রোহিঙ্গা সংকট অপ্রত্যাশিত ছিল না

আবদুল মান্নান

মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন চলেছে, সেটি এখন বিশ্ববাসী জেনে গেছে। নূতন উদ্যমে এই রোহিঙ্গা নিধন শুরু হয়েছে গত ২৫ আগস্ট। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে কত নিরীহ মানুষ মারা গেল তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে তবে সেই সংখ্যা হাজার চারের কম নয়, তা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা হতে জানা গেছে। প্রাণ বাঁচাতে, অনেকটা এক কাপড়ে সীমান্ত পার হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপান করছে নূতন করে আসা কম পক্ষে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী।
দেশের ও দেশের বাইরের গণমাধ্যমের ওপর চোখ রাখলে সবগুলোরই প্রধান শিরোনাম রোহিঙ্গা বিষয়ক। এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত রেখেছে তা অতুলনীয়। শরণার্থীদের প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দৃষ্টিতে দেখার জন্য প্রশাসনকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মঙ্গলবার তিনি স্বচক্ষে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখার জন্য কক্সবাজার-উখিয়া- টেকনাফ ছুটে গেছেন । সাথে গেছেন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা ।
১৯৯২ সালে যখন তিনি সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন তখনো তিনি সেই সময় মিয়ানমার হতে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেখতে ছুটে গেছেন । মঙ্গলবার তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবিরে তাদের অবস্থা দেখে আবেগতাড়িত হয়েছেন । রোহিঙ্গাদের ওপর এই বিপর্যয় যে অনেকটা অনিবার্য ছিল কিন্তু অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে সেটি কখন ঘটবে সেটি অনুধাবন করা হয়তো সহজ ছিল না। একটু ফিরে যেতে চাই ২০১৩ সালের মে মাসে।
মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে (রেঙ্গুন) গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দিতে বাংলাদেশের দু’জন সাংবাদিকসহ এক সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে ইয়াঙ্গুন উপস্থিত হয়েছিলাম। কনফারেন্সটির আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যেটি আবার সে দেশের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীনে কাজ করে। কনফারেন্সে আমার অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য ছিল সেই সংস্থার বৃত্তি নিয়ে এক সময় আমি সেই দেশে উচ্চশিক্ষা নিয়েছি এবং তাদের কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে আমার পুরোনো দিনের অনেক বন্ধুদের দেখা মেলে। তবে সবচেয়ে আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আমার পিতার যৌবনকালের কর্মক্ষেত্র সফর করা। আমার বাবা দীর্ঘসময় জীবিকার কারণে রেঙ্গুন কাটিয়েছেন। ১৯৪৩ সালে জাপান ব্রিটিশদের হাত হতে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) দখল করে নেয়। তখন দক্ষিণ এশিয়ায় বার্মা অর্থনৈতিকভাবে বেশ সম্পদশালী দেশ। তবে অন্য আর দশটি উপনিবেশের মতো সেই দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ ব্রিটিশদের দখলে। ভারতবর্ষের মানুষ ভাগ্য ফেরাতে তখন বার্মা মুখি। বার্মা তখন তাদের জন্য বর্তমানে দুবাই বা সৌদি আরব। আমার পিতাও তাঁর যৌবনকালে ইয়াঙ্গুন গিয়েছিলেন ভাগ্য ফেরাতে। ভাগ্য ফিরেছিল। কিন্তু জাপানিরা বার্মা দখল করে নিলে সবকিছু উলট-পালট হয়ে যায়। জাপানি সৈন্য আর বার্মার স্থানীয় অধিবাসীরা মিলে শুরু করে এক ভয়াবহ দাঙ্গা আর লুটপাট। তাদের শিকার ভারতীয়রা। অনেকটা এক কাপড়ে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় একমাস খালি পায়ে হেঁটে হাজার হাজার ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ বর্তমান রোহিঙ্গাদের মতো টেকনাফ হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে। আমার পিতাও তাদের একজন। নিয়মিতভাবে তাদের বার্মার মগ ডাকাতদের হাতে পড়তে হয়েছে। ২০১৩ সালে আমার ইয়াঙ্গুন যাওয়া অনেকটা পিতার ফেলে আসা শহরের মাটি স্পর্শ করতে যাওয়ার মতো। সঙ্গের দু’জনের একজন একটি বাংলা দৈনিকের সম্পাদক। অন্যজন একটি বহুলপ্রচারিত বাংলা দৈনিকের সহযোগী সম্পাদক। অং সান সুচি তার কাছে আবার দেবীতুল্য। তার সম্পাদক তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন সম্ভব হলে সুচির একটি সাক্ষাৎকার নিতে। বন্দি অং সান সুচি আমার কাছে যতটুকু শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন মুক্ত তাঁকে তেমনটি মনে হয়নি। তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে সবসময় মনে হয়েছে তিনি একজন ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক নেত্রী। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যে কোন ধরনের আপোষ করতে প্রস্তুত। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেই দেশের প্রকৃত মালিক এবং বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ। মুক্ত সুচি এবং মিয়ানমার সরকারের বর্তমান প্রধান কার্যত সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল বৈ অন্য কিছু নন।
ইয়াঙ্গুন পৌঁছানোর পরদিন কনফারেন্স আয়োজকদের মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন অং সান সুচি। তিনি মিয়ানমারের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বক্তব্য রাখবেন। আমাদের উৎসাহের ঘাটতি নেই। আগেভাগেই গিয়ে তাঁর বক্তৃতা মঞ্চের কুড়ি গজের মধ্যেই তিনজন বেশ যুতসই অবস্থান নিয়ে বসে পড়লাম। তিনি এলেন। সকলে তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য বেশ উদ্‌্‌গ্রীব। অনুষ্ঠানস্থলের ভিতরে ও বাইরে আইন শৃঙখলা বাহিনীর বেশ কড়া পাহারা আর অং সান সুচির ওপর নজরদারি। সকলের প্রত্যাশিত বক্তৃতা শুরু করলেনও সুচি। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ধারেকাছেও গেলেন না। প্রায় এক ঘণ্টার বক্তৃতায় তিনি গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্যাািনটেশনের জন্য কী করছেন তার একটি ফিরিস্তি দিলেন। তিনি তখন একটি এনজিও’র সঙ্গে জড়িত।
প্রশ্ন-উত্তরের পালা। যারা প্রশ্ন করছেন তারা প্রায় সকলেই মার্কিনি। অজ্ঞতার জন্য মার্কিনিদের বিশ্বব্যাপী একটি খ্যাতি আছে। তাদের বক্তব্যে তা আবারও প্রতিফলিত হলো। কেউ গণমাধ্যম বা তার স্বাধীনতার ধারে কাছেও গেল না। আমরা তিন বাঙালি কয়েকবার চেষ্টা করলাম সুচির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর কাছে রোহিঙ্গা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে। তিনি আমাদের দিকে তাকাচ্ছেনই না। শেষমেশ সম্পাদক সঙ্গী দাঁড়িয়ে বেশ উঁচু গলায় বললেন, ণড়ঁৎ ঊীপবষষবহপু ও ধস ভৎড়স ুড়ঁৎ হবরমযনড়ঁৎরহম পড়ঁহঃৎু ইধহমষধফবংয. ঈধহ ও ধংশ ধ য়ঁবংঃরড়হ ড়হ জড়যরহমুধ? সুচি তার দিকে না তাকিয়ে এক মার্কিন বৃদ্ধার দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন তিনি তার কাছ হতে শেষ প্রশ্নটি নেবেন। কিছুক্ষণের মধ্যে স্যুপ পরিবেশন শুরু হলো। রোহিঙ্গাদের প্রতি সুচি মনোভাব বোঝা গেল।
২০১৬ সালের অক্টোবর ১৯ তারিখ। ব্রিটিশ ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ্‌্‌ অফিসের আমন্ত্রণে লন্ডনে জঙ্গিবাদ, সহিংসতা ও ধর্মীয় সহনশীলতা বিষয়ে আর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে লন্ডন গিয়েছি। প্রায় কুড়িটি দেশের শ’তিনেক অংশগ্রহণকারীর সামনে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আমার কথা বলার সুযোগ হলো। আমার আগে বক্তব্য রাখলেন বার্মিজ মুসলিম এসোশিয়েশনের একজন নেতা, কোয়া উইন। তিনি ধর্ম বিশ্বাসে মুসলমান কিন্তু বার্মায় সকলকে একটি বৌদ্ধ নাম রাখতে হয়। সেটিই তার দাপ্তরিক নাম। সকল দলিলপত্রে তাই লেখা থাকে। অনেক বছর ধরে তিনি লন্ডনে থাকেন। তবে তার বক্তব্য শুনে মনে হলো আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তার কাছে তেমন হালফিল কোন তথ্য নেই। আমার বক্তব্যে আমি রোহিঙ্গাদের ওপর নিয়মিত বিরতি দিয়ে সেই দেশের সেনাবাহিনী কীভাবে অত্যাচার চালায় এবং উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য করে তার একটি চিত্র তুলে ধরলাম। জাতিসংঘের সমালোচনা করে বলি, গুরুত্বপূর্ণ এই বিশ্ব সংস্থাটি শুধু একটি কথা বলার ক্লাবে পরিণত হয়েছে তাই নয়, এটি বর্তমানে বিশ্বমোড়লদেরও একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান ছাড়া বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংকটে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারে না । রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিষয়ে তারা কখনও কার্যকরভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর কোন ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। যখন রোহিঙ্গা নিধনপর্ব নূতন করে শুরু হয় তখন তারা বাংলাদেশকে তাদের সীমান্ত খুলে দিতে বলে কিন্তু এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তেমন কোন ভূমিকা রাখে না। বলি, বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল এবং উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গার ভার দীর্ঘ সময় বহন করা সম্ভব নয়।
এমন চলতে থাকলে এই অঞ্চলে নানাধরনের সামাজিক সমস্যা সৃষ্টিতো হবেই এবং তা বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের জন্য এক সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবেও দেখা দেবে। দর্শক-শ্রোতাদের মনে করিয়ে দেই, মিয়ানমারে বর্তমানে আটটি সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দল আছে, তার সঙ্গে ইসলামের নাম দিয়ে অন্য দু’একটি দল যোগ হলে তা কোন দেশের জন্যই ভাল হবে না। স্মরণ করিয়ে দেই সেখানে ইসলাম আর মুসলিম নাম দিয়ে দু’একটি জঙ্গিগোষ্ঠী থাকলেও তারা তেমন সংগঠিত নয় কিন্তু অন্য দেশের সহায়তা ও অর্থায়নে সংগঠিত হলে তা সকলের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। আরও বলি, বর্তমান পরিস্থিতি যে কোন সময় গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। যদি সকল সংশ্লিষ্ট মহল সরব না হয় এবং কার্যকর ভূমিকা না রাখে তবে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্তমান চলমান ভয়াবহ সহিংসতা অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। তার জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা নাও করতে হতে পারে। অং সান সুচির ওপর নির্ভর করা নিরর্থক। নোবেল শান্তি পুরস্কার যে সব সময় উপযুক্ত মানুষের হাতে যায় তা কিন্তু নয়। হিটলারও শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধি দু’বার মনোনীত হলেও নোবেল কমিটি তাঁকে যোগ্য মনে করেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ’মাসে জাতিসংঘে বক্তব্য রাখবেন । দেশের মানুষের প্রত্যাশা তিনি তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গা ইস্যুকে সঠিক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরবেন । বিশ্বকে জানাবেন মায়ানমার রাজ্যে যা হচ্ছে তা গণহত্যা ছাড়া অন্য কিছু নয় । প্রশ্ন রাখতে পারেন এই গণহত্যার জন্য যারা দায়ী তাদেরকে যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করা যেতে পারে । পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য জাতসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনও করা যেতে পারে । বিশ্ববিবেক জাগ্রত হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক