেন বিশাল দীঘি, কালক্রমে যা শুক্লাম্বর দীঘি নামে পরিচিতি পায়। এই দীঘিকে ঘিরেই সনাতনী সম্প্রদায়ের লোকজনের বিশ্বাস যে কোন মনোবাসনা নিয়ে শুক্লাম্বর দীঘিতে পুণ্যস্নান করে অশ্বথ গাছের ডালে সুতো বাঁধলে মনোবাসনা পূরণ হয়। এ বিশ্বাসেই মানত নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির এ সময়ে লাখো পুণ্যার্থী পুণ্যস্নান করেন দীঘির জলে। পাশাপাশি শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্যের উদ্দেশ্যে দীঘির জলে দুধ, বিভিন্ন রকমের ফল উৎসর্গ করেন। অশ্বথ গাছের ডালে সুতো বাঁধেন। এছাড়াও অসংখ্য ছাগল, হাজার হাজার কবুতর উৎসর্গ করেন শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্যের উদ্দেশ্যে।
মেলায় সাতকানিয়ার চরতী থেকে মিলি বিশ্বাস তার ছেলে প্রকাশ বিশ্বাসকে নিয়ে এসেছেন। অশ্বথ গাছের ডালে একজোড়া কবুতর ছেড়ে দিয়ে সুতো বাঁধার সময় কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার ছেলের এবছর এইচএসসি’র ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষায় যাতে সে পাশ করতে পারে সে জন্য ছেলেকে নিয়ে এসেছেন অশ্বথ গাছের ডালে সুতো বাঁধতে। ছেলে পরীক্ষায় পাশ করলে আগামী বছর তিনি আবার এসে বেঁধে দেয়া সুতো খুলে দিবেন বলেও জানান। একই সময় দীঘির জলে এক বোতল দুধ ঢেলে দিলেন লোহাগাড়ার পদুয়া থেকে আসা এক বৃদ্ধা (৭১)। সাথে এসেছেন তার ছেলে বিকাশ দাশ। তিনি বলেন, তার মা প্রতিবছর শুক্লাম্বর দীঘির মেলায় উপসি’ত হয়ে দীঘির জলে দুধ ঢালেন এবং প্রার্থনা করেন।
শুক্লাম্বর মন্দির উন্নয়ন কমিটির সভাপতি হারাধন দেব বলেন, প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তিতে মেলার আয়োজন করি। মেলায় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই আসেন।
এদিকে, মেলার সার্বিক পরিসি’তি পর্যবেক্ষণে ১৪ জানুয়ারি থেকে চন্দনাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কেশব চক্রবর্তীর নেতৃত্বে প্রায় অর্ধ শতাধিক পুলিশ সদস্য মেলায় আগত পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা দিয়ে গেছেন। ফলে কোন ধরনের বিশৃংখলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে মেলা শেষ হয়েছে। মেলায় আগত পুণ্যার্থীদের স’ানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
মেলায় উপসি’ত ছিলেন অধ্যাপক ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী, মাস্টার আহসান ফারুক, কাইছার উদ্দীন চৌধুরী, বলরাম চক্রবর্তী, সালাহ উদ্দীন, নিকুঞ্জ দত্ত, পরিমল মহাজন, অমল ভট্টাচার্য্য, কৃষ্ণ চক্রবর্তী, ডা. কাজল কান্তি বৈদ্য, প্রদীপ দেব, আশীষ দেব, বিপ্লব চৌধুরী, অদ্ধেন্দু দত্ত, মধুসুদন দত্ত, বাদল ধর, নারায়ন ধর, টিংকু ধর প্রমুখ।