রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সু চির প্রতিশ্রুতি : কথা নয়, কাজে প্রমাণ দিন

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার-এমন প্রতিশ্রুতির কথা তিনি আসিয়ান প্লেনারি সেশনে বলেছেন। ম্যানিলায় অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশন্স (আসিয়ান) সম্মেলনে সভাপতিত্ব করা ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়ার্তের মুখপাত্র হ্যারিক জানান, সম্মেলন মিয়ানমারের কাছে বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করলে মিয়ানমার নেত্রী তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানান। তবে আসিয়ান সম্মেলনের খসড়া বিবৃতিতে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটি আসেনি।
এদিকে রাখাইন রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মং মং সোয়েকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গত আগস্ট মাসে সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাস্তচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেনা অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের বিবরণ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। জাতিসংঘ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এ ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে আসা বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র জাতীয়তাবাদের নৃশংস অত্যাচার নির্যাতনের বিষয় অবহিত হয়েছেন। তারা এই মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। বিশ্বের নানা দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ ও সাহায্য আসতে শুরু করেছে। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। আসিয়ান সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সু চি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি স্বীকার করার নামান্তর, বিশ্বব্যাপী এই ইস্যুতে যে নিন্দা ও ঝড় উঠেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে সু চি এবং মিয়ানমার সরকারকে বিশ্ব জনমত ও মানবতার দাবি উপেক্ষা করা সহজ হচ্ছে না।
সু চি তার প্রতিশ্রুতি রাখতে কি পদক্ষেপ নেন, বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসী তা দেখতে চায়। চলতি মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে যাবেন, এর আগে মিয়ানমারের বিশেষ দূতের ঢাকা সফর এবং আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরে দুদেশের মধ্যকার ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন দ্রুত হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের ব্যাপারে অগ্রগতি হতে পারে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুটির দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তবে একথাও ঠিক যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ অব্যাহত না রাখলে মিয়ানমার কালক্ষেপণ এবং নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেবে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তমূলক বিবৃতি মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাধ্য করতে পারে। চীন এবং রাশিয়া এই মানবিক সংকটে বিশ্ব জনমত বিবেচনায় আনবে বলে আমরা আশা করি।