শবে বরাত : মুসলিম উম্মাহর সৌভাগ্যের রজনী

মুহাম্মদ মহরম হোসাইন

আজ পবিত্র শবে বরাত। শব ফার্সি শব্দ, এর অর্থ রাত আর বরাত মানে ভাগ্য, অদৃষ্ট। সুতরাং শবে বরাত অর্থ হচ্ছে ভাগ্য রজনী। বিশ্ব মুসলিম উম্মার কাছে মহিমান্বিত ও সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে খ্যাত এ রাতের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অধিক। সৌভাগ্য রজনী হিসেবে বান্দাদের গুনাহ মাফ, বিপদমুক্তি ও রিজিক বৃদ্ধির উসিলা হিসেবে পরম করুণাময় আল্লাহ তা’য়ালা ফজিলতময় এ রাত আমাদের দিয়েছেন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে একে ‘লাইলাতুম মুবারাকাতুন’ বা বরকতময় রাত আর হাদিস শরিফে এই রাতটিকে ‘লাইলাতুম মিন নিসফি শাবান’ বা মধ্য শাবানের রজনী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাবান মাসের ১৪ তারিখ, সে অনুসারে আজ সন্ধ্যা থেকেই আগামীকাল সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত এই মহিমান্বিত রাতের অবস্থান। মানুষের জন্যে মহান রাব্বুল আলামিন যে পাঁচটি রাতকে বিশেষভাবে মর্যাদা দিয়েছেন তার মধ্যে লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত অন্যতম। বিশ্বের মানুষের যাবতীয় মঙ্গল-অমঙ্গল, রিজিক-দৌলত সবকিছুই নির্ধারিত হবে এই পবিত্র রাতে। মাহে শাবান বা শাবান মাসকে প্রিয় নবী (সা.) নিজের মাস বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে, রজব ও রমজান মাসের মধ্যবর্তী শাবান মাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকসংখ্যক রোজা রাখতেন এবং মধ্য শাবানের দিবাগত রাতটিকে ইবাদত বন্দেগিতে পার করতেন।
হযরত আবু হরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব ও শা’বান মাস এলে দোয়া করতেন এভাবে ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা‘বানা ওয়া বাল্লিগ্না রামাদানা’ অথাৎ হে প্রভূ ! রজব ও শা’বান মাসে আমাদের জন্য বরকত নাজিল করুন আর আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
বলা হয়ে থাকে, রজব মাসে হালচাষ করে ইবাদতের বীজ বপন করো, শা’বান মাসে তাতে পানি দাও আর রমজানে ফসল তোলো। অন্যান্য মাসের তুলনায় শা’বান মাসের রোজা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে বেশী প্রিয় ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার খুৎবায় বলতেন, ‘রমজানে সুষ্ঠুভাবে রোজা রাখার মানসে তোমরা শা’বান মাস রোজায় অভ্যস্ত হয়ে শরীরকে পাক-পবিত্র করে নাও। যে ব্যক্তি এ মাসে তিনটি রোজা রাখবে তার গুনাহ মাফ করা হবে’। (আবু দাউদ শরীফ)
লাইলাতুল বরাতে আল্লাহর অসীম রহমত ও নৈকট্য লাভের সুযোগ থেকে খোদাভীরু বান্দারা নিজেদের বঞ্চিত করেন না। মহান আল্লাহ রহমত লাভের জন্য লাইলাতুল বরাতে নিবিষ্টচিত্তে গাফুরুর রাহিমের দরবারে তওবা করা, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা, নফল নামাজ আদায় করা, দরূদ শরিফ পাঠ করা, দান খয়রাত করা, তসবিহ-তাহলিল পাঠ করা, দোয়া মুনাজাত করা, পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করা, কবর জিয়ারত করা এবং আল্লাহ পাকের রেজামন্দি হাসিলের জন্য সারারাত ইবাদত বন্দেগিত নিয়োজিত থাকা বান্দাদের জন্য বিশেষ সুযোগ হিসেবে গণ্য হয়।
ধার্মিক মুসলমানরা অতীতের ভুলত্রু টির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা ও ভবিষ্যতে পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের সামর্থ্য কামনা করে মোনাজাত করবেন ও সেহরি খেয়ে রোজা রাখেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, ‘যারা (অপরাধ করার পর অনুতপ্ত হয়ে) তওবা করে নিজেদের সংশোধন করে ও সত্য প্রকাশ করে, আমি তাদের তওবা কবুল করি, আর আমি তওবা গ্রহণকারী করুণাময়’(২:১৬০)।
আর রাসূল (সা.) এ রাত প্রসঙ্গে এরশাদ করছেন, যখন শাবান মাসের অর্ধেকের রাত আসবে, তোমরা রাতে জাগ্রত থাকবে এবং পরেরদিন রোজা রাখবে।
সূর্যাস্তের পর থেকে এই রাতে আল্লাহ তা’য়ালা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে অবস্থান করে বান্দাদের প্রতি আহ্বান জানাতে থাকেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছে কি কেউ রিজিক প্রার্থী, আমি তাকে রিজিক দান করব। আছে কি কোন বিপদগ্রস্ত লোক আমি তাকে বিপদ থেকে মুক্তিদান করব। ফজর ওয়াক্ত পর্যন্ত মহান আল্লাহ এই আহ্বান জানাতে থাকেন। তবে এই মহিমান্বিত রাতেও কিছু কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হবে না। এরা হলো মুশরিক, জাদুকর, গণৎকার, ব্যাভিচারী, সুদখোর, মদ্যপ, পিতা-মাতাকে কষ্টদানকারী সন্তান এবং গিবৎকারী বা কুৎসা রটনাকারী।
এ পবিত্র রাতকে সামনে রেখে মহান রাব্বুল আলামিনের করুণাধারায় সিক্ত হতে আমরা সবাই যেন খারাপ দোষ ও কর্ম থেকে নিবৃত্ত থাকি। সৎভাবে জীবন নির্বাহ করে আপন পিতা-মাতা ও আত্মীয়-পরিজনদের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করি। ক্ষমার অযোগ্য কর্মগুলো থেকে নিজেকে সর্বদা বিরত রেখে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া না করি।
প্রতিবছর শবে বরাতের রাতে আল্লাহর পরম দয়া ও কৃপা লাভের সুযোগ যেন আমাদের নসিব করে। তাই আসুন, ইবাদত-বন্দেগি ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে যেন এই মহিমান্বিত রাতের ফজিলতকে আমরা কাজে লাগাই। আল্লাহ যেন আমাদের সবার দোয়া কবুল করার সৌভাগ্য দান করেন। আমিন
লেখক: সাংবাদিক।

আপনার মন্তব্য লিখুন