শহীদুল্লাহ্‌ ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ

আবু সাঈদ
Untitled-2-copy

বাঙালির ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশ্রুতকীর্তি মনীষী হিসেবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ (১৮৮৫-১৯৬৯) স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বাঙালিকে ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস বিষয়ে সচেতন করা, বাঙালি জাতিসত্তার ‘ঐতিহাসিক সংজ্ঞা’ নির্ধারণ করে তিনি এদেশের ক্রান্তিলগ্নে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন। সারা জীবন নিজেকে যুক্ত রেখেছেন অগ্রসর চিন্তায় ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায়। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু। “এই পাঠশালায় ঈশ্বরচন্দ্রের প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, কথামালা ও বোধোদয় পড়েছিলাম বলে মনে আছে। বোধহয় দশ বছর বয়সের সময পিতার কর্মস্থান হাওড়ায় আসি। সেখানে একটা মাইনর স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম।” তারপর পাঠশালার ডিঙ্গি পার হয়ে ১৯০৪ সালে এন্ট্রান্স, ১৯১০ সালে সংস্কৃতে অনার্স; ১৯১২ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে এম এ; ১৯২৬ সালে প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯২৮ সালে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যয়ন করেন।
ভাষার প্রতি ড. শহীদুল্লাহ্‌র আন্তরপ্রবণতা ছিল আশৈশব। একথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্র ছাড়াও তাঁর যে সমাজ ও রাজনীতিভাবনা এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর যে উপলব্ধি, সুচিন্তিত মতবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর যে প্রত্যয়, বিশ্বাস এবং বিবেচনা তিনি বিভিন্ন অভিভাষণে এবং রচনায় ব্যক্ত করে গেছেন তা শুধু অভিনিবেশ নয়, মূল্যায়ন এবং বিশ্লেষণেরও দাবি রাখে।
বাংলা ভাষার মতো বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তিনি যে গভীর মনোযোগী তা তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনায় পরিস্ফুট হয়েছে। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে তাঁর নাতিদীর্ঘ রচনা ‘মদনভস্ম’ প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের অগ্রজা স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত ‘ভারতী’ পত্রিকায়। সেখানে তিনি বাঙালি সংস্কৃতি বিনির্মাণে হিন্দু – মুসলমানের সম্মিলিত প্রয়াসের উপর গুরুত্ব দেন। জোর দেন সাহিত্যের একতার উপরও। “কারণ আমরা উভয় সমপ্রাদায়-ই বাঙালি। বিধাতার বিধানে আমাদের উভয়কেই একত্রে বাঁচিতে মরিতে হইবে।”
ভাষাচর্চার বাইরে তাঁর অধীত বিষয় ছিল ভারতচর্চা। সম্রাট অশোক থেকে আর্য সভ্যতা হয়ে তুর্কি বিজয়; চর্যাপদ থেকে চণ্ডীদাস, আলাওল থেকে ভারতচন্দ্র হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তারপর কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু ভাষার ধারাবাহিকতা নয়, সাহিত্য – সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। লোকসাহিত্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং চর্চা তার প্রমাণ। এ চাওয়ার প্রধান কারন সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সঙ্গে ভাষার এবং ভাষার সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তার মৌল কাঠামোর সমন্বয় সাধন। যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত এবং তার আত্মবিকাশকে তরান্বিত করার জন্য। তিনি চেয়েছেন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার এবং ‘দেশের শিক্ষাপরিকল্পনায় ঋধপঁষঃু ড়ভ ঞযবড়ষড়মু স্থান পাক।’
বাঙালি হিসেবে মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে যেমন তাঁর গর্ব ছিল তেমনি অহংকার করতো বাঙালির ইতিহাস- ঐতিহ্য এবং বাঙালি জাতিসত্তা নিয়েও। আমাদের জাতিসত্তা নির্মাণে যে কয়জন মনীষার ভূমিকা চিরস্মরণীয়- তাঁদের মধ্যে ড. শহীদুল্লাহ অন্যতম। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে সে জাতীয়তাবাদ শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, যৌক্তিকও মনে হয়নি। বাঙালিরা পাকিস্তান চেয়েছিল ঠিক কিন্তু ভাষা হিসেবে উর্দুকে চায়নি।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাংলাকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার হচ্ছিল তা ছিন্ন করে এ ভাষাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আজীবন নিবেদিত ছিলেন। এ সংগ্রামকে শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রেক্ষিতে বিচার করলে ভুল হবে, এ সংগ্রাম ছিল বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠারও। নবসৃষ্ট পাকিস্তানে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারার বিরুদ্ধে ড. মুহম্মদ এনামুল হক লিখলেন ‘ পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু বনাম বাংলা’। এ প্রবন্ধে তিনি বাঙালি মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘ বাংলাকে ছাড়িয়া উর্দুকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে পূর্ব-পাকিস্তানবাসী গ্রহণ করিলে, তাহাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মৃত্যু অনিবার্য। ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে বাংলার মুসলমান ইংরেজি ভাষাকে গ্রহণ না করিয়া যে-জাতীয় আত্মঘাতী ভুল করিয়াছিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানবাসী এইবার উর্দুকে গ্রহণ করিলে অবিকল ওই জাতীয় আর একটি রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি করিবেন। এখনও এই ভুল করা হয় নাই, এখনও সাবধান হইবার সময় আছে। যাহাতে এই জাতীয় আত্মঘাতী এবং জাতিঘাতী ভুল অদূর ভবিষ্যতে না হইতে পারে, এখন হইতে সেই বিষয়ে সকলের সজাগ ও সচেষ্ট হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক।’ এ প্রবন্ধের সূত্র ধরে ‘ঢাকায় ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে’। ড. মুহম্মদ এনামুল হক প্রথমেই এ আন্দোলনের যে দার্শনিক রূপ দেন তাকে তাত্ত্বিক ও আদর্শিকতায় নিয়ে যেতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র ভূমিকা ছিল অনন্যসাধারণ। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সদম্ভ ঘোষণা দেন আটচল্লিশ সালের মার্চ মাসেই। এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত তথা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এর পরপরই ঢাকায় অনুষ্ঠিত ( ১৯৪৯ সালের পয়লা জানুয়ারি) ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের’ সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জিন্নাহর ঘোষণার বিরোধিতা করেন এবং বাঙালি জাতিসত্তার অসামপ্রদায়িক রূপটি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা হিন্দু মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয় এটি একটি বাস্তব সত্য। মা-প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছে যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-শাড়িতে ঢাকবার জোটি নেই।” এবং বাঙালি জাতিসত্তার মূলে যে বাংলা ভাষা এ পরম সত্য ড. শহীদুল্লাহ-ই প্রথম বাঙালির সামনে নিয়ে আসেন এবং বন্ধ করতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানী কর্তৃক বাংলা নিপীড়ন এবং জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র। কারণ ভাষা স্তব্ধ হলে সংস্কৃতি বিপন্ন হবে, ঐতিহ্য মুখ থুবড়ে পড়বে, ইতিহাস হয়ে পড়বে স্তিমিত, অচর্চিত। সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি হয়ে পড়বে দিশেহারা। কারণ বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ সবকিছু আবর্তিত হয় বাংলাকে কেন্দ্র করে। ভাষাই আমাদের ধ্রুবতারা।
তিনি দেখিয়েছেন ভাষা আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন এক ও অভিন্ন। এর সঙ্গে তিনি রাজনীতিকেও বিমুক্ত করেননি। এ ভাষা আন্দোলনই পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে তরান্বিত করেছে। গতি দিয়েছে রাজনীতিকে, সচেতন করে তুলেছে বাঙালি মুসলমানকেও। এ সচেতন করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা প্রবাদপ্রতিম। পুঁথি সাহিত্যের গুরুত্ব এবং বাঙালি মুসলমানের প্রতি তাঁর উক্তি ‘ গুটি কত শিক্ষিত লোকের কথা ছাড়িয়া দিলে, এখনও এই পুঁথি সাহিত্যই বাংলার বিশাল মুসলমান সমাজের আনন্দ ও শিক্ষা সম্পাদন করিতেছে। পুঁথি-পাঠক যখন সুর করিয়া পুঁথি পড়িতে থাকে তখন শ্রোতৃবর্গ কখনও বাংলার শহীদগণের দুঃখে গলিয়া যায়, কখনও আমীর হামজার বা রোস্তমের বীরত্বে মাতিয়া ওঠে, কখনও বা হাতেমের দয়ায় ভিজিয়া যায়। বেচারাদের আহার নিদ্রার কথা চিরদৈন্যের কথা মনে থাকে না। দীনেশ বাবুর বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ন্যায় কে আমাদের এই পুঁথি সাহিত্যের রচনা করিবে?” ‘ মুসলমানি বাংলা’ বলে দীনেশ চন্দ্র সেন যে ভাষার কথা বলেছেন তাঁর ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে’ সে ধরনের কোন ভাষার কথা ড. শহীদুল্লাহ্‌ স্বীকার করেননি বরং প্রতিবাদ করেছেন তিনি মনে করেন বাংলা ভাষা-ই এতদঞ্চলের মানুষের ভাষা। এবং এ ভাষা-ই এক করেছে বাঙালিকে। এ ঐক্য তখনকার সময়ের জন্য যেমন সত্য, সত্য এ সময়ের জন্যও।