শিক্ষামনষ্ক মানুষের ক্ষতি হয়ে গেল

ইরশাদ কামাল খান

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম আমার বাংলার শিক্ষক ছিলেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ১৯৬৬ সালে সপ্তম শ্রেণিতে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁকে চিনি। যদিও সরাসরি শিক্ষক হিসেবে তাঁকে পাই নবম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকে। লক্ষ্য করেছিলাম যে প্যারেন্টস-ডে তে তিনি অনেক অভিভাবকের ভিড়ের মধ্যেও আমার বাবা (ডা. কামাল এ খান) -কে খুঁজে বের করে তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করতেন। তাঁর সঙ্গে প্রায়ই থাকতেন বাংলার অপর শিক্ষক হাসান স্যার এবং রাজনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষক (শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছোট ভাই) নাসীর চৌধুরী সাহেব। তাঁদের আলাপচারিতা আমার কাছে তখন অবশ্য দুর্বোধ্যই মনে হত।
নজরুল স্যারের ক্লাশের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল যে বই এবং পাঠ্য বিষয়ের প্রসঙ্গে তিনি যত না বলতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বলতেন জগতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তাঁর এই আলোচনা আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে রোমাঞ্চিত করত। তাঁর কথাগুলো আমাদেরকে নিয়ে যেত ভিন্ন কোন জগতে; আমরা যে-ধরনের জগতে বাস করতাম এবং সচরাচর যে ধরনের মূল্যবোধ আমাদের ধারণ করার কথা বলে মনে করতাম, তা থেকে এই জগৎ একেবারেই বিপরীত মেরুতে। এই একেবারেই অপরিচিত, কিন্তু রহস্যজনক কারণে আকর্ষণীয় জগতের আভাসের কারণেই বোধহয় আমরা রোমাঞ্চিত হতাম। আমি বরাবরই ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি। তাই ’শ্রীকান্ত’ থেকে আমাদের পাঠ্য পড়াবার ফাঁকে তিনি শরৎচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর জীবন, বিভিন্ন উপন্যাস এবং চরিত্রগুলো নিয়ে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে যেসব গল্প করতেন সেগুলো আমি এবং আমার সহপাঠীরা গলাধঃকরণ করতাম এবং এসব বিষয়ে আরও জানার জন্য প্রচণ্ড পিপাসা তৈরি হত। সেবার লম্বা ছুটিতে বাড়ি গিয়ে বাবার বুকশেল্ফ থেকে শ্রীকান্ত খুঁজে বের করে অনেক কষ্টে পড়ে শেষ করলাম। মনে হল এক নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করলাম। বোধহয় আরও বেশ কিছু বইও সেই অনুপ্রেরণায় পড়ে ফেললাম। ছুটির পর কলেজে ফেরার দিন বাবাকে নজরুল স্যারকে বলতে শুনলাম, আপনার ছাত্রতো শরৎচন্দ্রের স্বাদ পেয়েছে মনে হয়। আমার মনে হল স্যার বেশ গম্ভীরভাবে, অথচ কৌতূহলের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।
আমাদের বাংলার দুজন শিক্ষকই – নজরুল এবং হাসান স্যার – বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, বানান এবং ব্যাকরণের ব্যাপারে অতি মনোযোগী ছিলেন। নিঃসন্দেহে তাঁদের বিভিন্ন প্রজন্মের অনেক ছাত্রই এর জন্য তাঁদের কাছে চিরঋণী রয়ে গিয়ে থাকবে। তাই ক্যাডেট কলেজ একটি ইংরেজি মাধ্যমে (অবশ্য জাতীয় পাঠ্যসূচি অনুযায়ী) শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এর ছাত্রদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার ভিত্তি হয়ে গিয়েছিল বেশ মজবুত। বাংলা পরীক্ষার ফলও হত সাধারণত খুবই ভাল, এমনকি ভাল বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর তুলনায়ও।
১৯৭০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আর ক্যাডেট কলেজে ফিরে যাইনি। কিন্তু এরপরও মাঝে মাঝেই লক্ষ্য করেছি আমার বাবার সঙ্গে নজরুল স্যারের যোগাযোগ রয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের পরপর ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউটে আলোচনা সভার অন্যতম আয়োজক হিসেবে কাজ করছিলেন আমার বাবা। সভাপতিত্ব করছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল। বক্তাদের মধ্যে ড. আনিসুজ্জামান, ড. অনুপম সেন, অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক তাহের, হায়াৎ মামুদের সঙ্গে নজরুল স্যারের বক্তৃতাও শুনলাম।
আবছা মনে পড়ছে, তিনি বলছিলেন, ক্যাডেট কলেজে আকবর হাউসের নামকরণ করা হয়েছে শহীদুল্লাহ হাউস, সুইমিং পুলের সামনে সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে ’সন্তরণ পল্বল’। আসলে ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করে নিয়মিত ভিত্তিতে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাও বোধহয় কিছুদিন নজরুল স্যার কিছুটা অংশগ্রহণ করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন।
নজরুল স্যার সিলেট ক্যাডেট কলেজে প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালন করার পর অবসর গ্রহণ করেন এবং একসময় মোমিন রোডে থাকতেন। সেসময় আমার বাবার চেম্বার এবং বাসা ছিল সেখানেই। স্যার প্রায় প্রতিদিনই বাবার চেম্বারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিতেন। সেই সুবাদে আবার তাঁর সঙ্গে আমার এবং আমার স্ত্রী ডা. মিতালীর নিয়মিত দেখা হতে শুরু করল। আমাদের মনে হত দুজনই একে অপরের সঙ্গ খুব উপভোগ করতেন।
সম্ভবত বছর পনের আগে নজরুল স্যার অসুস্থ এই খবরটা পেয়ে তাঁর আল করীম ম্যানসনের সরকারি ফ্ল্যাটে তাঁকে দেখতে গেলাম। হাঁটুতে গুরুতর চোটের কারণে তিনি শয্যাশায়ী, ঢাকায় তাঁর যা চিকিৎসা হয়েছে তাতে কাজ হয়নি। মনে হল সমস্ত ব্যাপার তাঁর একমাত্র কন্যা ইলোরা সামাল দিতে গিয়ে বেশ দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অবস্থা দেখে মিতালী অনেকটা ভর্ৎসনার সুরে বলল, স্যারের এত ছাত্র থাকতেও কেউ কিছু করছে না কেন? আমি ব্যাপারটা কয়েকজন প্রাক্তন ফৌজিয়ানের সঙ্গে আলাপ করে খুব ভাল সাড়া পেলাম। আমার বন্ধু পূর্বকোণের সম্পাদক স্থপতি তসলীম, সাইফ ভাই, ডা. মেজবাহ, ডা. সারওয়ার, ডা. রমীজ এবং আরো অনেকে দ্রুত কাজ শুরু করল। তসলীমের অফিসে ঘনঘন সন্ধ্যাবেলায় সভা হতে থাকল। আমাদের প্রবাসী বন্ধুরা সোৎসাহে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠাতে লাগল। একসময় আমাদের জানিয়ে দিতে হল যে তহবিলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়ে গেছে, আর টাকা পাঠানোর দরকার নেই। স্যার গেলেন দক্ষিণ ভারতের ভেলোরে চিকিৎসার জন্য। ফৌজিয়ানদের মধ্যে থেকে ডা. ধীমান গেলেন তাঁর সঙ্গে। সফল অস্ত্রোপচারের পর তিনি দেশে ফিরলেন এবং মনে হল নাটকীয় উন্নতিও হল স্যারের স্বাস্থ্যের। মনে হল আমার বন্ধুরা উপলব্ধি করল যে এতে তারা জীবনের একটি মূল্যবান কাজ সারতে পেরেছে। একজন শিক্ষক তাঁর অবসরের পরও প্রাক্তন ছাত্রদের শেখালেন, জীবনের করণীয় সম্পর্কে।
স্যার অপ্রিয় সত্য কথা অকপটে বলতেন, এটা ছিল সর্বজনবিদিত। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার এবং পিছিয়ে থাকা মতবাদ তিনি অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করতেন। এজন্য যে সৎসাহসের প্রয়োজন সেটি তাঁর মধ্যে সবসময় ছিল। তাঁর বিভিন্ন লেখা ও বই থেকে সমাজের সকল স্তরের মানুষ উপকৃত হবেন এবং মূল্যবান শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন। আমি জানি আমরা, তাঁর ছাত্ররা, স্যারের ক্লাসে যে অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করতাম তাঁর প্রবন্ধ ও বইয়ের পাঠক তার কিছুটা অনুভব করতে পারবেন।
স্যার ছাত্রজীবনে এবং তার পরও সাহিত্যের অঙ্গনে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করতেন। কিন্তু সম্ভবত ক্যাডেট কলেজে চাকরি করার কারণেই তাঁর জন্য স্বভাবসুলভ এই বিচরণ তিনি ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর তখনকার সমকক্ষ ব্যক্তিরা, এমনকি তিনি নিজেও আফসোস করে থাকতে পারেন যে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা কাজে না লাগানোর কারণে তিনি নিজেকে এবং সমাজকে মহান সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করেছেন। তবে আমার মনে হয়েছে যে তাঁর অসংখ্য ছাত্রের কীর্তির মধ্যে তাঁর মহান সৃষ্টি বিরাজ করছে। তাঁর প্রয়াণে দেশের জ্ঞান ও শিক্ষামনস্ক মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।