শতাব্দীর কাল-পরিক্রমায় শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)

ড. সেলিম জাহাঙ্গীর

মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার প্রবর্তক গাউসুল আযম শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারীর (ক.) (১৮২৬-১৯০৬) ঐতিহাসিক উল্লেখযোগ্য বড় মাপের বিশেষত্ব হলো: তিনি মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকা প্রচারের পাশাপাশি তাঁর পবিত্র বংশধারা এবং নির্বাচিত খলিফাদের মাধ্যমে এ ত্বরিকার বিশেষত্বসমূহ বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার সুব্যবস’া করে গিয়েছেন গভীর তাৎপর্যপূর্ণভাবে। ‘ছরগোরহে আউলিয়া’য় অভিষিক্ত বলে ‘মারাযাল বাহরাইন’ সম তাঁর পবিত্র রক্ত ও বেলায়তের অপূর্ব সম্মিলনে ‘সোনায় সোহাগা’র মতো, সুবাসিত গোলাপের মতো ইতিহাসের আলোকে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে কিংবদন্তিতুল্য চিরায়ত-শাশ্বত দুটো পুতঃপবিত্র নাম : তদীয় পৌত্র অছিয়ে গাউসুল আযম সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (১৮৯৩-১৯৮২) এবং (তদীয় প্রথম প্রপৌত্র) শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (১৯২৮-১৯৮৮)।
গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর প্রথম প্রপৌত্র শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর মধ্যে সমাবেশ ঘটেছিল বেশ কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য যা তাঁর আধ্যাত্মিক অবস’ানকে চিহ্নিত করণের ক্ষেত্রে রীতিমতো উচ্চতর তাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়বস’তে পরিগণিত হওয়ার দাবি রাখে কালের প্রবহমান ধারায়, ইতিহাসের আলোকেই।
ইতিহাসের পথ-পরিক্রমায়, কালের বিচারে শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর ইতিহাস বড় বেশিদিনের নয়। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তাঁর আবির্ভাব (জন্ম ১৯২৮) এবং একই শতাব্দীর নবম দশকে ওফাত (১৯৮৮); জাগতিক হিসেবে মাত্র ৬০ বছর।
৬০ বছর সময়কালে এ জগৎকে দৃষ্টি আকর্ষণীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত, আলোড়িত এবং আধ্যাত্মিক মহিমায় ছন্দোবদ্ধভাবে আন্দোলিত করে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় রীতিমতো কিংবদন্তিতে পরিগণিত হয়েছিলেন অবিসংবাদিতভাবে। যা ছিল সংশ্লিষ্ট সকল মহলের প্রায় সকলের হৃদয়ের পাশাপাশি মুখে মুখেও উচ্চারিত এবং অনেকের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও প্রতিফলিত। বলাবাহুল্য, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব আজও সমাজ জীবনের অনেকের স্মৃতিতে অম্লান, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্মরণীয়। শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর এ দুনিয়াতে আবির্ভাব এবং মহাপ্রয়াণের মোটামুটি হালখাতায় যে বিশেষত্বগুলো বিশেষভাবে স্মরণীয় তা হলো:
(১) পিতৃ-মাতৃ উভয়কুলে মাইজভাণ্ডারী শরাফতের ‘মারাযাল বাহরাইন’ হিসেবে একইসাথে গাউসিয়ত-কুতবিয়ত দুটোরই ধারক-বাহক হিসেবে আত্মপ্রকাশ।
(২) গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নবজাতকের নাম রাখা হয় জিয়াউল হক (সত্যের আলো)।
(৩) এ দুনিয়াতে আসার অব্যবহিত পর জন্ম-মৃত্যুর এক আশ্চর্যজনক দ্বন্দ্বমূলক ক্রান্তিলগ্নে নানা গাউসুল আযম বিল বিরাসত সৈয়দ গোলাম রহমান বাবা ভাণ্ডারীর (১৮৬৫-১৯৩৭) হস্তনিঃসৃত পানির বরকতে আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর নবজীবন লাভ।
(৪) আধ্যাত্মিকতার আনুষ্ঠানিক বিকাশের সূচনালগ্নে ১৯৫৩ সালে গাউসুল আযম শাহ্ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারীর স্বপ্নাদেশ এবং আধ্যাত্মিক মর্যাদার সম্মানিত প্রতীক ক্ববা বা জুব্বা প্রদানের নির্দেশ।
৫) বাবা সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাৎপর্যপূর্ণ আধ্যাত্মিক পরিচর্যার পাশাপাশি পুত্রের সুগভীর আধ্যাত্মিক মহিমা বিষয়ক মন্তব্য ও আশাবাদ।
(৬) ১৯৬৬ সালের ৯ মাঘ গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে খিলাফতের আনুষ্ঠানিক উত্তরাধিকার হিসেবে পুত্র জিয়াউল হককে অভিষিক্তকরণ।
(৭) ১৯৭৩ সালের ৩০ আষাঢ় পুত্রের স্বীয় মহিমা, আধ্যাত্মিকতার উদ্ভিন্ন-বিকাশকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকাশের প্রয়োজনে নিজের উদ্যোগে ও ব্যবস’াপনায় বাগানবাড়িতে সপরিবারে পৃথক বসবাসের ব্যবস’া।
(৮) ১৯৭৪ সালের ৬ এপ্রিল ভক্তদের উদ্দেশ্যে স্বীয় পুত্রের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেন: বৈশাখের ১ তারিখে থেকে একটা নতুন যুগের সৃষ্টি হচ্ছে, আমি খেদমতের জিম্মাদারী ছেড়ে দেব।
(৯) বাবা অছিয়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর জীবন সায়াহ্নে স্বীয় আধ্যাত্মিক মহিমার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে বাবার ১২ বছর নতুন জীবন প্রাপ্তির আধ্যাত্মিক অনুঘটক।
(১০) রহস্যপূর্ণ খিজরী ত্বরিকার লক্ষণাক্রান্ত মহাসমুদ্ররূপী মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার সৃজনশীল বিকাশমান ধারায় স’ান-কাল-পাত্রের আলোকে এ ত্বরিকাকে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় সর্বক্ষেত্রে প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে নবতর ইতিহাস সৃষ্টি।
(১১) প্রচলিত নাস্তিক্যতাবাদ ও বস’বাদী চিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীতে মহান স্রষ্টার প্রতি অবিচল আস’া ও বিশ্বাসের ধারাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে কালোপযোগী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পবিত্র কালাম (বাণী) উচ্চারণ।
(১২) তাঁর শেষ জীবনে স্রষ্টার সাথে মিলনের অভূতপূর্ব অপূর্ব দৃশ্য, মাইজভাণ্ডার-এর ইতিহাসে স্মরণকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নামাযে জানাযা।
শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর (ক.) জীবনে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারামতের বিষয় পরিলক্ষিত হতো। যাদের সাথে এই সমস্ত কারামতের ঘটনা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকত। এর মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযাগ্যে ৬০টি কারামত সংগ্রহ করে তাঁর জীবনীগ্রনে’ সন্নিবেশিত করা হয়েছে। উল্লেখযাগ্যে কয়েকটি কারামতের বর্ণনা। ১. তেল ছাড়া গাড়ি চালানোর ঘটনা, ২. তাঁর নাম স্মরণে ডুবন্ত ট্রলারের নিরাপদে উদ্ধার, ৩. তাঁর কৃপায় আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার, দশবছর আয়ুবৃদ্ধি, ৪. মাধ্যাকর্ষণ শক্তির উপর তাঁর প্রভাব।
তাঁর পবিত্র বাণীসমূহকে নিম্নোক্ত ১৯টি শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে ১. মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকা মাহাত্ম্য, ২. মাইজভাণ্ডারী দরবার মাহাত্ম্য, ৩, প্রকৃত অলি-আল্লাহ্র দরবারের বিশেষত্ব, ৪. দরবার থেকে ফয়েজ-রহমত প্রাপ্তির নিয়ম ও কৌশল, ৫. স্বীয় মাহাত্ম্য, ৬.ঈমানের তাৎপর্য, ৭.বিশ্বপ্রকৃতি সম্বন্ধে ব্যাখ্যা, ৮. মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য, ৯. ‘নিজেকে জানার হেকমত বয়ান, ১০. মারিফতের সাধনায় নামাযের অপরিহার্যতা, ১১. প্রকৃত বায়াতের দায়-দায়িত্ব, ১৩. প্রকৃত জ্ঞানের সংজ্ঞা, ১৪. ভাল কাজকে ইবাদাতের সাথে তুলনা, ১৫. ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে চলার কৌশল, ১৬. সর্বক্ষেত্রে নিয়ম শৃঙ্খলার গুরুত্ব, ১৭. শিশু-কিশোরদের দরবারে নিয়ে যাওয়ার হেকমত, ১৮. মানবসেবা ও মানব শ্রেষ্ঠত্ব, ১৯. জনগণের রাষ্ট্রীয় অভিভাবক হিসেবে সরকারের নৈতিক কর্তব্য নির্ধারণ।