লাগোদি লুগানোয় নৌকা ভ্রমণ

রিজওয়ানুল ইসলাম
01

তিচিনো অঞ্চলে লেক আর পাহাড়ের মিলনে সৃষ্ট সৌন্দর্যের কথা আগের বারেই লিখেছি। লেকগুলোর মধ্যে যে দু’টির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সে দু’টি হচ্ছে লাগো (ইতালীয় ভাষায় লাগোশব্দটি ইংরেজি লেক-এর প্রতিশব্দ) দি লুগানো আর লাগো মাজজিওরে। প্রথমটির পাড়ে লুগানো শহর আর দ্বিতীয়টির পাড়ে লোকার্নো। ম্যাপে দেখলে দেখা যায় যে লাগো লুগানো সুইজারল্যান্ডের তিচিনো অঞ্চলের সর্বদক্ষিণে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে তার শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে রেখেছে। শাখাপ্রশাখার কথা বললাম এই কারণে যে লেকটি সোজা এক দিক থেকে আর এক দিকে বিস্তৃত নয়; ছোট ছোট পাহাড়ের আশপাশ দিয়ে বয়ে যায় তার বিভিন্ন শাখা। আর পাড়ের পাহাড়গুলোও একেকটা একেক রকম ু আকৃতি এবং আয়তন দু’দিক দিয়েই। কোনটিতে রয়েছে বেশ ঘন জনবসতি, আবার কোনটিতে বাড়িঘর কিছুই নেই।
লাগো লুগানোর একটি অংশ সুইজারল্যান্ড ছাড়িয়ে চলে গিয়েছে ইতালির ভেতরে। সুতরাং সাবধান না হলে আপনি নৌকা চালিয়ে চলে যেতে পারেন এক দেশ থেকে আরেক দেশে। তবে কয়েক বছর আগেই সুইজারল্যান্ডও শেংগেন চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর দলে ঢুকে গিয়েছে; সুতরাং এই দু’টি দেশের নাগরিকেরা ভিসা ছাড়াই তাদের সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। আর কোনো বিদেশী শেংগেন ভিসা নিয়ে এলে তার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
বিশ্বের অনেক দেশেই লেক বা নদীকে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে বাজারজাত করা হয়; সুইজারল্যান্ড তার ব্যতিক্রম নয়। তিচিনো অঞ্চলে লেকগুলোর সৌন্দর্য আর তাদের পাড়ের পাহাড়গুলোর বৈচিত্র্য এদের পর্যটন শিল্পকে দিয়েছে বাড়তি শক্তি। লুগানোর লেকটিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা; রয়েছে কয়েকটি রুট। কোনটির সাথে লাঞ্চ আর কোনটির সাথে ডিনারের ব্যবস্থা। আবার চাইলে কোনো খাবার নেই এমন ট্রিপও রয়েছে। একটি আপনাকে নিয়ে যাবে ইতালির কোনো গ্রামে, আর তার নাম দেওয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনালট্যুর। একটির নাম ু যাতে লাঞ্চ বা ডিনার কোনো কিছুরই ব্যবস্থা নেই ম্যাজিক ট্যুর। এটাকেই আমরা আমাদের জন্য উপযুক্ত মনে করলাম কারণ খাওয়াতে আমরা কিছুটা স্বাধীনতা রাখতে চেয়েছিলাম।তবে এই ট্যুর শেষ করবার পরও আমরা বুঝতে পারিনি এতে ম্যাজিক কোথায় ছিল, এবং এর নামকরণের সার্থকতা কী!
সে যাই হোক, সকালবেলা টিকেট অফিস খোলার সময় দেখে আমরা গিয়ে টিকেট কিনে ফেললাম। আমাদের ভ্রমণ শুরুর সময় বেলা দু’টো। সুতরাং অনেকটা সময় পাওয়া গেল অন্য কিছু করবার। আগের দিনই দেখেছিলাম লেকের পাড়ে একটি মিনি ট্রেন শহরের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত যাতায়াত করে। নৌকার টিকেট করার পর সামনেই পেয়ে গেলাম সেই ট্রেন, আর সাথে সাথেই উঠে পড়লাম তাতে। এই ট্রিপে সময় লাগে এক ঘণ্টার মত। আর সেই এক ঘণ্টায় ট্রেন আমাদেরকে নিয়ে গেল লুগানো শহরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর পাশ দিয়ে, যেগুলো প্রায় সবই লেকের পাড়ে। সুতরাং আমরা লেকের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে পাড়ের দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখতে পারলাম। তবে ট্রেনটি দুই প্রান্তেই লেকের পাড় ছেড়ে কিছুটা হলেও ভেতরের দিকে নিয়ে যায়, এবং সমতল রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের কিছুটা ওপরে যায়। আর ওপরে ওঠার সময় কাছ থেকে দেখা যায় পাহাড়ে দালানগুলো কীভাবে নির্মিত হয়েছে।
কেউ অবশ্য বলতে পারেন যে চলন্ত ট্রেন, বাস বা নৌকা থেকে এরকম দেখার বিশেষ অর্থ নেই কারণ এভাবে কোনো দ্রষ্টব্যের গভীরে যাওয়া যায় না। সে কথা মেনেও বলবো, এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে।অল্প সময়ের মধ্যে কোনো জায়গা সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পেতে চাইলে এভাবে দেখাটা বেশ বাস্তবসম্মত বিশেষ করে যদি ব্যক্তিগত যানবাহনের সুবিধা না থাকে। অবশ্য এটা ঠিক যে গণপরিবহন থেকে ইচ্ছেমত ওঠানামা করা যায় না; চাইলেই কোনো একটি দ্রষ্টব্য স্থানে নেমে পড়া যায় না। তবে আমাদের এতটা সময় ছিল না যে আমরা মিউজিয়ামেঅথবা ক্যাসিনোতে যেয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারতাম। আর সময় থাকলেও ক্যাসিনোতে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করবার কোনো ইচ্ছে আমাদের কারোই ছিল না । সে ব্যাপারে আমাদের দুই দম্পতির কারোই কোনো ভালো অভিজ্ঞতা নেই। একবার মোনাকোর ক্যাসিনোতে ভাগ্য পরীক্ষা করে তেমন কোনো সুফল পাইনি বলে তারপর থেকে আর ক্যাসিনোর দিকে পা বাড়াইনি। হাতে সময় থাকলে অবশ্য মিউজিয়ামটা দেখতে পারতাম। কিন্তু আমাদের লেক ভ্রমণের নৌকা দু’টোয় ছাড়বে বলে সময়ের দিকে লক্ষ রাখতে হচ্ছিল।
মিনি ট্রেনের ভ্রমণ শেষ করে নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগেই আমরা চলে গেলাম নৌকার ঘাটে। যথা সময়ে যাত্রীদের তোলা হলো নৌকায়। আমাদের নৌকাটি আসলে ছিল একটি মাঝারি সাইজের লঞ্চের মত ু দোতলা, যার ওপরের তলাতেই বেশির ভাগ বসার জায়গা। নিচের তলার একদিকে ছিল একটি বারের মত জায়গা, যেখানে চা-কফি বা অন্যান্য পানীয় কিনে বসা যায়। পরে অবশ্য দেখলাম যে নিজের আসনে বসেই অর্ডার করা যায় এবং সেখানেই পরিবেশন করা হয়। মিনি ট্রেনের ভ্রমণশেষে আমরা লাঞ্চ করেছিলাম দ্রুত। তখন কফি খাওয়ার সময় হয়নি। সুতরাং লঞ্চ চালু হবার সাথে সাথেই আমরা কফি খেয়ে নিলাম।
সব ট্রিপের মত আমাদের লঞ্চের রুটও পূর্ব নির্ধারিত ছিল; একটি ম্যাপে দেখানো ছিল কোন পথে যাবে এবং কোথায় কোথায় থামবে। তার অন্যতম ছিল মেলিদে, যেখানে খোলা জায়গায় নির্মিত হয়েছে সুইস মিনিয়েচার পার্ক। সেখানে সুইজারল্যান্ডের প্রসিদ্ধ ভবনগুলো দেখানো হয়েছে ছোট আকারে (১:২৫ এই অনুপাতে)। এ ধরনের একটি পার্ক দেখেছিলাম হল্যান্ডের দ্য হেগ শহরের কাছে একটি পার্কে। দেখতে ভালই লেগেছিল। কিন্তু একই ধরনের পার্ক আবার দেখতে তেমন উৎসাহ ছিল না। আর আমাদের মূল লক্ষ ছিল পুরো রুটটা ঘুরে দেখা। সুতরাং আমরা কোথাও না নেমে নৌকায় বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরে অবশ্য দেখলাম যে নামতে হলে আমাদেরকে ছাতা খুলতে হতো, কারণ তখন মেঘ বালিকা আমাদের সাথে মস্করা করবার জন্য বৃষ্টি হয়ে নেমে এসেছিল!
বৃষ্টিতে চরাচর কিছুটা ঝাপসা হয়ে এসেছিল; কিন্তু তাতে দেখার বিশেষ খামতি হয়নি। নৌকা থেকেই দেখা যাচ্ছিল পাড়ের পাহাড়ি গ্রামগুলোর সার্বিক একটা চেহারা। কোথাও বাড়িগুলো উঠে গিয়েছে একেবারে পানি থেকেই। এক ঘাটের কিনারায় একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁ নৌকা থেকে নেমে দুই কদমেই ঢুকে পড়া যায় এমন। কোনো বাড়িতে নিজস্ব নৌকা রয়েছে, এবং তাদেরকে গ্যারাজের মত জায়গায় পার্ক করা অথবা ঝুলিয়ে রাখা। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী মানুষের জীবনযাত্রায় কেমন পার্থক্য ঘটে ু গাড়ির বদলে নৌকার গ্যারাজ!
বৃষ্টিটা প্রথমে ছিল হালকা ইলশে গুঁড়ি ধরনের; কিন্তু একটু পরেই নামল বেশ ঘন হয়ে। বৃষ্টি দেখতে আমি পছন্দ করি, কিন্তু যখন আমি পর্যটক তখন নয় ু বিশেষ করে বাইরের কোনো কিছু দেখতে বের হলে। তাছাড়া ছবি তোলা আমার সখ; এই নৌকা ভ্রমণে লেকের ওপর থেকে পাহাড়ের ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। বৃষ্টি এসে বাগড়া দিল তাতে। ঝকঝকে রোদ অথবা মেঘলা আকাশেও আলো ভালো থাকলে ছবি সুন্দর হয়। কিন্তু প্রকৃতি আমাকে হতাশ করলো এই যাত্রায়, বিশেষ করে আমাদের নৌকা যখন মর্কোতে নামের গ্রামটিতে পৌঁছালো। লুগানো পর্যটনের ওয়েবসাইটে পড়েছিলাম, এই গ্রামটি এত সুন্দর যে কোনো এক প্রতিযোগিতায় সুইজারল্যান্ডের সবচাইতে সুন্দর গ্রাম হিসেবে ভূষিত হয়েছিল। কী তার বৈশিষ্ট্য, আর কেনই তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল তা আর জানা হলো না।