লন্ডনের বার্তা পেলে নির্ধারণ হবে বিএনপির ভবিষ্যৎ?

সুপ্রভাত ডেস্ক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে লন্ডনে থাকা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে বিএনপি। সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা পরামর্শ আসার আগ পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন দলের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা। অন্তত আগামী ছয় মাস তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক নির্দেশনা পর্যবেক্ষণ করার কথা ভাবছেন তারা। খবর বাংলাট্রিবিউনের।
গত কয়েক দিনে বিএনপির স’ায়ী ও কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ১০ জন নেতা ও দলটির পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা হয়। এরমধ্যে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বেশিরভাগ সদস্য মনে করেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার না করা, নির্বাচনের বিষয়ে খালেদা জিয়ার আশাবাদ এবং হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্টদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়গুলো নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে।
এসব ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয়েছে। এ কারণে তার কাছ থেকে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত আসার আগে নীতিনির্ধারকদের কেউই স্ব-উদ্যোগে সিদ্ধান্ত নিতে চান না।
ইতোমধ্যে দলের ভেতর থেকে সংগঠন পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেও তাকে ‘ট্র্যাডিশনাল’ ভাবনা হিসেবে দেখছেন দলটির অভিজ্ঞ নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতা ও দলটির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে কৌশল নির্ধারণ নিয়ে ভুল হলেও তা সংশোধনের মাধ্যমে নতুন করে শুরু করতে হবে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন করতে হবে। স’ায়ী কমিটির ১৬ জানুয়ারির বৈঠকেও বিষয়গুলো উঠে আসে। তবে এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
স’ায়ী কমিটির বৈঠকে কাউন্সিল নিয়ে কথা উঠলেও কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করেন, এখন কাউন্সিলের সময় নয়। গ্রেফতার নেতাকর্মীদের কারাগার থেকে বের করা ও কর্মীদের
পাশে গিয়ে নেতাদের দাঁড়ানোই এখন আসল কাজ। মানুষ নির্বাচনের বিষয়ে অবগত, সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মানুষকে সব সময় সচেতন রাখতে হবে।
বিএনপির স’ায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘বিএনপি সংগঠন হিসেবে তো ঠিকই আছে। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান মিলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে। ভোট দিতে দেয়নি মানুষকে। সেখানে বিএনপির কী দোষ, সংগঠন ঠিক আছে। আওয়ামী লীগ যেভাবে সহিংসতা করে, সেভাবে তো বিএনপি করবে না। সরকারের একতরফা নির্বাচনে বিএনপি জিতেনি। এই নির্বাচন তো নির্বাচন কমিশন করেনি। আমরা এখন বিরোধী দলের রাজনীতি করবো।’
গত ৩১ ডিসেম্বর স’ায়ী কমিটির বৈঠক শেষে একজন সদস্য জোর দিয়েই বলেছিলেন, ‘এখন তারেক রহমানের কাজ হবে দলটি আমাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া। আমরা নিজেরা আলোচনা করে সামনের দিকে এগিয়ে নেবো। তার নির্দেশনা এলে আমাদের কাজ করার সুযোগ কম থাকে।’
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপিতে মূলত তিনটি ভাগ রয়েছে। একটি তৃণমূল, দ্বিতীয়টি সাংগঠনিক নেতৃত্ব- যেটি পুরোপুরি তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণে। তৃতীয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব-যেটিতে স’ায়ী কমিটির সদস্যরা প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এই কমিটির পাঁচটি পদ শূন্য অবস’ায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশে সুশীল সমাজের একটি অংশের কাছে স’ায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের গ্রহণযোগ্যতা থাকায় শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান তাদের ওপরই ভরসা করবেন, এমন প্রত্যাশা অবশ্য একাধিক নেতার।
এদিকে দলের নেতাকর্মীরা একাদশ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পেছনে সাধারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিসি’তি ভিন্ন। বিশেষ করে যেকোনো বিষয়ে তারেক রহমানের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে স’ায়ী কমিটির সদস্যরা আগ বাড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে স’ায়ী কমিটির পাঁচজনের একটি সিন্ডিকেট কাজ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল তারেক রহমানের।
বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এ বিষয়টির কোনো সুরাহা তিনি দিতে পারেননি। আর ঐক্যফ্রন্টের বড় শরিক হিসেবে বিএনপির কোনও সিদ্ধান্ত না পেয়ে ড. কামাল হোসেনও ছিলেন দায়সারা। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি কয়েকবারই কূটনীতিকদের জবাব দিয়েছেন- পার্লামেন্টে ঠিক হবে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন। এছাড়া হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠ দুইজনকে মনোনয়ন দিয়ে নতুন করে সিনিয়র নেতাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেন তারেক রহমান। বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র মনে করে, এসব কারণে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করা সহজ হয়েছে।
বিএনপি হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানায়, জেলে থাকা খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে ইতিবাচক ছিলেন তারেক রহমানসহ তার চারপাশের লোকজন। এই ধারণা যে ভুল ছিল, তা দিনে-দিনে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায়ের কারণে তারেক রহমান উৎসাহী হলেও আদতে তা স্যাবোটাজ হিসেবে কাজ করেছে। এ বিষয়টিও তারেক রহমানের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা হিসেবে দেখছেন একাধিক দায়িত্বশীল।
এছাড়া জামায়াতের প্রার্থীদের ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার বিষয়টিকেও হাইকমান্ডের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে স’ায়ী কমিটির ছয়জন সদস্যের সঙ্গে কথা হলেও তারা উদ্ধৃত হতে অনিচ্ছুক। এসব সদস্য মনে করেন, আগামী কয়েক মাস খুব নিবিড়ভাবে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও আচরণে খেয়াল রাখবেন তারা। এরপরই নিজেদের ভাবনা ও মত তুলে ধরবেন তার কাছে। এর আগে তারেক রহমান কী চাইছেন, তাই মুখ্য তাদের কাছে।
বিএনপির রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ব্যাখ্যা, ‘সংগঠন দায়ী নয়। নির্বাচনের শেষের দিকে এসে অনেক সিদ্ধান্ত এসেছে, সেগুলো অপ্রয়োজনীয় ছিল। প্রতিপক্ষ কোন কোন প্রক্রিয়ায় জিততে চাচ্ছে, সেটা তো দেশি-বিদেশি সবার কাছে পরিষ্কার ছিল। তারা সরকারি লোকদের কাজে লাগাবে, গত ১০ বছরে এমনভাবে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের ছাত্রগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কী করা দরকার, এটা আগেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। জনগণের সামনে পুরো বিষয়টা উপস’াপন করে অগ্রসর হওয়ার দরকার ছিল। এটাই হয়নি।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এই মুহূর্তে দলের কাউন্সিলের প্রশ্ন নয়। বরং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নতুন করে সাজাতে হবে। প্রায় ছয় বছর ধরে ছাত্রদলের কমিটি নেই। যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব একাদশ নির্বাচন নীরবেই কাটিয়ে দিয়েছেন। একদিনও নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেননি তিনি। ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, ছাত্রদলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী এখনো গ্রেফতার হয়ে জেলে রয়েছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন মনে করেন, ‘বিএনপি সাংগঠনিকভাবে খুব শক্তিশালী। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। এ কারণে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান মিলে যখন অন্যায় নির্বাচন করে, তখন নেতাকর্মীদের কী করার থাকে। এখন গণঅভ্যুত্থান হবে, নেতাকর্মীদের প্রস’তি নিতে হবে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে গোছাতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে আমাদের যেতে হবে। কাউন্সিলের কোনো প্রয়োজন নেই, দাবিও নেই।’
সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বিএনপির এই মুহূর্তে করণীয় হবে, নির্বাচনের আগে-পরে দলের যেসব নেতাকর্মী জেল গেছেন তাদের মুক্ত করতে হবে। যারা হামলা, মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সহায়তা করতে হবে। এখন বিএনপির কাজ হচ্ছে আহত, নিহত নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি। এই মুহূর্তে আমাদের মূল লক্ষ্য খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা এবং প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন কাউন্সিল নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। আর দল পুনর্গঠন করতে হলে তো কাউন্সিল করতে হবে। আমরা সব সময় সেভাবেই করে আসছি। আর দলের স’ায়ী কমিটি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা তো দলের চেয়ারপারসনের ওপরে। তিনি তো এখন জেলে আছেন।’
খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘দলের কাউন্সিল নিয়ে এখনো আমাদের কোনও ভাবনা নেই। এগুলো আরো পরের বিষয়। আর এসব নিয়ে এলোমেলোভাবে ভাবলে হবে না। আগে দলের নির্বাহী কমিটির মিটিং ডাকতে হবে। এরপর দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন’া ঠিক করতে হবে। গতানুগতিক রাজনীতি করলে বিএনপির সংকট দূর হবে না। মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীরা মনে করেন, দলের পুনর্গঠন করতে দিয়ে আজ এই অবস’া।’
তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনে বিএনপি যে সংকটের মধ্যে পড়েছে, তা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় এই নিয়ে আমাদের সব চিন্তাভাবনা। সামনে কীভাবে বিএনপি রাজনীতি করবে সেটা ঠিক করতে হবে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়া, অনেকে জেলে আছেন, তাদের মুক্ত করা হচ্ছে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’
খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিএনপির করণীয় হবে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে পুনর্গঠন করা। আর দল পুনর্গঠিত হলে যেকোনও সংকট মোকাবিলা, আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া যাবে। কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া মুক্তি না পেলেও কাউন্সিল করে ফেলা উচিত। আর কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করা গেলে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা সম্ভব।’
নির্বাচনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যে ভোট ডাকাতি হয়েছে, তা মানুষের কাছে তুলে ধরাই এই মুহূর্তে বিএনপির করণীয় বলে মনে করেন রংপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে বিএনপির যে বিপর্যয় হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে আগে। তারপর দল পুনর্গঠন বা কাউন্সিল নিয়ে ভাবতে হবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বড় সমস্যা বেগম জিয়া জেলে। এটাই বড় সমস্যা। এছাড়া, তারেক রহমান আছেন, কিন’ দূরে থাকেন। টেলিফোনে যোগাযোগ কতদূর হয়, মাঝে-মাঝে মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে সমস্যা হয়। বিএনপি নেতাদের বড় কাজ হলো, গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে সমর্থকদের কাছে ফিরে যেতে হবে। তাদের কাছে কাহিনিটা বলতে হবে। হেরে গেলাম কেন, সেটা জানাতে হবে। এই অবস’া থেকে উঠে আসতে হলে কী করণীয়, সেটা তাদের জানাতে হবে। পরিসি’তি মোকাবিলা করার জন্য স’ায়ী কমিটির সদস্যদের শুধু নয়, এটা করতে পারবে লাখ লাখ ভোটার, লাখ লাখ সমর্থক। তাদেরই এসব মোকাবিলায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিএনপিকে একাই দাঁড়াতে হবে। দলটার গঠন কারও ওপর নির্ভর করে হয়নি। নিজেরা সংগঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত সামনে আগানো ঠিক হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি বিএনপিকে দুটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে দ্রুততম সময়ে। একটি হচ্ছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের সংসদে যোগদান এবং উপজেলা নির্বাচনসহ স’ানীয় সরকারের নির্বাচনের বিষয়ে নেতাকর্মীদের জানানো।’
একটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সরকারের নমনীয় আচরণের ওপর নির্ভর করছে বিএনপি সংসদে যাবে কিনা। এছাড়া, স’ানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ইতিবাচক হলেও দলীয় প্রতীকে করা হবে কিনা, এ নিয়ে এখনও ফয়সালা হয়নি।