শব্দাগ্নির সাতই মার্চ

মহীবুল আজিজ
Banga 02

জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের অন্তিমে পরবর্তী ফাল্গুনে বাঙালির দ্বিগুণ শক্তিতে আবির্ভাবের প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল। বস’ত অন্য এক ফাল্গুনেই অনুভব করা গেল বাঙালির সেই অপরিসীম শক্তির প্রচণ্ডতাকে। ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ বিদেশি শিরোনাম হয়েও আজ বাঙালির জাতিসত্তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে রয়েছে। তবে, দু’টোই আমাদের ফাল্গুনে। জহির রায়হানের এক ফাল্গুন বাস্তবে পরিণত হয়ে গেছে আরেক ফাল্গুনে- শব্দের আগুন-ঝরানো এক অভূতপূর্ব ফাল্গুনে। সেই আগুন ঝরালেন বাঙালির জাতিসত্তার অহংদৃপ্ত আত্মপ্রকাশের মহান কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তাঁরা উনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানের ধারণকৃত ছবি দেখেননি তাঁরা কেবল ৭-মার্চের রেসকোর্সের জনসমুদ্রের ছবিটি দেখেই বুঝতে পারেন, ১৯৭১-এর সাত মার্চ উনসত্তরের অগ্নিশক্তি-বাহিত হয়ে তীব্র দাহ্যতায় ফেটে পড়বার জন্যে কেমন উন্মুখ ও উচ্চণ্ড। কেবল একজন মানুষের বক্তব্য শুনবার জন্যে অধীর আগ্রহে থাকা চিরশান্তিপ্রিয় বাঙালির সেই ক্ষণ সাত মার্চ কিন’ ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট থেকেই বাঙালির অভিযাত্রা সেই মাহেন্দ্র ক্ষণের অভিমুখে। এত যে বিশাল-ব্যাপ্ত সমুদ্রের জনতা, কেন তারা অপেক্ষা করে এবং কী তারা আশা করে! তাদের আশা বা প্রত্যাশার পশ্চাতে আসলে আশাভঙ্গের বেদনাই বিরাজমান। ৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী বাঙালি বিজয় লাভ করলেও সে ক্রম প্রতারণা আর অবিমৃষ্যকারিতার শিকার। এতকাল ছিল অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বঞ্চনার শিকার, এবারে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। কাজেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোকাবেলায় বাঙালিরও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল অমিতবিক্রম শক্তির আধারের। বঙ্গবন্ধু বাঙালির চেতনায় ধরা দিলেন সেই শক্তির মূর্ততা নিয়ে।
এখন যাকে আমরা ‘ওর্যাল হিস্ট্রি’ বলি, সাত-ই মার্চের ভাষণ হচ্ছে সেই ধরনের ইতিহাস। স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশে বাঙালির আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলির সাক্ষ্য মেনে ভাষণটি সংক্রমিত হতে থাকে। একই সঙ্গে লক্ষ করতে হয়, শম থেকে আরম্ভ হওয়া শব্দাবলী ক্রমে শোক-বিষাদ অতিক্রান্ত হয়ে রৌদ্র ও বীরত্বের ব্যঞ্জনার দিকে প্রধাবিত। ত্যাগের মহিমা সন্তাপের দিকে না গিয়ে গৌরবের দিকে যাত্রা করে। আর সেই গৌরব হলো আহ্বানের, সেই মহিমা হলো অর্জনের।
বঙ্গবন্ধু জানতেন শোক কেবলই উদযাপনের জন্যে, শোকে অর্জন হয় না, অর্জনের জন্যে চাই রণ-রক্ত। রক্তদানে অভ্যস্ত বাঙালিকে আরও রক্তের জন্যে প্রস’তি নেওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হলো তাঁর কণ্ঠে। শোক থেকে উৎপন্ন হলো শক্তি। সাত/আট হাজার বছর আগেকার সুমেরীয় সভ্যতার কথা মনে পড়ে। যুদ্ধে নিহত সেনাপতি এন্কিডু’র মৃত্যুতে শোকাহত রাজা গিলগামেশ তাঁর জনগোষ্ঠীর সামনে বর্ণনা করেন অস্তিত্বের লড়াইয়ে লিপ্ত নিম্ন-সুমেরীয় জনগোষ্ঠীর করুণ আত্মত্যাগের কাহিনী। সেনাপতির আত্মদানের মহিমা স্মরণ করে শোকে ভেসে যান তিনি। কিন’ পরমুহূর্তেই ফের গিলগামেশ উত্থিত হ’ন শক্তিতে। মৃত্যুর প্রতিশোধের শপথে বজ্রের শক্তি তিনি সঞ্চারিত করেন তাঁর জনতার চেতনায়। বঙ্গবন্ধুও শোকের সন্তাপে দাঁড়িয়ে উত্থিত হলেন বজ্রের শক্তিতে। তাঁর অজেয় বজ্রের স্পর্শে করুণ রস পরিণত হতে থাকে বীর রসে। গিলগামেশ বলেছিলেন তাঁর জাতিকে, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁদের সংগ্রাম পৌঁছাবে লক্ষ্যের মঞ্জিলে। বাঙালির গিলগামেশ অমিতবিক্রম বঙ্গবন্ধুও তাঁর জাতির প্রাণ চেতনায় সঞ্চারিত করলেন তেমনই বৈদ্যুতিক আবেশ- “আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।”

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ৭ তারিখে যে-মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন সেইটাই বাঙালির স্বাধীনতার অভিষেক মুহূর্ত। কবি নির্মলেন্দু গুণ যথার্থই পর্যবেক্ষণ করেন, স্বাধীনতা শব্দটি ঐ ক্ষণ থেকেই আমাদের হলো। যে-মুহূর্তটিতে তিনি মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি যে-‘আমি’, সে-‘আমি’ বস’ত এক জাতীয় ‘আমি’, যে-‘আমি’ সকলের প্রাণের ‘আমি’। তখন সেই সমকালে আরও যত কাণ্ডারি-ই থাকুক না কেন, জাতি তার সম্মিলিত প্রাণের চেতনা দিয়ে বরণ করে নেয় তাঁকেই। সেটা যেমন তিনি স্বয়ং জানতেন, তেমনই তা জানা ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির। আঠারো মিনিটের শব্দস্রোতের পলে-পলে সেই ‘আমি’র বীরত্ব-ব্যঞ্জনা যে-‘আমি’ আসলে বৃহত্তর ‘আমাদের’-এর সঙ্গে বাঁধা এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে। সেই আত্মবিশ্বাসী আমির প্রভাব এবং ক্ষমতা কতখানি তা দেখা যাক একটিমাত্র বাক্য থেকে- “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।” যদি প্রশ্ন ওঠে, “তিনি হুকুম করার কে?” তবে তার উত্তরও তৈরি- “হুকুম করার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই।” হুকুমাধিকারের সেই শীর্ষ অবস’ানে কেবল তিনিই অবসি’ত ছিলেন। তাঁর সেই অবস’ানটি নির্মিত হয়েছিল এক দীর্ঘ সংগ্রামের পরম্পরায়। তিনি যেমন জাতির সম্মিলিত বেদনার সাক্ষী, জাতিও তেমনই তাঁর আত্ম-উৎসর্গের ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৭১-এর মার্চ মাসের ৭-তারিখে তাই তাঁর ‘হুকুম’ করবার অধিকার তাঁরই, আর কারও ছিল না, আর কারও নয়। ৭-মার্চ থেকেই তিনি হয়ে গেলেন জাতির জনক। সেই জনকত্ব ১৬ ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হলো অবিসংবাদিতভাবে। ‘মুক্তির সংগ্রাম’ এবং ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এর ঘোষণার পরে আর কিছুই বস’ত বাকি থাকে না, বাকি থাকে কেবল যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ বাঙালি চালায় রণাঙ্গনে আর মাঠে-ময়দানে এবং সেই যুদ্ধ বঙ্গবন্ধু চালিয়ে যান প্রতি মুহূর্তের মৃত্যুর ছায়ায় বিদ্ধ হতে-হতে।
১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর এক অপরাহ্নে পেনসিলভ্যানিয়ার গেটিসবার্গে উত্থিত হয়েছিল যে-উত্থানের বাণী; ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসি-র লিংকন মেমোরিয়্যালে ধ্বনিত হয়েছিল যে-স্বপ্নকামনার সুর; প্রায় তেমনই এক অনুপম উত্থান বিশ্ব লক্ষ করলো ১৯৭১-এর ৭ মার্চে- ঢাকার রেসকোর্সে যখন –
“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।”
সেই থেকে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি চিরকালের জন্যে বাঙালির জাতীয় সম্পদ হয়ে রইলো। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “রক্ত আরও দেবো।” রক্ত দিয়েই জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত তিনি তাঁর শপথ রক্ষা করেছিলেন।