শিলাইদহ ঘাটের গল্প

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম

শিলাইদহ ঘাট! চমৎকার নাম তো জায়গাটার। পাবনা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর ধার ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট একটি ঘাট। ইন্টারনেট জগতের কেইবা এর খবর রাখে। সুন্দর ছিমছাম পরিবেশ, বেড়ানোর মত জায়গা পাবনা শহরের ধারে পাশেই রয়েছে। পদ্মা নদীর ঘাট হওয়ায় পাবনা এবং কুষ্টিয়ার অনেক মানুষ প্রয়োজনেই এপার ওপার হচ্ছে।
আওয়াল এ নাম কখনো শোনেনি। শিলাইদহের নাম অনেক শুনেছে। ছোটবেলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কতবার পড়তে হয়েছে। শিলাইদহ কোন জেলায়? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত সালে এখানে এসেছিলেন ইত্যাদি। শিলাইদহ সবাই চেনে। এমন কোনো বাঙালি নেই যে শিলাইদহ চেনে না! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহ ছবি ও গল্পের সেই জায়গা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি জীবনই নয়, এখানেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর কালজয়ী সাহিত্য। শিলাইদহে বসেই গীতাঞ্জলির অনুবাদ করেছিলেন । পদ্মা নদীর প্রতি দুর্বার আকর্ষণ ছিল কবিগুরুর । শিলাইদহ ও পদ্মার প্রতি কবিগুরুর ছিল গভীর অনুরাগ, ছিন্নপত্রাবলীতে এর পরিচয় আছে। কবি একটি চিঠিতে লিখেছেন: ‘আমার যৌবন ও প্রৌঢ? বয়সের সাহিত্যরস-সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মা-প্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।’কিন্তু আলম যখন শিলাইদহ ঘাটের কথা বলেছিল, আওয়াল অবাক হয়ে গিয়েছিল! শিলাইদহ ঘাট! খেয়া পারাপার তাও আবার পাবনা কুষ্টিয়ার মধ্যে। পাবনার লঞ্চঘাটের পাশে শিলাইদহ ঘাট বলে কোনও জায়গা আছে, সেটাই অদ্ভুত লাগল।
আলম উচ্চস্বরেই হাসতে হাসতে বলছিল, আওয়াল মামা, তুমি ওই সারাজীবন ইতালি লন্ডন করে বেড়াও। পাবনা আর দেখতে হবে না।
শোন ফাজলামি করবি না। পাগলের দেশে কি দেখব । আমাকে খ্যাপাবি না। আওয়াল ক্রোধের সুরে বলেছিল।
সামাদ বারণ করলেও না শোনার মতো অবস্থা আর নেই। কোনো আপত্তিই আর ধোপে টেকেনি। অগত্যা সবাইকে যেতেই হল শিলাইদহ ঘাটে।
দুই দুইটা মোটর বাইক পথের ধুলো উড়িয়ে ঘাটের শেষ দোকানটায় এসে থামল। শের আলীর দোকান। কলা, বিস্কুট, চা, পান, সিগারেট সবই পাওয়া যায়। নির্জন কোলাহলমুক্ত পরিবেশ। কোনও মানুষজনের ভিড় নেই। দোকানের পাশেই শিলান্যাস শিলাইদহ ঘাট,কুষ্টিয়া। যদিও এর পূর্ব নাম খোরশেদপুর। কিন্তু লোকে তা এখন আর চেনে না। ইউনিয়ন শিলাইদহ বলেই হয়ত এর নাম এরকম হয়েছে। আলম জানালো ওর পূর্বপুরুষেরা এখান থেকেই পাবনা গিয়ে বসবাস শুরু করেছে।
দোকানে বসেই একটু আড্ডা জমে গেল। জীবন বিবর্ণ নাকি বর্ণময়! মাঝে মাঝে আওয়াল এ রকম তাত্ত্বিক বিষয় ছুড়ে দেয়। বুঝতে পারি জীবনের একটা বড় সময় ইউরোপ প্রবাসে থেকে সংসার জীবনের প্রতি খানিকটা বিরাগ জমেছে। আড্ডাটা জমে ওঠার আগেই ওপার যাবার আহ্বান সামাদের। আমার অবশ্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন খারাপ লাগছিল না। নদীর পাড়ে দোকানে বসে চোখ যতদূর যায় দেখা যাচ্ছে চরের দৃশ্য! খাড়া বালির পাড়। দু মাস আগেই বর্ষা চলে গেছে। চারিদিকে চর জেগে উঠেছে। আলম আমার ইতস্তত ভাব দেখে বলতে লাগল, মামা তোমার কি সাহিত্য রস জেগে উঠল। না সাহিত্য নয়। তবে নির্জন জায়গা , দূর থেকে দেখা নদী আকাশ .. বলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে দুজনে দেখলাম একঝাঁক বক কোথাও যেন উড়ে যাচ্ছে। আলম তুই তো গানের পোকা। দেখতো ওই বকগুলো উড়ে যাওয়া দেখে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানটি কেমন লাগে, কোনও দিন বলাকারা/অত দূরে যেত কী/ওই, আকাশ না ডাকলে? এই গানটি কি তোমায় রোমান্টিকতা স্পর্শ করছে না। যদিও বা আমার বেসুরো কণ্ঠ। অনেকটা আবৃত্তির স্টাইলেই প্রথম অন্তরা শেষ করলাম। এরই মধ্যে সামাদ আর আওয়াল মোটর বাইক নীচে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অগত্যা বকের যাওয়া পথ আর মৃদুমন্দ বাতাস না খেয়ে আওয়ালের পেছনে গিয়ে বসলাম।
নদীর পাড় থেকে মেঠো রাস্তা চরের দুর্ভেদ্য বালি, কাদা মাটিকে অতিক্রম করে চলে গেছে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পন্টুন বাঁধা ঘাটের উপর। দেখলাম, সেখানে নদীপারাপারের মাঝারি সাইজের নৌকা।
জং ধরা পন্টুন থেকে একটু দূরে নামলাম। সামনে আদিগন্ত পদ্মা নদী। পানির নাব্যতা নেই, নেই জোয়ার ভাটার টান। ছোট্ট একটা ধারা মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে কাশবনের ফালি। শুধু সাদা সাদা। আকাশের সমস্ত সাদা রং নেমে গেছে কাশবনে। কিন্তু আওয়াল খানিকটা ভড়কে গেছে নৌকায় মোটর বাইক তোলা নিয়ে। ছোট চেলা কাঠের গুড়ির উপর দিয়ে মোটর বাইক নিতে হবে নৌকায়। এ যেন সেই সার্কাস খেলায় দুরন্ত মোটর বাইক চালানো। প্রথম ধাক্কায় আওয়ালের বুকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু শেষ মেষ পারেনি। সামাদকেই তুলতে হল। আওয়াল থমকে গেল, আর ভীষণ রাগে বলতে লাগল এমন নিস্তব্ধ দুপুরে কোথায় এল ও! আলম পাখি, প্রকৃতি, পদ্মার বিবর্ণতার গল্প শুনাতে ব্যস্ত। ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলতে শুরু করেছে। এদিক ুওদিক চরের পাখির কিচির মিচির শব্দ কানে আসছে না। আলম বলতে লাগল এর পরের বার ইঞ্জিনবিহীন নৌকায় আসতে হবে। আচমকা বাজখাই কর্কশ শব্দে একটা পাখি ডেকে উঠল । কী অদ্ভুত পাখির ডাক এটা! কোন পাখি এমন করে ডাকে! নজর ভেদ করে পাখি দূরে মিলে গেল। আবারও বুকটা কেঁপে উঠল আওয়ালের। ভয়, মোটর বাইক নামাতে পারবে তে। তার সাথে যোগ হয়েছে মূল পদ্মার স্রোতের টান, হাল্কা ঢেউ। নৌকার দুলুনিতো আওয়ালের অবস্থা তথৈবচ! আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল শব্দটা যেমন হঠাৎই কানে এল, তেমনই আবার মিশে গেল বিকেলের নির্জনতায়। আলম বলল এটা হল বক পাখির কান্না! ওর সঙ্গী কোন ধোঁকায় পড়েছে।
ধোঁকা সেটা আবার কি? আমার উৎসুক ভাব দেখে আলম বলতে লাগল এক ধরনের নকল বক তৈরি করে চরে সাজিয়ে রেখে বকদের প্রতারণা করা হয়। এটাই ধোকা। আমি বুঝতে পারলাম না শুনে সামাদ একটু পরিষ্কার করে দিল। বলল তুমি ওই যে হংস বলাকার কথা বলছিলে না। বকেরা সাধারণত ওপর থেকে নীচের দিকে দেখে কোথাও তাদের সঙ্গী বা স্বজাতিরা চরছে। ঠিক সেখানেই তারা নেমে আসে। পাখি শিকারিরা বকদের এই দুর্বলতা জেনে নকল বক তৈরি করে কাশবনের ধার ঘেঁষে ফাঁদ তৈরি করে। এতেই আসল বকেরা এসে ধরা পড়ে। সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে।
ধোঁকার বিষয়টা এতক্ষণে বুঝতে পারলাম। কিন্তু মনটা ভীষণই খারাপ হয়ে গেল। পাখির আবাসভূমি কিভাবে বধ্যভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
শিলাইদহ ঘাট পারাপার হলাম মাত্র পঞ্চাশ মিনিটে। কয়েক মিটার দূরেই শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। বড় পাঁচিল দিয়ে ঘেরা কুঠিবাড়িটার গায়ে শত বছরের পুরনো ইতিহাস। সামনে একটা বিশাল তোরণ। ভারত বাংলাদেশ দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা থেকেছেন এখানেই। দুই দেশের মৈত্রীর ইতিহাস, বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনের জায়গায় এত কম সময়ে আসতে পেরে আওয়ালের মুখে প্রশংসার খই ফুটতে লাগল।