সমসাময়িক

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত ও অনিশ্চিত করে তুলছে মিয়ানমার

সুভাষ দে

দু মাস আগে মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশের কিন্তু এখনো এই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। সর্বশেষ খবরে জানা গেল, প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ যে ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে, সেই তালিকা থেকে তারা মাত্র ৩৭৪ জনের পরিচয় সত্যায়িত করেছে। গত বুধবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থু নেপিডোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ৩৭৪ জন রোহিঙ্গার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানান। প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে, রোহিঙ্গারা তাদের সুবিধাজনক সময় অনুযায়ী ফিরতে পারবে। ঐ সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমার পুলিশের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উইন তুন বাংলাদেশ যে কাগজপত্র দিয়েছে তা চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও অভিযোগ করেন। বাংলাদেশের দেওয়া তালিকায় তিনজন সন্ত্রাসীর নামও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব আরো জানান, তালিকাভুক্তরা আগে মিয়ানমারে বসবাস করত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কেননা কিছু আবেদনপত্রে আঙ্গুলের ছাপ ও প্রত্যেকের আলাদা করে ছবি নেই।
উল্লেখ্য, গত ২৬ নভেম্বর নেপিডোতে দু দেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হওয়ার পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাবাসনের প্রথম তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন রাখেন, শরণার্থীদের কাগজপত্র ভুল ফরম্যাটে দেয়া হলে তারা কিভাবে ঐ ৩শ’রও বেশি মানুষকে যাচাই করতে পারল?
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের এ ধরনের বক্তব্যে এখন এটা পরিষ্কার হতে চলেছে যে, মিয়ানমার বিষয়টি বিলম্বিত এবং সামগ্রিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়টি তারা ঝুলিয়ে রেখে সেটি অনিশ্চিত করে তুলতে চায়।
বাংলাদেশ চুক্তির আগে থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার দফতর ও মানবাধিকার কমিশনকে যুক্ত করার কথা বলে আসছে কিন্তু মিয়ানমার তাতে রাজি হয়নি, যদিও এখন তারা তাদের যুক্ত করবে বলেছে তবে জাতিসংঘের তথ্য বাছাই দলের সদস্য কিংবা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের রাখাইনে যেতে তারা দিচ্ছে না। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঘৃণ্য-অমানবিক কাজে লিপ্ত মিয়ানমার সেনা কর্তৃপক্ষ-একথা জাতিসংঘ বার বার বলে আসছে, জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং লি একে গণহত্যা বলেছেন এবং এজন্য মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী যারা নির্মূল অভিযান চালিয়েছে, তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত করা হতে পারে এমন কথাও বলেছেন। বিশ্বব্যাপী সুচির নীরবতার নিন্দা জানানো হয়েছে ব্যাপক, তাঁকে দেওয়া বিভিন্ন সম্মাননা ফিরিয়ে নিচ্ছে নানা সংগঠন-সংস্থা। এরপরও মিয়ানমারের সামরিক-বেসামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের মানবতাবিরোধী উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নে নানা ছল-চাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে, এটা সম্ভব হচ্ছে দেশটির প্রতি চীন-রাশিয়া, ভারত-জাপানের মতো দেশগুলির অব্যাহত সমর্থন। এমন কি দু একটি দেশ ছাড়া ‘আসিয়ান’ গ্রুপের সদস্যরাও মিয়ানমার সরকারের ওপর কোনপ্রকার চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না। মুসলিম দেশগুলিও এ ব্যাপারে ‘দেখি কি হয়’ এই নীতি গ্রহণ করেছে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিছুটা সরব থাকলেও ৫০ টিরও অধিক দেশ নিয়ে গঠিত ওআইসি কোন কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারত-নেপাল-ভুটান, শ্রীলঙ্কাও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। বৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান চীনের প্রভাবে একেবারে নিশ্চুপ, মিয়ানমার চীন-পাকিস্তান-উত্তর কোরিয়া থেকে অস্ত্র পেয়ে আসছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেও তাতে কোন কাজ হচ্ছে না। তাদের সীমিত অবরোধ প্রয়াস মিয়ানমারকে কাবু করতে পারবে না যতক্ষণ জাতিসংঘ এ ব্যাপারে কঠিন কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পারছে। নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া, চীন দফায় দফায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনরূপ পদক্ষেপ নেয়ার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখতে পারছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ কর্তৃক সম্প্রতি ২ দিনব্যাপী ‘রোহিঙ্গা সংকট’ বিষয়ক এক আলোচনায় আলোচকরা চীন-রাশিয়াকে বাংলাদেশের পক্ষে টানতে সরকারের লাগসই কূটনীতি অভিযান এর পরামর্শ দিয়েছে। আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুর সফরের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর চীন ও ভারত সফর করা উচিত। সম্প্রতি ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিয়েতনামী প্রেসিডেন্টকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরব হতে বলেছেন। সামনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময় রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সমর্থন আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে বলে আলোচকরা মনে করেন।
রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারের আদি অধিবাসী হিসেবে রোহিঙ্গাদের অবস্থান, তাদের জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধান-এসব নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-কর্মশালা অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। সরকারি প্রচেষ্টার সাথে বেসরকারি নানা সংগঠন, রাজনৈতিক দল, পার্লামেন্ট গ্রুপ, নাগরিক সমাজ ও বিদেশে বাঙালি সমাজ উদ্যোগ নিতে পারে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার, বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ‘আগ্রাসী কূটনীতির’ কথাও বলেছেন, এটির ব্যাখ্যা যদিও তারা দেননি।
আমাদের কিছু রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজের এক অংশ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এদের মধ্যে অনেকে নানা ধরনের মন্তব্যও করেন টকশোতে কিংবা কলামে যেটিকে ‘উস্কানি’ বললে অসংগত হবে না। যেখানে চীন-রাশিয়া-ভারতের মতো বৃহৎ শক্তি প্রত্যক্ষভাবে মিয়ানমারকে সমর্থন করছে এবং পাশ্চাত্য শক্তিসমূহ একধরনের নির্মোহ অবস্থান নিয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে ঐ সকল দেশের গণতান্ত্রিক ও মানবতার পক্ষের শক্তিসমূহকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং তাদের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যে সকল দেশ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের কথা বলে, উদার-সহিষ্ণু মানবতার কথা বলে, সে সকল দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিশ্চুপ, নির্মোহ রয়েছে-তাদের উচিত কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থ বা বৈষয়িক লাভালাভ নয় বরং মানবতা ও সার্বজনীন মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। সম্প্রতি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ৩ নারী ইরানের শিরিন এবাদি, ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কারমান এবং যুক্তরাজ্যের ম্যারিড ম্যাগুয়ের বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি যেভাবে সহমর্মিতা জানালেন, মিয়ানমার নেত্রী সুচিকে অভিযুক্ত করলেন এবং সর্বোপরি বিশ্ব সম্প্রদায়কে মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে আহ্বান জানালেন, সে ধরনের প্রচার-প্রচারণা বৃহৎশক্তিগুলোর রাষ্ট্রনায়কদের চৈতন্যে আঘাত করতে পারে। বাংলাদেশে গত আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নিপীড়ন-নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগের হিসেব ধরলে এই সংখ্যা ১০ লাখের বেশি হবে। শরণার্থীদের আগামী দিনগুলির ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যয় পেতে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা শংকাও প্রকাশ করেছেন।
এখন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশে নিরাপদে ও মর্যাদা নিয়ে বসবাসের অধিকারসহ তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনই প্রধান কাজ, বাংলাদেশ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য শরণার্থীদের বিপুল দায়ভার বহনে সক্ষম নয়-এটি জাতিসংঘ এবং বিশ্বসম্প্রদায়কে উপলব্ধি করেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে কোনরূপ ছলচাতুরি করে তারা যেন এই সংকট দীর্ঘায়িত করতে না পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে যাতে সমস্যাটি প্রলম্বিত হওয়ার কারণে কোনরূপ অশান্ত কিংবা সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে না পারে, তা জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে দেখতে হবে। কিছুদিন আগে মিয়ানমার যেভাবে সীমান্তে সেনা সমাবেশ বাড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালিয়েছিল, সে ধরনের তৎপরতা তাদের বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ বারবারই আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং স্বদেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সংকট সমাধানের পথ, মিয়ানমারকে তা অনুধাবন করতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যে সুপারিশমালা দিয়েছে তার অনুসরণই মিয়ানমার সরকারের কর্তব্য। জাতিসংঘ এবং বিশ্বসম্প্রদায় দেখতে চায় মিয়ানমার তার দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে আর কোন জটিলতা আর সংকট না বাড়িয়েই।
মিয়ানমার ৩৭৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই বাছাই করার পর বলেছে, এরা যে কোন সময় ফিরে যেতে পারে, কিন্তু যে প্রশ্নটি তীক্ষ্ণভাবে এসেছে তা হলো, রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আদৌ কি সম্ভব, যেখানে এখনো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী স্বদেশের মায়া ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে এবং রাখাইনে অবশিষ্ট রোহিঙ্গা সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী, উগ্র জাতীয়তাবাদী ক্যাডারদের নির্যাতনে একপ্রকার অসহায় হয়ে ভাগ্যের ওপর সমর্পণ করছেন নিজেদের! কয়েক শতক ধরে বসবাস করা একটি জাতিগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে নির্মূল করছে মিয়ানমারের ফ্যাসিবাদি সরকার, জাতিসংঘ ও বিশ্বসম্প্রদায় কি কেবল এই ‘গণহত্যা যজ্ঞ’ নির্মোহ অবলোকন করবে?
লেখক : সাংবাদিক