শিক্ষক সমাজ এবং বর্তমান সময়

আনোয়ারা আলম

গতকাল ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে জানলাম ঢাকার আইডিয়াল স্কুল এবং কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির বিষয়ে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে ঐ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক এবং একজন সহকারির সম্পৃক্ততা। যেখানে পরীক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার খাতায় ঘষামাজা হয়েছে- ফলাফলে যে কারণে পরিবর্তন যদিও অধ্যক্ষ এ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
‘ঘষামাজা‘-অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা কাঠ পেন্সিলে লেখে-যে কারণে ঐ সুযোগ থাকে। শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ের কথায় পরে আসছি। আমার আপত্তি কাঠপেন্সিলের ব্যবহার।
আমার শিক্ষকতার জীবন শুরু হয়েছিল ‘কিন্ডারগার্টেন’ স্কুলের প্রধান হিসেবে। একজন শিক্ষক কর্তৃক শিশুদের শাসনে বেত ব্যবহারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ায়-ঐ শিক্ষকের আত্মীয়-গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে-কাঠপেন্সিলের অপব্যবহার করে আমাকে গভীর ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত করেছিলেন। কিন’ একুশ শতকে এসেও কেন কাঠপেন্সিলের ব্যবহার শিশুদের ক্ষেত্রে-এটি বোধগম্য নয়-ঘষামাজা তো কালির কলমে সম্ভব নয়।
এবারে আসি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নৈতিকতায়। যদি ‘মানুষ গড়ার কারিগরই-এ অপকর্মে লিপ্ত হয় তাহলে সমাজ কোন পথে ধাবিত হবে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান তাঁর বক্তব্যের এক পর্যায়ে শিক্ষকদের কথা বলছিলেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর পুত্রের শিক্ষককে চিঠি লিখছেন- কিভাবে পুত্রকে শিক্ষা দেবেন। যুগে যুগে এ ধরণের অনেক ঘটনা আছে যেখানে- দেশের প্রধানসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বদের শিক্ষকের প্রতি সম্মান-আস’া ও ভরসার বিষয়ে। সুদূর অতীতে সমাজে আর্থিক দিক থেকে শিক্ষকগণ বরাবরেই নাজুক অবস’ানে থাকলেও নীতি থেকে সরে আসেননি। যে কারণে সমাজে ‘মাস্টার সাহেব’ এর বড়ো সম্মানের জায়গা ছিল। বর্তমানে স্বীকার করতেই হবে, শিক্ষকের আর্থিক অবস’ানের অধিকাংশ ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে-কিন’ অবনতি ঘটেছে মানের ও নৈতিকতার।
কলেজিয়েট স্কুলে নব্বই এর প্রথমদিকে আমার বড়ো ছেলে ও ছোট ভাই (যে রাঙামাটির লেকে হারিয়ে গেছে) পড়েছে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। শুধুমাত্র ‘আরবী’ শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে-কখনো বার্ষিক ফলাফলে ওপরের দিকে থাকতে পারতো না। এরপরেও আমি আরবী পড়ানোর শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়াইনি। এটি একটি উদাহরণ। ছোট ছেলের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলেও কলেজ শিক্ষক কর্তৃক কাঠপেন্সিলের অপব্যবহার হয়েছে এক নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এরপরেও প্রাইভেট পড়াইনি। তবে আমার সন্তানরা পরবর্তীতে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এটি আমার পরম সৌভাগ্য কিন’ সবার ক্ষেত্রে তা ঘটে না। অতএব, নানাভাবে অনৈতিক কিছু শিক্ষকের ফাঁদে অনেক অভিভাবক আটকে যান। পরম বেদনা ও কষ্ট এবং ক্ষোভের সাথে লিখছি-কারণ আমিও একজন শিক্ষক।
কেন গাইড বুক বা কোচিং ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না? কেন অনেকে বাসায় পড়তে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছি? কেন সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন প্রণয়নে গাইড বুকের সহায়তা নিচ্ছি। একই সাথে যুক্ত হচ্ছে আরো জঘন্য অপকর্ম। নৈতিকতার চরম অবক্ষয়-যখন শিশু শিক্ষার্থীদের শারীরিক নিপীড়নে কোন শিক্ষকের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। অনেক শিশু এ কারণে আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছে। শারীরিক শাস্তি বন্ধ হলেও অনেক শিক্ষকের বেত্রাঘাতে অবোধ শিশুদের মানসিক ও শারীরিক অবনতিও ঘটেছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে-অর্থ আত্মসাৎ, ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগে দুর্নীতি, সরকারি বই বিক্রির অভিযোগসহ নানা ধরণের অপকর্ম- কিন’ গভীর আক্ষেপে বলতে হয় শিক্ষার যে উদ্দেশ্য তথা মিথ্যার বিনাশ ও সত্যের আবিষ্কার বা আত্ম উপলব্ধি বা পবিত্র জীবনের উপলব্ধি বা দেশপ্রেম- এ সবকিছুকে শিক্ষক ধারণ এবং লালন করে প্রোথিত করবেন শিক্ষার্থীদের মাঝে, প্রশ্নটা এসে যায়- যে সব শিক্ষক নৈতিক অধঃপতনের শিকার তারা কিভাবে শিক্ষার্থীদের ভেতরটা আলোকিত করবেন?
প্রতিবছর বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলে পুনঃনিরীক্ষণের পরে অনেক অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীও পাশ করেছে-কিন’ তাৎক্ষণিকভাবে ফল প্রকাশিত হওয়ার পরে অঘটনও ঘটে-তথা আত্মহনন বা অন্যকোন দুর্ঘটনা। কেন ফলাফলে পরিবর্তন হবে? তাহলে দায়িত্বের সাথে আমরা কি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করি না। প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে দেখেছি- উত্তরপত্র মূল্যায়নে কতো অযত্ন বা অবহেলা বা উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ। অথচ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের ওপর। সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেমন হওয়া উচিত-এ বিষয়ে একটি প্রবাদ আছে, উপাচার্যের পায়ের কাছে বসে আছেন রাজনীতিবিদগণ আর পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে থেকে এ নিয়োগ দলীয় ভিত্তিতে, মনে প্রশ্নই জাগে- সর্বোচ্চ পদে যিনি থাকেন- তিনি যদি এ পদের জন্য তদবির করেন বা কখনো দলীয় নেতাদের ধমক বা হুকুম পালনে তটস’ থাকেন-তবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা কি শিক্ষার্থীদের থাকে? একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে-শিক্ষকদের বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য-নিয়োগে স্বজনপ্রীতিসহ নানা বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে একটি দৈনিক পত্রিকায় যা পড়ে নিজেদের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণাবোধ জাগে।
এ ধরনের অভিযোগও শোনা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের অনেকেই বড় অংকের বিনিময়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানে আন্তরিক কিন’ যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান তাঁর মুখ্য দায়িত্ব-এখানে অনেকের কিছুটা উদাসীনতা, এটিও এক ধরণের অবক্ষয় নয় কি! যে সব শিক্ষক বিশেষ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহনকারী-তাঁদের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ভেতর থেকে কতটুকু আসবে এটিও ভাবার বিষয়।
সমাজের দৃষ্টিতে শিক্ষক হচ্ছেন সকল গুণের আধার। যে কোন শিক্ষা ব্যবস’ায় মানবিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ আর এ উপাদান হচ্ছেন শিক্ষক। শিক্ষকের দায়িত্ব বিষয়ে কমবেশি সকলেই জানি-কিন’ পালন করেন যারা তাঁরা অবশ্যই নমস্য ও শ্রদ্ধেয়। তাঁরা আচার-আচরণ, মন ও মননে নিজেই বটবৃক্ষের ছায়া। শিক্ষকের ওপর যুগে যুগে সমাজের আস’া ছিল অনেক, এ ক্ষেত্রটিতে ইদানিং যে হাহাকার ও হতাশা তা কি ফিরিয়ে আনা যায় না? কারণ শিক্ষক তো সমাজের, দেশের শিক্ষক! এ বিষয়টি শিক্ষক সমাজ যদি ভেতর থেকে উপলব্ধি করেন-তাহলে হয়তোবা অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধান সম্ভব হতো।
লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক