শিশু নির্যাতন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন

শিশুরা ফুলের মতো। একজন শিশু পৃথিবীতে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার নিয়েই জন্মায়। অথচ আজকের সমাজ বাস্তবতায় এই কোমল ও পবিত্র প্রাণগুলো নানান অনাচার, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার। পিতা-মাতার শত স্বপ্নঘেরা শিশুটি কোনো না কোনো বিবেকবর্জিত, রুচিহীন ব্যক্তির লালসার টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। ধর্ষণ, হত্যা কিংবা অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। দিন-দিন শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে।
একবিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজব্যবস’ায় শিশু নির্যাতনের এমন চিত্র আমাদের মনুষ্যত্বকে আজ প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। পত্র-পত্রিকার পাতা উল্টালেই জানা যায় অহরহ নৃশংস ঘটনার শিকার এসব বর্ণনা।
সমপ্রতি বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) আয়োজিত ‘স্টেট অব চাইল্ড রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতনের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক! প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২৮টি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে। আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে ৪৯টি। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, ২০১৭ সালে দেশে ৩৩৯টি শিশুহত্যা ও ৫৯৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা গত বছরের চেয়ে যথাক্রমে ২৮ ও ৩৩ শতাংশ বেশি। আর শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়েছে ৭ শতাংশ। মোট ৩ হাজার ৮৪৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১০ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। ৮৯৪ শিশু যৌণ নির্যাতনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বর্তমানে ২ কোটি ৬০ লাখ শিশু দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে যাদের সাতটি মৌলিক চাহিদা পূরণের সামর্থ নেই। অপরদিকে বর্তমানে ৩৪ লাখ শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৩২ লাখ ৭২ হাজার ৭৭৯টি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এবং এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৯০টি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কমর্রত। আর ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সঙ্গে জড়িত। বাস্তবে শিশু নির্যাতনের এই হার আরো অনেক বাড়বে কেননা মিডিয়ায় আসে না বা কোন সংস’া জানতে পারে না এমন ঘটনা দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত ঘটছে।
বর্তমানে অতীতের তুলনায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বেড়ে চলেছে। কিছু রুচিহীন ও পৈশাচিক পাষণ্ড সুযোগ পেলেই ধর্ষণ করছে শিশুদেরকে। আজকাল তিন-চার বছরের ছোট ছোট শিশুও ধর্ষিত হচ্ছে। শিশুরা নিজ ঘরে, বাইরে এমন কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যন্ত নির্যাতিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন। এদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের শিশু, পথশিশু এবং গৃহকর্মী শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত এখন তাদের আছে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
শিশুদের প্রতি এমন নৃশংস আচরণেই বুঝা যায় সামাজিক মূল্যবোধ আজ তলানিতে। এমন অবস’া চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজকে আরও খারাপ পরিসি’তির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। এসব বিষয়গুলো সার্বিক বিবেচনায় এনে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি।
মূলত বিচারহীনতা ও সুস’ দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বাড়ছে। অপরাধীরা যদি পার পেয়ে যায় তাহলে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে, তাতে সন্দেহ নেই। শিশুর অধিকার সুরক্ষায় যথেষ্ট আইন থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ মানুষই জানে না, শিশুদের ওপর নির্যাতন করা হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। শিশুর ওপর যে কোনো ধরনের নির্যাতন বন্ধে সরকার, সুশীল সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস’া (এনজিও) সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং শিশু বিষয়ক জাতীয় থেকে আঞ্চলিক পর্যায়ের কমিটিগুলো আরো সক্রিয় ও গতিশীল করা দরকার।
শিশুদের প্রতি যত্নবান হয়ে, দেশের স্বার্থেই তাদের সুস’-সুন্দর এবং স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে। এই দায়িত্ব পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের। অপার সম্ভাবনা ও স্বপ্ন নিয়ে যে শিশুর নিরাপদে বেড়ে উঠার কথা সে কেন নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হবে? শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে হলে প্রথমেই তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সভা-সেমিনার, মিডিয়ায় শিশু নির্যাতন বিরোধী প্রচারণা জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এই ধরনের শিশু নির্যাতন অনেকাংশেই কমে আসবে। মোটকথা, যেভাবেই হোক, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কারণ আজকের শিশুরাই একদিন এই দেশ এবং জাতির কর্ণধার হিসেবে গড়ে উঠবে।