লেখায় রেখায় ঈদ সংখ্যা

ড়াকার আনজীর লিটনের তিন লাইনের ছড়া নামে তিন লাইন করে (এক কলামে) মোট ছয়টি ছড়া ছাপিয়েছে তারা যা ছড়াকার হিসেবে আমার কাছে ভালো লেগেছে। ছড়াগুলোও চমৎকার। তিন লাইনের একটি ছড়া হচ্ছে-
“পড়েন কম দেখেন বেশি
ভাবেন কম লেখেন বেশি
ভাবের জ্ঞানী ঠেকেন বেশি।”
‘এই সময়’ ম্যাগাজিনে সাংবাদিক কুদ্দুস আফ্রাদ আমাদের রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে লিখেছেন “রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ খ্যাতির বিড়ম্বনা।” চমৎকার একটি নিবন্ধ এটি। মোহিত কামাল সম্পাদিত সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা ‘শব্দঘর’। শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ এই ম্যাগাজিনটির মূল স্লোগান। ঈদ সংখ্যাটিও লেখায় রেখায় নান্দনিক। প্রথমে তারা নান্দনিকতার স্বাক্ষর রেখেছে। তাদের ঈদ সংখ্যার প্রথম লেখা বিশেষ ঈদ উপহার শিরোনাম দিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত চিত্রনাট্য অর্থাৎ নাটক। নাম ‘ভুল ও ভালোবাসা’। এই চিত্রনাট্য দিয়ে চলচ্চিত্রও তৈরি করা যাবে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত চার কথা সাহিত্যিক নিয়ে তাদের প্রধান রচনা ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত চার কথা সাহিত্যিক’। তাঁরা হলেন- হাসান আজিজুল হক (১৯৭০), রশীদ হায়দার (১৯৮৪), শাহাদুজ্জামান (২০১৬) ও মামুন হুসাইন (২০১৭)। ঈদ সংখ্যা ‘শব্দঘর’-এর আরেকটি ভিন্নধর্মী প্রয়াস ‘শব্দঘর-অন্য প্রকাশ-এর কথা শিল্পী-অন্বেষণ-২ এ অংশগ্রহণকারী তরুণ কথা শিল্পীদের পাঠানো পাণ্ডুলিপি থেকে নির্বাচিত প্রথম সেরা উপন্যাস ২০১৮ প্রকাশ করেছে। নাম ‘অগ্নিপ্রভাত’। নয়টি পর্বে তারিখ দিয়ে ভাগ করা এটি মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়ছোঁয়া উপন্যাস। প্রথম পর্ব শুরু ২৫ মার্চ, ১৯৭১। শিরোনাম ‘লাল শাড়ি সবুজ ধানের ক্ষেত সবকিছু তছনছ হয়ে গেল।’ লেখক সাঈদ আজাদ। পেশায় সরকারি কর্মকর্তা।
নান্দনিক ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করেছে দৈনিক জনকণ্ঠ। এখানে প্রবন্ধ লিখেছেন দেশবরেণ্য সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেন। নাম ‘অসাম্যের বিশ্বে সাম্যের স্বপ্ন’। জনকণ্ঠের বিশেষত্ব হচ্ছে প্রবন্ধ। আলমগীর সাত্তার-এর ‘কাঠমন্ডু দুর্ঘটনা ও সুখ-দুঃখের স্মৃতি’, সৈয়দ জিয়াউল হকের ‘পাকিস্তানি রাজনীতি : আইউব খানের ক্ষমতা দখল পর্ব’, নাসরিন জেবীনের ‘৪৭-এর পরবর্তী বাংলা সাহিত্য’, এডওয়ার্ড সাঈদ লিখিত ‘পরিচয়ের সন্ধান’-এ শিরোনামে প্রবন্ধ এই সংখ্যায় ছাপা হয়েছে।
প্রথম আলোয় উপন্যাস লিখেছেন হাসনাত আবদুল হাই, রেজাউর রহমান, আনিসুল হক, আসিফ নজরুল, মশিউল আলম। প্রথম আলোর ব্যতিক্রমধর্মী দুটো আয়োজন : ক. দেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র শিল্পী ববিতাকে নিয়ে ‘ছায়ার আমি কায়ার আমি’ শিরোনামে নিবন্ধ, ও খ. বাংলাদেশের দুই কিংবদন্তী ক্রিটেকার মাশরাফি বিন মর্তুজা ও সাকিব আল-হাসানকে নিয়ে তারেক মাহমুদের লেখা ‘মাঠের বাইরে দুই অধিনায়ক’।
দৈনিক সমকাল উপন্যাস ছেপেছে হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, মঞ্জু সরকার, শেখ আবদুল হাকিম, বুলবুল চৌধুরী, মঈনুল আহসান সাবের, ধ্রুব এষ ও আনিসুর রহমানের লেখা মোট আটটি উপন্যাস।
সমকালের উল্লেখযোগ্য আয়োজন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এম. এ মোমেন-এর লেখা ‘ভিনদেশি সাংবাদিকের চিঠি, ভূমিকা ও ভাষান্তর’। গল্প উপন্যাস ভ্রমণ কাহিনী বাদে সাতদিনের উল্লেখযোগ্য লেখা হচ্ছে জান্নাতুন নিসার লেখা ‘ছড়া নিয়ে নানা কথা’ ও সুজন সরকার-এর লেখা ‘গণহত্যায় সাতক্ষীরার তালা উপজেলা’।
শুরুতেই নারীদের ঈদ সংখ্যা নিয়ে আলোকপাত করেছি। ষাট ও সত্তর দশকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ জায়া বেগম মুশতারি শফিসহ চট্টগ্রামের অগ্রজ নারী লেখকরা ‘বান্ধবী’ ম্যাগাজিন বের করতেন। ঢাকায় ‘ললনা’, ‘বেগম’। ললনা ও বান্ধবী প্রকাশ হয় না বহুকাল থেকে। তবে চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্ম শাহরিয়ার ফারজানার সম্পাদনায় নারীদের জন্য ‘নারীকণ্ঠ’ নামে একটি ম্যাগাজিন নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। বেগম পত্রিকার মতো লেখক সূচিতে শুধু নারী লেখকদের সীমাবদ্ধ না রেখে নারী পুরুষ সব লেখকদেরই লেখা প্রকাশিত হয় এ ম্যাগাজিনে। এটি নারী প্রগতির অগ্রযাত্রার বিশেষত্ব। তাদের স্লোগান ‘আমরা প্রগতির অভিযাত্রী’। চমৎকার ঝকঝকে একটি ঈদ সংখ্যা উপহার দিয়েছে ‘নারীকণ্ঠ’। ছাপার সৌকর্যে লেখা এবং শিল্পের মানদণ্ডে, বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি ম্যাগাজিন এটি। শিরোনামে আমি লিখেছি অবহেলিত শিশু সাহিত্য। কিন’ এই ম্যাগাজিনে সনেট দেবে-এর গ্রন’নায় স্কুল পড়য়া ছাত্রীদের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক ‘ছোটদের ভাবনায় ঈদ’ নামে একটি ফিচার প্রকাশ করা হয়েছে যা এই সংখ্যাটির উল্লেখযোগ্য দিক। এই সংখ্যার আরেকটি উল্লেখযোগ্য নিবন্ধ সুমি বিশ্বাসের লেখা ‘শুধু দিবসে নয়, মায়েরা বেঁচে থাকুক হৃদয়ে’। আমাদের দাদী-নানী-মা-খালাদের প্রাণের ম্যাগাজিন ‘বেগম’ ও ২০১৮-তে ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করেছে, যদিও মানের দিক থেকে সেটি উৎরে যেতে পারেনি।
শিরোনামেই বলেছি ঈদ সংখ্যায় ‘অবহেলিত মুক্তিযুদ্ধ ও শিশু সাহিত্য’। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই স্বাধীন দেশে আমাদের আজকের বর্ণিল ঈদ উদযাপন। কিন’ খুব কম সংখ্যক ঈদ সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস বা প্রবন্ধ বা নেতৃস’ানীয় অথবা প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধদিনের স্মৃতি, সেই সময়ে তাঁদের কেমন কেটেছিল ঈদ এই নিয়ে প্রতিটি ঈদ সংখ্যায় একটি লেখা থাকা প্রয়োজন, যা ঈদ সংখ্যাগুলোতে বিশেষ করে শীর্ষস’ানীয় দৈনিকের ঈদ সংখ্যাগুলোতে পাওয়া যায়নি। কেননা, সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে বীরযোদ্ধারা একদিন গত হবেন। তখন হাজারো চেষ্টা করলেও তাঁদেরকে আর আমরা পাবো না।
শিশু সাহিত্য যে অবহেলিত তার প্রমাণ বেশ কিছু দৈনিক পত্রিকায় প্রতি সপ্তায় শিশু সাহিত্যের পাতা থাকলেও ঈদ সংখ্যায় শিশুদের জন্য অন্তত ৫/৬টি পৃষ্ঠাও তারা বরাদ্দ রাখেন না। ফলে শিশুরা ঈদ সংখ্যা বিমুখ। যদিও শিশু একাডেমি, ‘শিশু’ ও চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর ‘নবারুন’ সরকারিভাবে ইদানিং ঈদ সংখ্যা বের করছে সেগুলো প্রতিটি জেলায় পৌঁছাতেই ঈদ পার হয়ে যায়। প্রথম আলো পত্রিকা কিশোর আলো নামে শিশু কিশোরদের জন্য পৃথক একটি ম্যাগাজিন বের করে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিলেও অন্যান্য পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলো তাদের ঈদ সংখ্যায় শিশু সাহিত্যকে স’ান দেয়নি, যা থাকা উচিত ছিল।
বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্য এগিয়েছে অনেক দূর। আমাদের দেশে নাম না নিয়েই বলি অনেক প্রথিতযশা ছড়াকার আছেন। ছড়া এমন একটি বিষয় যা ছন্দের দোলায় অল্প কথায় পাঠকচিত্ত নাড়া দেয়, খুব সহজেই পাঠকের মানসলোকের সাথে যুক্ত হওয়া যায়। তাইতো বিভিন্ন পত্রিকা সময়ের ছড়া, আজকের ছড়া, অণু ছড়া ইত্যাদি বিভিন্ন নামে প্রায় প্রতিদিনই ছড়া ছাপায়। কিন’ ঈদ সংখ্যায় ছড়া অনুপসি’ত।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বদেশ প্রথম প্রকাশের বছরে একটি ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। ঈদ সংখ্যাটি সাড়া জাগিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম পূর্বদেশ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যান্য দৈনিকগুলোও পরবর্তীতে ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করবে। কিন’ পরিতাপের বিষয় পূর্বদেশও তারপর আমার জানামতে আর ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
তবে এটা ঠিক, শৈল্পিক মানদণ্ডে, মানসম্মত লেখায়, মুদ্রণ সৌকর্যে, অলংকরণে আমাদের ঈদ সংখ্যাগুলো দিনদিন দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে, পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে, যা আলোর পথযাত্রীদের আলোর পথ দেখায়, প্রেরণা যোগায়, সৃষ্টিশীল লেখক তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে।