লেখকদের সবসময় কারাগারে থাকা উচিত

আদোনিস

ভাষান্তর: মাইনুল ইসলাম মানিক

আলি আহমাদ আদোনিস। ফ্রান্সে নির্বাসিত সিরিয়ান বংশোদ্ভূত কবি। আরব কবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম গদ্য কবিতা লিখেছিলেন। নোবেল পুরস্কারের তালিকায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতি বছর উঠে আসে তাঁর নাম। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ান গৃহযুদ্ধ বিতর্কের কারণে তিনি প্রবলভাবে বিতর্কিত সমগ্র আরব বিশ্বে। একই বছরের জুন মাসে তিনি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের কাছে একটি খোলা চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি প্রেসিডেন্ট আসাদকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার আহ্বান জানান। এরপরও আসাদ সরকার প্রায় ১৪০০ বেসামরিক লোককে হত্যা করে। অনেক সমালোচকই আদোনিসের ক্ষুদ্র ও বিলম্বিত এই আহ্বানের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি আরব বসন্তের ব্যর্থতা নিয়ে তাঁর মতামত পদ্য আকারে লিখেছিলেন। এটি প্যান-আারব পত্রিকা ‘আল হায়াত’-এ নিয়মিত কলাম হিসেবে প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত তার ‘ইসলামে সহিংসতা’ বইয়েও এসব কথা লিখেছিলেন। এটি যখন প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক সেসময়েই আইএস-এর হামলায় প্যারিসে ১৩০ জন নিহত হয়। যখন এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয় তখন আদোনিসের বয়স ৮৬। সাক্ষাৎকার গ্রহিতা জোনাথন গায়ার কবির সাথে ১৬ জুলাই ২০১৬ সালে একটি ক্যাফেতে সাক্ষাৎ করেন এবং দোভাষী শারাফ আল-হোরানির সাহায্যে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারটি নিউইয়র্ক রিভিউতে প্রকাশিত হয়। ইংরেজি হতে সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মাইনুল ইসলাম মানিক।

সিরিয়ান যুদ্ধের শুরুতে আপনি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে চিঠি লিখেছিলেন। সে সময়টা এখন হলে আপনি তাকে কী বলতেন?

কিছুই পরিবর্তন হয়নি। উল্টো সমস্যাটা আরো দীর্ঘতর হয়েছে। চল্লিশটি দেশ জোট বেঁধেও কেন আইএস এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারল না? কোনো কিছুই পরিবর্তন হবে না যদি রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে পৃথকীকরণ করা না হয়। আমরা যদি রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিয়ামকগুলোর মধ্যে প্রভেদ না করতে পারি তবে কিছুই পরিবর্তন হবে না। আরবের ধ্বংসাত্মক পরিণতি আরো ঘনীভূত হবে। ধর্ম মোটেও এ সমস্যার সমাধান নয়। বরং ধর্মই এই সমস্যার কারণ। সেজন্যই এটাকে রাষ্ট্র হতে আলাদা করতে হবে। প্রতিটি মুক্তমনা মানুষ যা চায় তা সে বিশ্বাস করে বলেই চায়। আমাদের উচিত সেগুলোর প্রতি সম্মান দেখানো। কিন্তু সমাজের ভিত্তিই হবে ধর্ম। না, তা হতে পারে না।

সিরিয়ায় শেষবারের মতো কখন গিয়েছিলেন?
২০১০ সালে।
আপনি কি তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে একটু বলবেন?
আমি জানি না-আমিও আপনার মতোই সংবাদ শুনি। আমি জানি সিরিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু কেন? উদ্দেশ্যটা কী? দেখুন, বিপ্লবীরা অবশ্যই তাদের দেশকে রক্ষা করবেন। তারা শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করবেন। আমি শুনেছি আলেপ্পোর মার্কেটগুলো সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এই সম্পদগুলো অন্য সব কিছুর মতো নয়। তারা কীভাবে এগুলো ধ্বংস করল? বিপ্লবীরা মিউজিয়াম লুণ্ঠন করে না। অন্য ধর্মাবলম্বী হলেই তাকে হত্যা করে না। বিপ্লবীরা পুরো জনগণকে বাস্তুচ্যুত করে না যেমনটা ইয়াজিদিদেরকে করা হয়েছে। এটা বিপ্লব? আমরা কেন এটাকে সমর্থন করব?

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ নিয়ে আপনার মতামত তো আরব বিশে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে..
আপনি জানেন, অনেক আরব আছেন যারা বিপ্লবীদের অধীনে চাকুরি করেন। তারাই আমার সমালোচনা করে। তারা বলে, আমি বিপ্লবের সাথে নেই। অথচ এটা এমন একটা বিপ্লব যা মিউজিয়াম ধ্বংস করে দেয়।
এটা কিসের বিপ্লব এবং কারা এর সাথে জড়িত?
কিছু কথা বলা যায় না…একজন লেখক কখনো হত্যাকারীদের পক্ষে থাকতে পারেন না। এটা সম্ভব নয়, আপনি জানেন। কিন্তু কিছু লোক হত্যা ও সহিংসতা পছন্দ করেন। যে লোক শরীরে মাইন বেঁধে একটা স্কুলে চলে যায় এবং বিস্ফোরণ ঘটায়, একজন লেখক বা শিল্পী কীভাবে তাদের পক্ষে থাকতে পারে? কীভাবে? ওরা তো শিশু। কীভাবে, তারা কীভাবে এই শিশুদের হত্যা করে? এটি এক অকল্পনীয় বিকৃতকর্ম। ভাইয়েরা, যদি এই শাসন ব্যবস্থা নিপীড়নমূলক হয় তবে শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো। স্কুল বা শিশুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো না। দেশকে ধ্বংস করো না। নির্দোষ মানুষকে হত্যা করো না। শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো। সাধারণ মানুষদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাটা অন্যায়। আমি কখনো কোনো ইতিহাসেই এমনটা দেখিনি। একজন আহাম্মককে প্রেসিডেন্টের পদে বসানোর জন্য একটা দেশকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, যেমনটা ইয়েমেনেও করা হয়েছে।

দেখতেই তো পাচ্ছেন, দেশের লোকেরা এটাকে সমর্থন করছে। বুদ্ধিজীবীরাও। আপনি তাদের পক্ষে না থাকায় তারা আপনার সমালোচনা করছে। আপনাকেও তাদের মতো দানব হতে হবে।
জিহাদীদের মতো-শুধুমাত্র জিহাদীরাই নয়। কারণ তারা তো জনগণের একটি অংশমাত্র। যেসব লোকেরা এসব দানবীয় কর্মকাণ্ড চায় না, তারা জনসম্মুখে তাদের প্রত্যাখ্যান ঘোষণা করুক। আপনি কি তাদের এই দানবীয় কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষুদ্র বিবৃতিও দেখেছেন? আমরা যা বলছি কেউ কেউ সেসব নিয়ে কথা বলছে এখন।
কিন্তু আপনি কি কোনো একটি আরব দেশের, কোনো একটি রাজনৈতিক দলের কিংবা কোনো একটি বড় গ্রুপের একটি অফিসিয়াল বিবৃতি এপর্যন্ত দেখেছেন? এই নিরবতা এই অন্যায়ের প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতি। মৌনতাও এক ধরনের সম্মতি। যা ঘটছে তা নিয়ে আরব দেশসমূহে একটি ক্ষুদ্র প্রতিবাদও নেই। এর মানে কী? তারা মানুষদেরকে হত্যা করছে। নারীদেরকে হাটে বিক্রি করে দিচ্ছে। তারা মানব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান মিউজিয়ামগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব নিয়ে সামান্যতম প্রতিবাদও নেই, বিবৃতিও নেই।
আপনার নতুন বই ‘ভায়োলেন্স অ্যাট ইসলাম’-এ আপনি লিখেছেন, আইএস ইসলামের পরিসমাপ্তিকে উপস্থাপন করে। সেক্ষেত্রে কি সেখানে কোনো নতুন শুরুর ইঙ্গিত আছে?
আপনি জানেন, আমাদেরকে বিশ্বাসী হতে হয়। কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব? যদি মানুষ, যদি মানবতা শেষ হয়ে যায় তবে তো পৃথিবীই শেষ হয়ে যায়। যতক্ষণ মানুষ থাকবে-ততক্ষণ আমি বলতে পারব আমি একা নই। মিসর বা অন্যান্য দেশেও অনেক মানুষ আছে যারা আমার কথাগুলোই বলে। সেজন্যই আমাদেরকে আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে যে, মানব সভ্যতা এমন একটা ধাপে পৌঁছবে যেখানে এই সমস্যার সমাধান থাকবে। কিন্তু সে সময়টি কখন এবং সেটি কীভাবে সম্ভব।
কিন্তু আমি এটুকু বলতে পারি যেই পর্যন্ত না আরবরা এই পুরনো ধাঁচের জিহাদী ধর্মীয় চিন্তার বাইরে না আসতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কোনো অগ্রগতি হবে না। এটা সম্ভব নয়। আইএস হচ্ছে পতনের আগে শেষ নড়েচড়ে ওঠার মতো।
পূনর্জাগরণের জন্য সময় প্রয়োজন। প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র গঠন হয়েছিল পনের শতাব্দীকাল আগে। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা তখন থেকেই জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারেনি। একজন নাগরিক কিছু দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার অধিকার লাভ করে। এখন পর্যন্ত আরব সমাজগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে আছে। সমান দায়িত্ব পালন করেও অনেকেই সমান অধিকার লাভ করে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে একজন মুসলমান যে অধিকার পেয়ে থাকে, একজন খ্রিস্টান সে অধিকার পায় না। পনের শতাব্দীকাল। এই পনের শতাব্দীর সমস্যাকে আমরা কীভাবে এক দুই সপ্তাহ বা এক দুই মাসে সমাপ্ত করতে পারি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সে সময়টি আসবে, হয়ত অন্য কোনোভাবে।

আপনি আরবদের ঘাটতির বিষয়ে যে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা ভাবছেন, পশ্চিমা দুনিয়া তো সেখানে অনেকটা উন্নতি করেছে।

ইউরোপ যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েছে তারা সেগুলো অতিক্রম করতে পেরেছে। তারা নতুনভাবে সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থাকে ধর্ম ও চার্চ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করতে পেরেছে। মধ্যযুগে পাদ্রীদের আদালতগুলো বর্তমান জিহাদীদের আদালতের মতো ছিল। তারা মানুষকে হত্যা করত এবং পুড়িয়ে ফেলত। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়া রাষ্ট্রকে চার্চ হতে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছে। তারা আধুনিক সমাজ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা তাদের মধ্যযুগে পড়ে আছি এখনো। যদি রাষ্ট্র ও ধর্মকে আলাদা করার মাধ্যমে পশ্চিমারা সফল হতে পারে, তাহলে আরব দেশসমূহেও রাষ্ট্র হতে ধর্মকে আলাদা করার ক্ষেত্রে বাধাদানের কোনো কারণ থাকতে পারে না। সবকিছু আমাদের প্রতিকূলে থাকা সত্ত্বেও এমনকি পশ্চিমাদের তুচ্ছতা সত্ত্বেও আমরা এই পৃথকীকরণ করে ছাড়বো। পশ্চিমারা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরব দেশ এবং শাসকদের ক্ষেত্রে খল মানসিকতা পোষণ করে থাকে। খল এজন্যই বলছি, কারণ তারা এই শাসকগণকে তাদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

তো এই রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে কার্যকর পৃথকীকরণ কীভাবে অর্জন করা যেতে পারে?
প্রথম থেকে আবার শুরু করতে হবে। এজন্যে সংগ্রাম প্রয়োজন।
সংগ্রাম অপরিহার্য। বসে থেকে তো কিছু করা যায় না। সংগ্রাম করতে হবে, লড়ে যেতে হবে। লিখতে হবে এবং বন্দী হতে হবে। আমি বুঝতে পারছি না আরব কারগারগুলো লেখক দ্বারা পরিপূর্ণ নয় কেন?
আমার ধারণা, আরব কারাগারগুলো লেখক দ্বারা পরিপূর্ণ নয় কারণ লেখকরা তাদের কাজটি যথাযথভাবে করছে না। তারা সমালোচনা করছে না। তারা গভীর ইস্যু নিয়ে কথা বলছে না, জীবনের প্রকৃত ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলছে না। তারা সত্যিকারের বিপর্যয় নিয়ে কথা বলছে না। এজন্যই আমার সমালোচনা লেখকগণের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। লেখকগণ সবসময় কারাগারে থাকা উচিত। কারাগারে থাকলেই তার মানে দাঁড়ায় তারা সত্য বলছে। কারাগারের বাইরে থাকা মানে তারা সত্য বলছে না। যতবেশি তাদের বই নিষিদ্ধ হবে, তত বেশিই আমরা সংস্কৃতির ভূমিকার কথা বলতে পারব।

কিন্তু কবিতা কি সিরিয়া জুড়ে চলমান ভয়ঙ্কর, অমানবিক সহিংসতার সমাধানে সক্ষম হবে? আউশভিতজের ঘটনার পর যে কেউ তো আদ্রোনোর দাবির সাথে একাত্ম হতেই পারেন যে কবিতা দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
এটি একটি কথার কথা। আউশভিতজ ছিল খুব ভয়াবহ বিপর্যয়। মানব সভ্যতা এরকম অনেক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হয়েছে। অপরদিকে, আমি বিশ্বাস করি লেখালেখি শুরু হয় প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে, খারাপ জিনিসের উৎসগুলো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে- সেগুলো যেখান থেকেই উৎপত্তি হোক না কেন। আদ্রোনো তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হতে বিরত রাখে, তার বক্তব্য গ্রহণে বাধ্য করে। এটা মস্ত ভুল। আমি তার সাথে একমত নই। আউশভিতজের পর এখন লেখা শুরু হোক।

সিরিয়ায় তো গৃহযুদ্ধ চলমান। তো এই সময়ে কাব্যচর্চা কোন পর্যায়ে আছে?

কবিতাকে বোমার সাথে তুলনা করা যায় না। এরকম তুলনা করা অনুচিত। একটা আহাম্মক বুলেটের আঘাতে একটি শাসনের পরিবর্তন হতে পারে। একটি জঘন্য বুলেট একজন মহান ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে যেমনটা কেনেডির ক্ষেত্রে ঘটেছিল। তাই কবিতা ও অস্ত্রের পারস্পরিক তুলনা হতে পারে না। এই তুলনার ভিত্তিটাই ভুল। কবিতা লেখাটা নির্মল বায়ু তৈরির মতো, সুগন্ধি তৈরির মতো, শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের মতো। এটা বস্তুগত মান দিয়ে মূল্যায়িত করা যায় না। কবিতা সেজন্যই যুদ্ধকে তুচ্ছজ্ঞান করে। যুদ্ধের সাথে কবিতার সম্পর্ক থাকে না। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে এর হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসযজ্ঞ, বিরানভূমির প্রায়শ্চিত্ত করা যেতে পারে। তারপর হয়ত কেউ লিখতেও পারেন। কিন্তু এটি যুদ্ধের একটি উপাদান।
আমাদেরকে বলা হল আইএস কবিতা লিখে, বলা হল ওসামা বিন লাদেন কবিতা লিখত। এসব আসলে কবিতা নয়। এগুলোকে কবিতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অবশ্যই নয়। কারণ কবিতা হচ্ছে একটি সামাজিক উপলক্ষ। সংস্কৃতি যখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, প্রতিটি মানুষই হয়ে ওঠে একজন কবি, একজন উপন্যাসিক। হাজার হাজার উপন্যাসিক থাকতে পারে। কিন্তু আপনি যদি পাঁচজনকে পান যাদের লেখা সুপাঠ্য, তাহলে আপনি ভালো কোনো স্থানে আছেন। আমেরিকায় হাজার হাজার উপন্যাস আছে, আপনি পাঁচ ছয়টা ভালো উপন্যাস পাবেন, অবশিষ্টগুলো আবর্জনা। একই ব্যাপার আরবদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আরবের সকলেই কবি, কিন্তু তাদের পঁচানব্বই ভাগই আবর্জনা।

আপনি সমপ্রতি অভিবাসন সম্পর্কে লিখেছেন। আপনি লিখেছেন, অভিবাসন আরব সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন তো আমরা ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যেও অভিবাসন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?

অভিবাসনের ক্ষেত্রে যে দুটি জিনিস আমি দেখতে পাই তা হচ্ছে, হয়ত সেখানে কোনো কাজ নেই নয়ত স্বাধীনতা নেই। সুতরাং নাগরিকগণ কিংবা মানুষগণ এমন একটা জায়গা খোঁজ করে যেখানে কাজের সুযোগ বা বাক-স্বাধীনতার সুযোগ থাকে। আরব দেশগুলো হচ্ছে গরিব। ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গত দুইশো বছরে আমরা একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। আমরা সেগুলোকে অকার্যকর অস্ত্রের পেছনে ব্যয় করেছি। আমরা অস্ত্র কিনি, আমরা বিমান কিনি,আমরা বিমানের পাইলট কিনি, আমরা পাইলট কিনি বিমান উড়িয়ে আমাদের জন্যে যুদ্ধ করার জন্য। সৌদি যেমনটা করছে ইয়েমেনে। বিশ্ব একটা ধূলিকাদা। আমরা আদিম। আমরা এখনো মধ্যযুগে। আর আপনি প্রশ্ন করছেন আধুনিক সময়ের। কায়রোতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি বা আমেরিকান গাড়ি দেখে বোকা বনে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা একটা গাড়ি বানাতে পারি না। আমরা একটা কফির কাপও বানাতে পারি না। তাহলে আমরা কীভাবে আধুনিক হলাম? পশ্চিমা রাজনীতিকরা আমাদের বোকা বানাচ্ছেন। আপনি বুদ্ধিজীবী। আপনার সেগুলো জানা উচিত।

সত্তর বছর আগে আপনি আদোনিস নামটি পছন্দ করেছিলেন।
না, আমি ধর্মীয় পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটা নাম তৈরি করেছিলাম।

কিন্তু এই নামটি তো এখন হয়ে উঠেছে-
একটি অপরাধ!

কেন?
এটি আরব বা মুসলিম নাম না হওয়ায় সমালোচনা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত ধর্মীয় সংস্কৃতি সকল সংস্কৃতিকে ভিত্তিহীন করে দিয়েছে। এটা অনেক মারাত্মক হয়ে উঠেছে।

তাহলে আরব সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কী?

আমি আপনাকে বলেছি, যেহেতু মৃত্যু ও ভালোবাসা জগতে বিরাজমান, শিল্পও বিরাজ করবেই। উদ্বিগ্ন হবার কিছুই নেই। পাঠকের সংখ্যা কম। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট। আধুনিক ধ্যান ধারণার পথিকৃৎ নিতসে তার সময়ে পরিচিত হতে পারেননি। কেউ তাকে চিনত না। সকল কালেই শিল্পের নিয়তি এরকম ছিল। কেউ কেউ পরিচিত হয়েছিলেন, তাদের বই লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রিও হয়েছিল, কিন্তু একটা সময় সেগুলো ধুলোয় মিশে গেছে।