শিউলি ফোটার দিন

নুরুল ইসলাম বাবুল

তখন কাকডাকা ভোর। আলো ছিল না। আঁধারও ছিল না। ছিল আলো- আঁধারির খেলা। ঠিক সেই সময়। একেবারে সেই সময়ে জন্ম নিল শিউলি। জন্মেই কেঁদে উঠল। সে কী কান্না। ওয়্যাঁও… ওয়্যাঁও… ওয়্যাঁও…। শুধু কি তাই। কাঁদতে শুরু করল শিউলির দাদি। ওর বাবা। এমন কি মা-ও। সেই সাথে বাড়ির অন্যরা। সবাই হাউমাউ করে কাঁদল। চিৎকার করে কাঁদল। আহাজারি করে কাঁদল। পাখিদের কলকাকলি যেন থেমে গেল সে কান্নায়। শোনা গেল না ভোরের আযান। কেবল কয়েকজন মানুষের কান্নার সুর ছড়িয়ে গেল চারপাশ। মরা কান্না ভেবে পাড়া-পড়শিরা দৌড়ে এল। এল অন্য পাড়ার দু‘একজন। কেউ উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ ঘরে উঁকি দিয়ে ঘটনা জানতে চাইল। তখনও কাঁদছে শিউলির দাদি। কাঁদছে আর প্রলাপ করছে, ‘হায় আল্লাহ আমার ব্যাটার ভিটায় বাত্তি জ্বালাবি কেডা’। ডুকরে কাঁদছে শিউলির বাবা। অবহেলা আর অযত্নে মাটিতে শুয়ে কাঁদছে শিউলি। বাড়ির কেউ তাকে আদর করছে না। কোলে নিচ্ছে না। কারণ সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে। প্রতিবেশীদের কেউ একজন বলেই ফেলল, ‘আবার মেয়ে’।
এভাবে। ঠিক এভাবেই শিউলির পৃথিবীতে আসা। চার বোনের পর তার আগমন কেউ চায় নি। না বাড়ির কেউ। না পড়শিরা। না আত্মীয়-স্বজন। আর তাই কান্না দিয়ে জানাজানি হলো শিউলির জন্মের খবর।
শিউলির বাবা চাষাবাদ করে। নিজের কিছু জমি আছে। সে গুলো চাষ করে। অন্যের জমিতেও কাজ করে। অতি সাদাসিধে মানুষ। অতি সাধারণ। মা বাড়িতে কাজ করে। সব সময় তার তিরিক্ষি মেজাজ। বাড়ির সকলকেই তার কথা মেনে চলতে হয়। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে অল্প বয়সেই। সেজবোন ওয়ান- টু পর্যন্ত পড়েছে। তারপর আর স্কুলে যায়নি। চার নম্বর বোনও তাই।
বাবা- মা চেয়েছিল এবার একটা ছেলে হবে। দাদির বড় সখ জেগেছিল নাতির মুখ দেখবে। বোনেরা ভাই পাবে। বড় হয়ে সে বংশের নাম রাখবে। কিন্তু তা হলো না। সবার আশায় যেন ছাই পড়ল। তাই শিউলি সকলের অবহেলার পাত্র। অবহেলার মধ্য দিয়েই তার বেড়ে ওঠা।
ধীরে ধীরে বসা শিখল। হামাগুড়ি দিতে শিখল। একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে একদম একা-একা হাঁটতে শুরু করল। বাবা- মা দেখল। দাদি দেখল। বোনেরা দেখল। কেউ হাততালি দিল। কেউ দিল না। ফোকলা দাঁতে হাসতে লাগল শিউলি। সে কী হাসি। হিহিহি…..হিহিহি….হিহিহি….। হাঁটতে শিখে যেন রাজ্য জয় করে ফেলেছে। ততদিনে দাদির সাথে ভাব হয়ে গেছে শিউলির। দাদির কোলে চড়ে বেড়িয়ে এসেছে এপাড়া-সেপাড়া। শিউলির কথা ফোটার সময় প্রথমেই বলেছিল দা-দু… দা-দু…দা-দু…। আর তাই একটু একটু করে কাছে টেনেছে ওর দাদি।
একদিন ঘটল এক ঘটনা। তখন ভালো মতোই হাঁটতে শিখে গেছে শিউলি। একটুও আছাড় খায় না। কিছুই ধরতে হয় না। থপর থপর পা ফেলে ফেলে হাঁটে। হলো কী, দুপুর থেকে শিউলিকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির ভেতরে নাই। ঘরের কোণে, রান্না ঘরে, আশে-পাশের বাড়িতে, কোথাও নাই। এতটুকুন একটা মেয়ে। কোথায় গেল। কোথায় যাবে? খুঁজতে খুঁজতে বিকেল গড়িয়ে গেল। একটু পরেই সূর্য ডুবে যাবে। চারিদিকে আঁধার নেমে আসবে। কী হবে তখন। এমনটা ভাবতে ভাবতে বাড়ির নিচে রাস্তায় নামল শিউলির দাদি। রাস্তার ও পাশে খাল। খালের ধারে কাশবন। দাদি চোখ মেলে দেখল কাশবন নড়ছে। ভালো করে দেখল। বয়সী চোখ। তবু সে দেখতে পেল বনের ভেতরে বসে আছে শিউলি। কাশপাতা নেড়ে-চেড়ে খেলছে। আনমনে বিড়বিড় করছে। আরও একটু ভালো করে তাকাল দাদি। সর্বনাশ ! শিউলির পাশেই ফণা তুলে হিসহিস করছে মস্ত বড় এক সাপ। চোখ দু‘টো বড় হয়ে গেল দাদির । ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠল। ভাগ্যিস দাদির আগমন টের পেল সাপটা। আস্তে করে সরে গেল। ঢুকে গেল গর্তের ভেতর। ঠিক তখনই ছোঁ মেরে শিউলিকে কোলে তুলে নিল দাদি।
অন্য একদিন। ঠিক দুপুুুর বেলা। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। সবাই ঘরে বসে আছে। কিন্তু শিউলি নাই। কোথায় গেল? দরজা খুলল দাদি। দেখল উঠোনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে শিউলি। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গান গাইছে। একদিন হাতের কাছে বই পেল। নেড়ে চেড়ে দেখল। তারপর একটা একটা করে পাতা উল্টাল। বইতে কত রঙের ছবি। দু’চোখ ভরে দেখল শিউলি।
যখন স্কুলে যাওয়ার বয়স হলো বাড়ির কেউ তাকে স্কুলে নিয়ে গেল না। ভর্তি করে দিল না। মুখ ফুটে কেউ স্কুলে যাওয়ার কথাটুকু বলল না । পাশের বাড়ির রাজিয়া স্কুলে যায়। তারেক, নাছিমা, রিয়া, পিয়া সবাই স্কুলে যায়। ওদের পিছু পিছু একদিন শিউলিও স্কুলে গেল। শিউলিকে বসতে বলল না কেউ। হাতে বইখাতা নেই। দু’একজন ধাক্কা দিয়ে সরিয়েও দিল। তবু বাড়ি ফিরে গেল না । শেষ বেঞ্চের ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসে রইল। অন্য ছেলেমেয়েরা হইচই করছে । লাফালাফি করছে । কেউ শিউলিকে দেখে দেখে হাসছে। শিউলি আপন মনে বসে রইল। শুধু নাসিমা ম্যাডাম ক্লাসে ঢোকার সময় সবাই যখন দাঁড়ায়, শিউলিও দাঁড়িয়ে গেল। শ্রেণি শিক্ষক নাসিমা আক্তার ক্লাসে ঢুকেই খেয়াল করল শিউলিকে। বই খাতা নেই। একা একা বসে আছে। একদম চুপচাপ। কাছে ডাকলেন ম্যাডাম। নাম, বাবার নাম, শুনলেন। স্কুলে পড় না? জিজ্ঞেস করতেই শিউলি জবাব দিল, ‘না’। ‘তোমার তো স্কুলে পড়ার বয়স হয়েছে। আজই তুমি স্কুলে ভর্তি হবে।’ আদর করে বললেন ম্যাডাম। শিউলি মাথা নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা’।
ক্লাস শেষে ম্যাডাম শিউলিকে হেডস্যারের কাছে নিয়ে গেলেন। হেডস্যার ভর্তি খাতায় নাম তুললেন। তিনটা নতুন বই দিলেন। এভাবে। ঠিক এভাবেই শিউলির স্কুলে ভর্তি হওয়া। তারপর পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়মিত আসা-যাওয়া।
অল্প দিনেই শিক্ষকদের নজর কাড়ল শিউলি। লেখাপড়ায় ভালো। পড়া ধরলে ঝটপট বলে ফেলে। লিখতে দিলে সুন্দর করে লিখে আনে। চৌধুরী এনামুল স্যারের গানের ক্লাসে সবার আগে গান গায়। কবিতা আবৃত্তি করে। আকলিমা খানম ম্যাডামের বিচারে শিউলির আঁকা ছবিই শ্রেষ্ঠ।
ক্লাস টু-তে উঠতে ফার্স্ট হলো। থ্রি-তে ফার্স্ট। বার্ষিক খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অনেক পুরস্কার শিউলির দখলে। আর বাড়িতে তো কাজের হিসেব নাই। বাবার সাথে খেতে কাজ করে। মায়ের সাথে সবজি বাগানের যত্ন নেয়। নিজ হাতে গাছ লাগায়। নিয়মিত পানি ঢালে। মায়ের রান্নার কাজেও সাহায্য করে। দাদিকে ওষুধ খেতে দেয়। বোনদের এটা-সেটা করে দেয়। সবার কাজে এগিয়ে আসে। ইচ্ছায় করে। অনিচ্ছাতেও করতে হয়। মায়ের কড়া খবরদারি। ‘মিয়্যা মানুষ অইছিস,কাজ কর‌্যা খাওয়া লাগবি।’
কাজ আর কাজ। একটু পুতুল খেলার সময়ও নাই। পাড়ার মেয়েরা গোল্লাছুট খেলে । কানামাছি খেলে। ইস্‌ ! কী যে খেলতে ইচ্ছে করে। একদিন রিয়া বলল। রাজিয়া, নাছিমা, পিয়া সবাই মিলে ধরল। খেলতেই হবে। তাই একটু খেলছিল। ওমনি মা এল। বোনরা এল। চুলের ঝুঁটি ধরে নিয়ে গেল। তার নাকি ঢের কাজ পড়ে আছে। সেদিন ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল শিউলির।
সারাদিন একাজ সেকাজ। রাতে পড়ার সুযোগটাও হয় না। বাড়িতে বিদ্যুৎ নাই। কেরোসিনের টিপটিপ বাতি। সপ্তাহের হাটবারে অল্প একটু তেল কিনে আনেন বাবা। সেই তেলটুকু দিয়ে পূরো সাতদিন চালাতে শুধু সন্ধ্যা বাতিই জ্বালানো যায়। কোন রকমে রাতের খাবার খেয়েই সবাই শুয়ে পড়ে। সেদিন একটু বেশি পড়া ছিল। কাজের ফাঁকে দিনে সবগুলো হোমওয়ার্ক শেষ করা হয় নাই। তাই শিউলি মায়ের কাছে আবদার করে বলল, ‘ওমা’ বাতিটা একটু জ্বালিয়ে রাখনা, আমার যে ম্যালা পড়া আছে’। কথাগুলো বলার সাথে সাথে মা ধমক দিয়ে উঠল, ‘এহন শুয়ে ঘুমা’। দাদি ও ঘর থেকে বলল বউমা দাও না একটু পড়তে। এবার ভীষণ রেগে গেল শিউলির মা। মুখ খেঁচিয়ে বলল, ‘আর আল্লাদ করা লাগবি লয়। ব্যাটা মানুষ হলি না অয় লেহাপড়া কইরা বাপ-দাদার নাম রাইখতো, অইছে মিয়্যা মানুষ। অতো লেহাপড়া লাগবি লয়’।
সে রাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেক কাঁদল শিউলি। তারপর সাতদিন স্কুলে গেল না। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ডাকাডাকি করল। দাদিও দু’একবার বলল। না, শিউলি কারো কথাই শুনল না। শুয়ে শুয়ে দিন কাটাল। তার পরের দিনও যখন শিউলি স্কুলে গেল না, স্বয়ং হেডস্যার নাজিম উদ্দিন বাড়িতে এসে হাজির। মায়ের সাথে কথা বললেন স্যার। যতই বোঝান মায়ের সেই এক কথা ‘অইছে মিয়া মানুষ অতো লেহাপড়া লাগবি লয়’। একটু পরে বাবা মাঠ থেকে এলেন। তারও একই কথা। দূর থেকে হেডস্যারের শুকনো মুখ দেখে ছুটে এল শিউলি। কাছে এসে বলল, ‘স্যার আমি স্কুলে যাব। আজ থেকেই যাব’। এভাবে। ঠিক এভাবেই আবার স্কুলে ফিরে আসা শিউলির।
খাতা- কলম কিনতে যে কয়টা টাকা লাগে তাও দিতে চায় না মা। স্কুলেই যেতে দেয় না। তৈরি হওয়া দেখলেই বকাঝকা করে। এ কাজ সে কাজের তাগাদা দেয়। একদম ভোরে মাঠের কাজে যায় বাবা। তার ভাত দিয়ে আসতে হবে। শিউলি একরকম দৌড়ে বাবার ভাত পৌঁছে দিয়ে আসে। দূরের মাঠে গেলে অনেকটা দেরি হয়ে যায়। তবু স্কুল কামাই করে না শিউলি।
দুপুরে খাওয়া হয় না শিউলির। সাড়ে চারটা পর্যন্ত স্কুল চলে। টিফিনে ছেলেমেয়েরা বাড়িতে খেতে যায়। যাদের বাড়ি একটু দূরে তারা খাবার নিয়ে আসে। শিউলি ক্লাসে বসেই কাটিয়ে দেয় পুরো টিফিনের সময়। সহপাঠীরা কেউ কেউ খেতে বললে সে জবাব দেয়, ‘খিদে নাই’। নাসিমা ম্যাডাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসতে বলে। শিউলি যায় না। নানা অজুহাত দেখায়। কারণ সে জানে বাড়িতে ভাত নাই। সকালে ভাত রান্না হয়। খেয়ে-দেয়ে যা বাকি থাকে দুপুরে বাড়ির সবাই ভাগাভাগি করে খেয়ে নেয়। শিউলির কথা কেউ ভাবে না। এমন কি মায়েরও কোন গরজ নাই। বাড়িতে এতো অবহেলা! মায়ের গালাগালি। বাবার খবরদারি। শিউলির ছোট্ট শিশুমন দুঃখে ভরে ওঠে। শুধু সান্ত্বনা শিক্ষকদের স্নেহ আদর। স্কুলের শিক্ষকগণ অনেক অনেক ভালোবাসে। তাই স্কুলই যেন ওর কাছে শান্তির জায়গা।
দেখতে দেখতে সমাপনী পরীক্ষার সময় এসে গেল। পরীক্ষার রুটিনসহ প্রবেশ পত্র হাতে পেল শিউলি। সহপাঠীরা পরীক্ষা উপলক্ষে নতুন পোশাক কিনল। কেউ কেউ শীতের আভাস টের পেয়ে সোয়েটারও কিনল। শিউলির কিছুই কেনা হলো না।
প্রথম পরীক্ষার দিন অন্য সবার সাথে মা-বাবা,ভাই-বোন কেউ না কেউ গেল। শিউলির সাথে কেউ গেল না। একাই সে অন্যদের পিছুপিছু পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাল। এভাবে। এভাবেই শেষ হলো পরিক্ষাগুলো। তারপর দীর্ঘ বিরতি। দীর্ঘ অবসর। পড়া নাই। তবে সবজি বাগানে যথেষ্ট কাজ। শিউলি সেগুলো করে। একটু সময় পেলেই ছড়া- কবিতা আর গল্পের বই পড়ে। স্কুলের পাঠাগার থেকে এনে অনেক অনেক বই পড়ে ফেলল শিউলি।
একদিন দুপুর বেলায় স্কুলের হেডস্যার প্রায় দৌড়ে এসে জানালেন শিউলি বৃত্তি পেয়েছে। সারা বাড়ি লোকজনে ভরে গেল। পাড়া- প্রতিবেশী এল। অন্য পাড়া থেকে এল। গ্রামের গণ্যমান্য অনেকেই এলেন। কেউ একজন বলল, ‘আমাদের শিউলি বংশের প্রদীপ’। অন্য একজন বলল, ‘সারা গ্রামের মুখ আলো করেছে মেয়েটি’। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘শিউলি আমাদের সম্মান রক্ষা করেছে’। সমবেত সকলেই ‘ধন্যি মেয়ে’ বলে বাহাবা দিল। মাঝখানে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে রইল শিউলি। মা এসে বুকের কাছে টেনে নিল। এই প্রথম মায়ের পরম আদর পেল ও। বাবা আনন্দে মাথায় হাত রাখল। দাদি ও বোনরা খুশিতে আত্মহারা। শিউলির হাসি মাখা চোখে-মুখে যেন শরতের শুভ্রতা দেখা দিল। অবহেলায় কেটে গেছে দশটি বছর। মানে দশটি শরৎ। আজ এভাবে। ঠিক এভাবেই ফুল হয়ে ফুটে উঠল শিউলি।