শামসুদ্দীন শিশির

জাতীয় বেতার দিবস

১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বেতার দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য খেলাধুলায় বেতারের অবদান। শুধু খেলাধুলায় নয়, বেতার আমাদের বন্ধু। সকল উৎসবে, আনন্দে, সংকটে, বিপদে বেতার আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বেতারের জন্ম থেকেই। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস। নদী-সমুদ্রের জেলে ভাই, নাবিকদের সচেতন ও সতর্ক করার জন্য বেতারের তুলনা বেতার-ই। তাছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সবিস্তারে সাধারণ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিষয় সংশ্লিষ্ট বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে আলোচনার ব্যবস’া করা হয়। ঋদ্ধজনের আলোচনায় শ্রোতাবৃন্দ সমৃদ্ধ হোন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বেতার মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
আমাদের দেশের প্রথিতযশা বহু শিল্পীর হাতেখড়ি ঘটেছে বেতার-এ। কৃষির উন্নয়ন, প্রসার, সচেতনতার বিষয়ে বেতার এর ধারাবাহিক আলোচনা কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষা বিষয় খুঁটিনাটি সমস্যার সহজ সমাধান বেতারের মাধ্যমে দূর দূরান্তের অজ পাড়াগাঁয়ের শিক্ষার্থীদের নিরন্তর সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
এ অঞ্চলের দেশবরেণ্য শিল্পীরা বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মাধ্যমে তাঁদের শিল্পী সত্তার শুরু করেছেন। যাঁদের মধ্যে আবদুল গফুর হালী, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শেফালী ঘোষ অন্যতম। শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষ আমাদের আঞ্চলিক গানের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বেতারের কদর অনেক বেশি। যেখানে টেলিভিশন নেই, বা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি যেমন পার্বত্য অঞ্চল ও দ্বীপাঞ্চলের কোন কোন এলাকার জনগোষ্ঠী খেলাধুলার ধারাভাষ্য শুনেই আনন্দ উপভোগ করে। এ ছাড়া ছায়াছবির গান, আধুনিক গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সংগীত, আঞ্চলিক গান, মাইজভাণ্ডারী গান, জারিগানসহ বহু বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্র করে থাকে। বিশেষ করে জীবনভিত্তিক নাটিকাগুলো শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্র অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে নীতিমালা অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আঞ্চলিক পরিচালকসহ সকল কর্মকর্তা কর্মচারী অত্যন্ত আন্তরিক। এমন গুরুত্বপূর্ণ স’াপনাটি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
মুক্তিযুদ্ধে বেতার শব্দ যোদ্ধা এবং জনগণকে এতটা শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে যা ভুলবার নয়। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে অনেক ভালো হবে। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, দরকারি ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য অতি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করলে আঞ্চলিক কেন্দ্রটি অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতো বলে আমি মনে করি। মাঝে মাঝে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বেতারভবন পরিদর্শনের ব্যবস’া করলে শিক্ষার্থীরা বেতার এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে সুবিধা হতো এবং এর কার্যক্রমগুলো সম্পর্কে ধারণা লাভ করতো।
বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্র প্রতিদিন সকালের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষদের নিত্যদিনের সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, কখন কোন ট্রেন ছাড়বে, জাহাজ বা স্টীমার ছেড়ে যাবে। কোথায় কোন অনুষ্ঠান, নিত্যদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানিয়ে সচেতন ও সহযোগিতা করে।
এভাবেই বাংলাদেশ বেতার আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। জাতীয় বেতার দিবস এ বেতার কার্যক্রমের আধুনিকায়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। বাংলাদেশ বেতার কর্মেই যুগযুগ বেঁচে থাকবে।
বিশ্বে গণমাধ্যমের বিস্তৃতি ঘটেছে, সংবাদ, কিংবা চিত্রসহ সংবাদ, নানা সামাজিক মাধ্যমের যুগে প্রবেশ করছে মানুষ তবুও আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে অনগ্রসর দেশে বেতার আরো বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্যে প্রযুক্তির উৎকর্ষ কিংবা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের যে সব নিত্যগাথা আমাদের জড়িয়ে রাখছে সেসব উন্মোচন করতে পারলে বেতার আমাদের গ্রামের মানুষের হৃদয় কন্দরে পৌঁছে যাবে। বেতার এখনও জনকল্যাণমূলক ভূমিকার অন্যতম শীর্ষে অবস’ান করছে। অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় বৈচিত্র্য, ভাষার সৌকর্য এবং নানা সৃজনশীল অনুষ্ঠান নিয়ে বেতারকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গুণগত পরিবর্তন আনা চাই। সামগ্রিক বেতার ব্যবস’াপনায় আধুনিকতা, প্রগতিশীল ধ্যানধারণার সন্নিবেশ ঘটানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ, দেশ বিদেশের নানা সমস্যার সংকট নিয়ে অভিজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং জাতীয় জীবনের চলমান ঘটনাবলীও আলোচনার অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে।
এখন পরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়ন, আদিবাসী, শিশু, প্রকৃতি ও পরিবেশ, মানবাধিকার-এ সকল বিষয় গণমাধ্যমে বিশেষ স’ান দখল করে আছে। এসব বিষয়ের যথাযথ সন্নিবেশ ঘটানো প্রয়োজন বেতার অনুষ্ঠান উপস’াপনায়।
লেখক : শিক্ষক, শিক্ষাগবেষক