লাশচুরি

অনিক শুভ

– আমাদের মনে হয় প্রেত সাধনার জন্য বজ্রপড়া কঙ্কাল লাগবে। হয়তো সে জন্য এখনো অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি।
– ঠিক বলেছিস। বজ্রপড়া মানুষের বডিতে যে প্রাকৃতিক ম্যাগনেট সৃষ্টি হয়, সেই ম্যাগনেট বডি দিয়ে প্রেত সাধনা চালিয়ে যাব। আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে যাব। হয়ে যাব পৃথিবীর শক্তিশালী এক কর্ণধার।
– তাহলে আমাদের সবাইকে বলে দিচ্ছি চারপাশে খোঁজ রাখার জন্য। যাতে বজ্রপড়ে কেউ মারা গেলে, সবার অগোচরে সে বডি আমাদের এই তন্ত্রমন্ত্র সম্ভার কক্ষে নিয়ে আসা হয়।
– সফল হোক তোদের কার্য।

সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। অর্ক আজ বাইরে খেলতে যেতে পারেনি। বাসায় বসে বসে ব্ল্যাক ম্যাজিকের বই পড়ছে। এই বইগুলো পড়ার জন্য অবশ্য বাবার থেকে অনেক পিটুনিও খায় ও। তবুও এই বইগুলো পড়া ছাড়ে না। ওর নাকি মজা লাগে পড়তে।
বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে খুব। জানালার কাঁচ ভেদ করে আলোগুলো রুমের ভেতরে নাচানাচি করছে। হঠাৎ বিকট শব্দে একের পর এক বজ্র পড়তে লাগলো। ভয়ে অর্ক জানালার পর্দা টেনে দেয়। বজ্র পড়া যেন থামছেই না।
রাত ৮টা। কলিংবেলের শব্দ শুনে অর্ক’র মা দরজা খুলে দেখে নিতাই বাবু কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরেছে। কাধে ব্যাগ। হাতে নতুন ছাতা। অর্কও কলিংবেলের শব্দে মেইন ডোরে চলে এসেছে। বাবাকে ভেজা অবস্থায় রুমে ঢুকতে দেখে বলল,
– বাবা আজ এত দেরি করলে যে?
– দেরি হবে না কেন? সেই সকাল থেকে বৃষ্টি। তার সাথে সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্জ্রপাত হওয়া, তাই সব মিলিয়ে দেরি হয়ে গেছে।
– আর তাই তুমি ‘জাফর ইকবাল’ স্যারের নতুন সায়েন্স ফিকশান বই ‘রিটিন’ আনোনি। কি? ঠিক বলেছি তো?
– না ভুল বলেছো (নিতাই বাবু একটু হাসলেন)। আমি সব ভুলে যেতে পারি। তাই বলে কি জাফর স্যারের ডাই হার্ড ফ্যানের আবদার ভুলে যাব?
– সত্যি! তুমি এনেছো?
– হুম এনেছি।
– কই… কই… দেখি … দেখি…।
নিতাই বাবু ব্যাগ থেকে একটা প্লাস্টিকের থলে বের করলেন। এর ভেতরে অনেক যত্নে জাফর স্যারের বইটি পলিথিনের সাহায্যে মুড়িয়েছেন যাতে ভিজে না যায়।
– এই যে তোর বই।
অর্ক খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল।
– থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। আই লাভ ইউ।
– লাভ ইউ টু।
নিতাই বাবু এবার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– জানো, বাসায় ফেরার সময় গলির মুখে দেখি অনেক লোকজন। একজনকে জিজ্ঞেস করে শুনলাম আমাদের বিল্ডিংয়ের ছয় তলায় যে এনাম সাহেব থাকেন, উনি নাকি আজ মারা গেছেন।
– কি বল! কিভাবে?
– সারাদিন যেভাবে বজ্রপাত হচ্ছিল, উনি নাকি সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সে বজ্রে মারা যান।
পাশ থেকে অর্ক বলল,
– আঙ্কেল অনেক ভাল ছিলেন বাবা।
নিতাই বাবু নিজের অজান্তেই বললেন, ‘পৃথিবীতে মনে হয় ভাল মানুষেরা কম বাঁচে।’
পরদিন সকাল বেলা। নিতাই বাবু ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছেন আর অর্ককে জোরে জোরে ডাকছেন,
– অর্ক… এই অর্ক…। তাড়াতাড়ি নাস্তা করতে আয়। স্কুলের দেরি হয়ে যাবে।
– আসছি বাবা… (অর্ক নিজের রুম থেকে চিৎকার করে বলে)।
হঠাৎ ফ্লাটের নিচে চিৎকার শুরু হল। এক এক করে জটলা বড় হতে লাগল। নিতাই বাবু বারান্দায় এসে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন এনাম সাহেবের বড় ছেলে চিৎকার করছে। আর ওর চারপাশে লোকজনের ভিড় জমেছে। নিতাই বাবু বললেন-
– রোহান চিৎকার করছ কেন? কি হয়েছে?
– আঙ্কেল, আপনি তো জানেন গতকাল সন্ধ্যায় বাবা মারা গেছেন। আমরা উনাকে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে কবর দিয়েছি রাতেই। আজ সকালে কবরস্থানে গিয়ে দেখি কবর খালি। চারপাশে কবরের মাটিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
অর্ক ডাইনিং টেবিলে এসে দেখে বাবা নেই। বারান্দায় দরজার পর্দা বাতাসে উড়তে লাগলে দেখে যে বাবা নিচে কার সাথে যেন কথা বলছে। ও বারান্দায় গেল। বাবাকে বলল-
– কি হয়েছে বাবা? নিচে এত লোকজন যে?
– তোর এনাম আঙ্কেলের লাশ নাকি চুরি হয়ে গেছে। এই নিয়ে এত চিৎকার। এমনিতে দেরি হয়ে গেছে। তুই খেয়েছিস তো? তাহলে ব্যাগ নে। তোকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আমাকে আবার অফিস যেতে হবে।
– হুম চল। আই এম রেডি।
দুইজনে লিফটে করে নিচে নেমে এল। নিতাই বাবু পার্কিং থেকে কার বের করে সামনে এগিয়ে গেলেন। হঠাৎ অর্ক বলল-
– বাবা গাড়ি থামাও।
নিতাই বাবু ব্রেক কষলেন।
অর্ক কারের দরজা খুলে সাথে সাথে দৌড়ে চলে গেল রোহানের কাছে।
– ভাইয়া, ভাইয়া আমি মনে হয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি আঙ্কেলের লাশ কে বা কারা চুরি করতে পারে।
অর্কের এমন কথায় সকলের চিৎকার, চেঁচামেচি থেমে গেল সব এক নিমিষে। স্তব্ধ সব। রোহান বলল-
– কি বলছ অর্ক? তুমি বুঝতে পেরেছো মানে?
– আমি বইতে পড়েছি বজ্জ্রপাতে কোন মানুষ মারা গেলে সেই লাশ কারা চুরি করে।
– আমিতো কিছু বুঝতে পারছি না। বুঝিয়ে বল।
– ভাইয়া, অনেকে মনে করেন যে বজ্রপাতের সময় বজ্রপড়ে কোন মানুষ মারা গেলে তাদের বডিতে নাকি এক ধরনের প্রাকৃতিক ম্যাগনেট তৈরি হয়। আর তাই অনেকে এসব বডি চুরি করে। কিন্তু বিজ্ঞান বলে এর কোন বিশেষত্ব নেই। তবুও আগের ভুল ধারণার কবলে পড়ে অনেকে এখনো চুরি করে থাকে।
– সেটাতো বুঝলাম। কিন্তু বাবার লাশ কে চুরি করতে পারে?
– বলছি… বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির শরীরের বিশেষ বিশেষ হাড় বা কঙ্কাল প্রেত সাধনার কাজে ব্যবহৃত হয়, এসবে যারা বিশ্বাস করে, তাদের মতে এই ম্যাগনেটের হাড় দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাধনা করলে অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করা যায়। সাধারণ কারণে মৃত মানুষের কঙ্কালের চেয়ে বজ্রপাতে মৃত মানুষের হাড় নাকি এক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকরী। কিন্তু বিজ্ঞান মতে এসব হচ্ছে ভুল ধারণা।
– তার মানে, তোমার কথানুসারে আমাদের এরিয়ার তান্ত্রিক ওঝায় এই কাজ করতে পারে!
– হুম, হতে পারে।
– তোমাকে অনেক ধন্যবাদ অকর্, আমাদের ক্লু দেওয়ার জন্য।

নিতাই বাবুর গাড়ির হর্নের শব্দে অর্ক খেয়াল করল অনেকক্ষণ ধরে বাবা ডাকছে। তাড়াতাড়ি গাড়িতে বসে স্কুলে চলে গেলেও ক্লাশে কিছুতেই মন বসছে না আজ ওর। বারবার মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে থাকে লাশ পাওয়া গেল নাকি।

স্কুল ছুটির সাথে সাথে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে বাসায় চলে এল অর্ক। মাকে বলল-
– মা… মা… এনাম আঙ্কেলের লাশ পাওয়া গেছে?
– হুম পেয়েছে। তোর রোহান ভাইয়া তোর সাথে দেখা করতে আসবে। আমি পাঁচটায় আসতে বলেছি। তুই ফ্রেশ হয়ে আয়।

অর্ক একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওয়াশ রুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে বাবা আর রোহান ভাইয়া সোফায় বসে কথা বলছে। বুঝতে আর বাকি রইল না বাবাও টেনশনে আছে। তাই আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। অর্ককে ডেকে রোহান ওর পাশে বসালো।
– অর্ক আজ তুমি সহযোগিতা না করলে তো আমাদের এলাকায় ভণ্ডতান্ত্রিক ওঝাকে ধরতে পারতাম না। ও শুধু বাবার লাশ চুরি করেনি, এই রকম আরও অনেকের লাশ চুরি করেছে। তোমার তথ্যের জন্য আজ পুলিশ ওদের সব ভুয়া কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে পেরেছে আমাদের এরিয়া থেকে।
অর্ক বাবাকে বলল-
– দেখলে তো বাবা। আমি বিজ্ঞানভিত্তিক বই পড়ে অনেক কিছু জানার কারণে আজ আমাদের এরিয়ার মানুষের কত উপকার হল।
নিতাই বাবু সাথে সাথে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল- ‘তোর মত ছেলে যেন প্রত্যেক ঘরে ঘরে জন্মায়।’