শতবর্ষে লায়নইজম ও বিশ্ব লায়ন্স সেবা দিবস- ২০১৭

শিশুদের জন্য আমরা

ডা. এম.জাকিরুল ইসলাম

শতবর্ষ আগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাব বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেবা সংগঠন। বর্তমানে বিশ্বের ২১০টি দেশে ৪৭৬৮৭ টি ক্লাব ৮৮৪ লায়ন্স জেলার আওতায় প্রায় ১৪ লক্ষ, পঞ্চাশ হাজার লায়ন্স সদস্যবৃন্দ সেবা কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত আছেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে ও মানব ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে মানুষ যখন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে জীবন সংগ্রামের দিক নির্দেশনা খুঁজে ক্লান্ত সেই ক্রান্তিলগ্নে ১৯১৭ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের মানবহিতৈষী এক বীমা কর্মকর্তা মি. মেলভিন জোন্স এর উদ্যোগে এবং নেতৃত্বে অসামপ্রদায়িক এবং অরাজনৈতিক যেই সেবা সংগঠন যাত্রা শুরু করেছিল, তা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সর্ববৃহৎ সেবা সংগঠন আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাব। বিশ্বের প্রায় ১৪ লক্ষ, ৫০ হাজার লায়ন সদস্য- সদস্যা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও, কোন না কোন সময়ে মানব কল্যাণে সেবা কর্ম পরিচালনা করে চলেছেন। বিশ্বখ্যাত হেলেন কেলারের আহ্বানে লায়নরা সারা বিশ্বে ১৯২৫ সাল থেকে অন্ধত্ব নিবারণ কার্যক্রম সফল বাস্তবায়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।
১৯১৭ সালের ৭ জুন আমেরিকার শিকাগো শহরের বীমা কর্মকর্তা স্যার মেলভিন জোন্স এর নেতৃত্বে অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক সেবা সংগঠন লায়ন্স ক্লাবস্‌ ইন্টারন্যাশনাল এর জন্ম। ১৯১৭ সালের ৮ অক্টোবর লায়নবাদের উদ্দেশ্যাবলী, নীতিমালা ঘোষনার মাধ্যমে ২২টি ক্লাবের সমন্বয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক লায়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিকাগো শহরের লাসিলি হোটেলে। পরবর্তীতে ৮ অক্টোবর সারা বিশ্বের লায়ন সেবা দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। আজ থেকে সুদীর্ঘ ১০০ বছর পূর্বে লায়নইজম নামে যে সেবার বীজ বপন করা হয়েছিল, কালের পরিক্রমায় সেই বীজ থেকে চারা অঙ্কুরিত হয়ে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
১৯৫০ সালের মধ্যভাগে লায়ন্সক্লাব ইউরোপ, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে বিশ্বের ২১০টি দেশের ৪৬৭৬৮ টি ক্লাবের ৮৮৪ লায়ন্স জেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রায় ১৪লক্ষ, পঞ্চাশ হাজার লায়ন্স সদস্যদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মানব কল্যাণমূলক সেবাকর্ম পরিচালনা করে চলেছে। বর্তমান ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ুখঘ. উজ. ঘঅজঊঝঐ অএএঅজডঅখচ তিনি ভারতীয় নাগরিক। তিনি ডাক দিয়েছেন ‘ডঊ ঝঊজঠঊ’.
বাংলাদেশের লায়নইজম এর জনক লায়ন মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী।
তিনি ১৯৬২-৬৩ ও ১৯৬৩-৬৪ সালে সেবা বর্ষে ডিস্ট্রক্ট ৩০৫ ই পাকিস্তানের লায়ন্স জেলা গভর্নর নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের লায়নইজম এর শুভ সূচনা করেন। তিনি ১৯৭২-৭৩ ও ১৯৭৩-৭৪ সেবা বর্ষে পর পর ২ বছর জেলা গভর্নর নির্বাচিত হন। তিনি সবার মাঝে বাংলাদেশের লায়নইজমের জনক নামে পরিচিত। তিনি বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
লায়ন্স জেলা ৩১৫-বি-৪ এর সফল নেতৃত্ব দিচ্ছেন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী ব্যক্তিত্ব লায়ন মো. মনজুর আলম মনজু -পি.এম.জে.এফ। তাকে সহযোগিতা করছেন ১ম ভাইস জেলা গভনর্র লায়ন নাসির উদ্দীন চৌধুরী ও ২য় ভাইস জেলা গভর্নর নারীনেত্রী লায়ন কামরুল মালেক- এম.জে.এফ।
কেবিনেট সেক্রেটারি দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করছেন লায়ন জাফর উল্লাহ চৌধুরী ও কেবিনেট ট্রেজারার দায়িত্ব পালন করছেন লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বর্তমানে লায়ন্স জেলা ৩১৫-বি-৪ এর অধীনে ১০২ ক্লাবের প্রায় ২৬০০ জন লায়ন সদস্য সর্বদা সেবা কার্যক্রমে ভূমিকা পালন করছে।
শতবর্ষে লায়নইজম ঃ
১৯১৭সালে যে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করেছিল তা ২০১৭ সালে ১০০বৎসর পূর্তি করতে যাচ্ছে। সঠিক নেতৃত্বে, মেধা, যোগ্যতা, সময়োপযোগী কার্যক্রম এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণে এই সংগঠনটি একশত বছর টিকে আছে, এই একশত বৎসরে তার সেবার ব্যাপ্তি বেড়েছে যা আজ বিশ্বের ২১০টি দেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে তেমনিভাবে বিপুল সংখ্যক অসহায় বঞ্চিত মানুষ সেবা পেয়ে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে।
খরড়হং ঈষঁনং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ এর একশত বৎসর পূর্তি উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-এই সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৪-২০১৫ সেবা বর্ষ হতে ২০১৬-২০১৭ সেবাবর্ষ পর্যন্ত লায়নরা বিশ্বব্যাপী তাদের অন্যান্য সেবাকর্ম ছাড়াও নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে ১০০ মিলিয়ন সেবা কর্ম বাস্তবায়ন করবে –
অন্ধত্ব নিবারণ ) – ২৫ মিলিয়ন।
ক্ষুধা নিবারণ – ২৫ মিলিয়ন।
পরিবেশ রক্ষা – ২৫ মিলিয়ন।
তারুণ্যের জন্য কার্যক্রম – ২৫ মিলিয়ন।
বর্তমান ইন্টারন্যশনাল প্রেসিডেন্ট ৪টি কাজের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
1. Diabetis
2. Environment
3. Hunger Relief
4. Pediatric Cancer
শিশুদের জন্য আমরা
পৃথিবীতে একজন মানবশিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার পুরো পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। শিশু সবার আদরযত্নে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে। মায়ের কোলে শিশুর হাসি চাঁদের হাসিকেও হার মানায়। মনে রাখতে হবে আজকের শিশু আগামী দিনের পিতা মাতা। তাকে আদর্শভাবে গড়ে তুলতে হবে। কবির ভাষায় ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুরই অন্তরে’।
আমরা লায়ন, আমরা সামাজিক, আমরা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করি, আমরা অসাম্প্রদায়িক, আমরা বৈশ্বিক, আমরা শিশুর মতই অকপট। আমাদের আছে একটা সংবেদনশীল মন, আমরা সেবা দেই একত্রে, আমাদের শক্তি প্রভূত-ধনে এবং দানে।
শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে সহযোগিতা।
নিরক্ষরতা ও অপুষ্টি নিরসনে সহযোগিতা
প্রাথমিক শিক্ষা ও নিরাপদ বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মোকাবেলায়, যুদ্ধকালীন সময়ে শিশুদের রক্ষা এবং চরম দারিদ্র্যেতায় মা ও শিশুদের রক্ষায় রাষ্ট্রীয় আহবানে সহযোগিতা।
শিশু নির্যাতন (শারীরিক, মানসিক ও যৌন), কন্যাশিশুভ্রূণ হত্যা, ক্ষতিকর শিশুশ্রম, শিশুর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিক্রয়, শিশু পাচার, শিশু বিক্রয়, শিশু বেশ্যালয় এবং শিশু পর্নোগ্রাফি ইত্যাদির বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ ।
প্রতিবন্ধী (শারীরিক ও মানসিক) শিশুদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা।
আসুন, আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শিশুদের জন্য এই যুগোপযোগী ডাক সার্থক করে তুলি।

লেখক : ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর
লায়ন্স ক্লাবস্‌ ইন্টারন্যাশনাল
লায়ন্স জেলা ৩১৫-বি-৪, বাংলাদেশ।