শামসুর রাহমান মানবতার কবি

আবু সাঈদ
rahman

বাংলা কবিতায় তিরিশের আধুনিক কাব্যধারা এবং চল্লিশের বাস্তবতাবোধের সচেতন প্রকাশের পর বিষয়বৈচিত্র্যে অভিনবত্ব দেখা যায় শামসুর রাহমানের (১৯২৯-২০০৬) কবিতায়। তিরিশের ‘পরীক্ষিত পথে’ তাঁর এ আবির্ভাব আকস্মিক নয়, বরং তিরিশোত্তর কাব্যধারারই ধারাবাহিকতা। এ ধারাকে আত্মস্থ করেই তিনি কবিতায় নিজস্ব স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে তিরিশের কবিতা অতি রোমান্টিকতা,স্বতঃস্ফূর্ততা, আবেগ ও স্বভাবকে পরিহার করে রূঢ় বাস্তবতা, সচেতনতা, যুক্তি এবং স্বাভাবিকতাকে গ্রহণ করেছে (স্মতর্ব্য, কবি বুদ্ধদেব বসু সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে স্বভাব কবি নন, স্বাভাবিক কবি হিসেবে অভিহিত করেছেন)। শামসুর রাহমানের কবিতাও এক পর্যায়ে অনিবার্যভাবে ছিল আত্মমুখী। তবে দ্রুত তিনি এ আত্মমুখিনতা ত্যাগ করে ক্রমশ বহির্মুখী হয়েছেন। প্রথম গ্রন্থ ‘ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) কাব্যে রোমান্টিকতার আবেশ পরিলক্ষিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে তাঁর কবিতায় জীবন-দর্শন, সমাজ-রাজনীতি একাকার হয়ে গেছে। “প্রথম পর্বের শীতল বুদ্ধিগত কবিতার আবছায়া থেকে ক্রমাগতই তিনি সরে এসেছেন – রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন যতোই জোরালো হয়েছে – তিনি সরে এসেছেন একেবারে জনপথে। জনগণের মনোভঙ্গির সাথে তিনি একাত্ম হয়ে গেছেন এবং রাজনৈতিক- সামাজিক ঘটনাবলিকে ব্যক্ত করেছেন কবিতার ভাষায়।” যদিও এ সময় তাঁকে মেথর পাড়া, রেস্তোরাঁ এমনকি পুলিশ ফাঁড়িতেও যেতে দেখেছি। তবুও ঘুরেফিরে তিনি এক রত্তি উঠোনের বাইরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এমনকি ঘরের ভিতরেও তিনি জড়োসড়ো হয়ে থেকেছেন। সারা বাড়িতে কর্মব্যস্ততা চোখে পড়লেও শুধু কবিকে দেখি নিঃসঙ্গতাকেই নিঃশব্দে আপন করে নিয়েছেন।
আমার যে-কাজ
নিঃশব্দে করাই ভালো। বাড়িতে বয়স্ক যারা, অতি
পুণ্যলোভী, রেডিওতে শোনে তারা ধর্মের কাহিনী।
যুবকেরা আড্ডাবাজ, মেয়েরা আহ্লাদী প্রজাপতি,
মক্ষিরাণী।
(বাড়ি; বিধ্বস্ত নীলিমা)
এ সময় আমরা তাঁকে দেখি গ্রিক উপাখ্যানে, নিজ বাড়িতে বা উঠোনে, কখনো মা’র সঙ্গে, কখনো পিতার সঙ্গে অথবা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। কখনো নিজেই নিজের আত্মপ্রতিকৃতি আঁকছেন। মধ্যবিত্তসুলভ নিশ্চিত জীবনই তিনি যাপন করে যাচ্ছিলেন।
চাল পাচ্ছি, ডাল পাচ্ছি তেল নুন লাকড়ি পাচ্ছি,
ভাগ করা পিঠা পাচ্ছি, মদির রাত্তিরে কাউকে নিয়ে
শোবার ঘর পাচ্ছি, মুখ দেখবার
ঝকঝকে আয়না পাচ্ছি, হেঁটে বেড়ানোর
তকতকে হাসপাতালী করিডর পাচ্ছি।
(দুঃস্বপ্নের একদিন; নিজ বাসভূমে)
শামসুর রাহমানর আবির্ভাবের সময়টা বাংলা কবিতার সুবর্ণ সময় হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বাঙালিদের জন্য মোটেই অনুকূলে ছিল না। তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকা ১৯৪৯ সালে। আর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। এ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ছিল মোটামুটি এরকম- ১৯৪৬ সালে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ এবং ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসন। এ রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি নিজেকে আর নিরাসক্ত রাখতে পারেননি। উদর কেন্দ্রিক এ মধ্যবিত্ত চিন্তায় নিজেকে নিমগ্ন না রেখে তিনি যুক্ত হতে থাকেন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে। জাতীয় চেতনাকে সমন্বিত করার জন্য এ সময় কবি-শিল্পীরাও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেন।
ফলে ‘তিরিশের আঙ্গিকে বিচরণশীলতা’, চল্লিশের সমাজবাদিতাকে সঙ্গে নিয়ে ‘আমাদের কবিতা স্বকীয় চরিত্র পঞ্চাশের দশকেই আকারিত হয়।’ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায়ও এ সময়টা খুবই অস্থির ছিল। সে অবরুদ্ধ ও বৈরী পরিবেশ ও সময়ে তাঁর কাব্যভাব শৃঙ্খলিত মানুষেরই ভাবের দ্যোতনাকে জ্ঞাপন করছে।
নিভৃতচারী শামসুর রাহমান তখন তাঁর স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘শহীদ মিনারে কবিতা পাঠ’, ‘বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়”; ‘হরতাল’; ‘গেরিলা’ প্রভৃতি কবিতায় তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে উপলব্ধি করে রাজনীতি ও ভূমিজ সংস্কৃতিকে সমন্বিত করে অন্য ধরনের ইমোশন সৃষ্টি করেছেন। এ পরিবেশে ইহুদি পুরাণে বর্ণিত বীর কিন্তু শৃঙ্খলিত স্যামসন আর শত্রু পরিবৃত বাঙালি যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে।
ক্ষমতামাতাল জঙ্গী হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা,
তোমাদের হোমরা চোমরা
সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?
মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কতো বর্বরের খুলি? কতো শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ, ত্রাসের বিস্তার
করুক যতই পাত্রমিত্র তোমাদের, শেষে পাবে না নিস্তার।
(স্যামসন; দূঃসময়ের মুখোমুখি)

এরপর জন-আকাঙ্ক্ষাই তাঁর কবিতার বক্তব্য হয়ে ওঠেছে। এ সময়ে তাঁর কবিতা ধ্বনি বা চিত্র প্রধান নয় বরং বক্তব্য প্রধানই হয়ে ওঠেছে। তবে এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যে চিত্রকল্প সৃষ্টি করেন তাই তাঁর কবিতা-শরীর। এ চিত্রকল্প স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরো মূর্ত করে তুলেছে। বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন তাঁর যে দুটি বিখ্যাত কবিতা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা দুটির প্রথমটিতে তিনি বাংলাদশে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পাকিস্তানী বাহিনীর নৃশংসতা তুলে ধরেছেন সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা লাভের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। এবং দ্বিতীয়টিতে ফুটে ওঠেছে জন-আকাঙ্ক্ষার সামগ্রিক প্রতিফলন। যুদ্ধ পরবর্তীকালে বাংলার চিত্র ফুটে ওঠেছে ‘কাক’ নামক ছোট কবিতায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলা তখন সে কাকের আওয়াজের মতো খাঁ খাঁ করছে। চারিদিকে শূন্যতা আর শূন্যতা।
গ্রাম্য পথে পদচিহ্ন নেই, গোঠে গরু
নেই কোনো, রাখাল উধাও, রুক্ষ সরু
আল খাঁ খাঁ, পথপার্শ্বে বৃক্ষেরা নির্বাক
নয় রৌদ্রে চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক।
( কাক; বন্দি শিবির থেকে)
শামসুর রাহমানের কবিতায় সমাজবাস্তবতার সঙ্গে কোনো পাশ্চাত্য দর্শন বা ইজমের কোনো দ্বন্দ্ব দেখতে পাই না। পরাধীন দেশে যখন প্রয়োজন স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যখন দরকার দেশ পুনর্গঠন তখন যে কোনো ইজমে মগ্ন থাকা তিনি পরিহার করেছেন সচেতনভাবে। তাঁর কবিতা অজপাড়া গাঁ থেকে বিশ্ব পরিভ্রমণ করেছে।
তিনি নিজেও মিশে গেছেন সমাজের সর্বস্তরের জনতার সঙ্গে। ছাত্র, শিল্পী, খদ্দের, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা -সবার সঙ্গে তিনি একাকার হয়ে যাচ্ছেন।
যেভাবে একাকার হয়ে গেছে তাঁর কবিতা, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে। ‘সফেদ পাঞ্জাবি’ কবিতায় তিনি আবার সবাইকে একত্রও করেছেন। কারণ তিনি এ সম্মিলিত শক্তির কাছে আস্থা রেখেছেন। এবং এ শক্তির উৎসই হচ্ছে মানবতা।
হয়তো মিলিত হবো নামগোত্রহীন
উজ্জ্বল রাজধানীতে কোনো, যাকে ডাকবো আমরা মানবতা বলে,
যেমন আনন্দে নবজাতককে ডাকে তার জনক-জননী।
(রঞ্জিতাকে মনে রেখে; উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ)