মিয়ানমারে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্ব দিন

যে সকল দেশে দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে, অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখল কিংবা নানা রাজনৈতিক উত্থান পতনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে সে সব দেশে গণতন্ত্রের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হয়না বরং দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক শাসনে কায়েমী স্বার্থ বা মুষ্টিমেয় মানুষের গোষ্ঠীস্বার্থ নিরাপদ রাখতে শাসক শ্রেণী গণতন্ত্রের পথে নানা প্রশাসনিক-সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, এমনই এক উদাহরণ হলো মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন। দীর্ঘ ৫ দশক দেশটি সামরিক শাসনে থাকায় দেশটিতে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বিপন্ন হয়েছে, বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর সামাজিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা বিপর্যয়কর হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে, বিগত সাধারণ নির্বাচনে মিয়ানমারের জনপ্রিয় নেত্রী, নোবেল শান্তি পদকপ্রাপ্ত অং সান সুচির রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি’ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। এতদসত্ত্বেও মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট কাটেনি, দেশটির পার্লামেন্টে এক চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত। সুচির দলকে তাদের সাথে সমঝোতা করেই শাসন চালাতে হবে।
দেশটির সংবিধান সংশোধনে সুচি এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি তার প্রমাণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সুচির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারা। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের শাসনতন্ত্রে বাধ্যবাধকতা আছে যে, কোন নাগরিকের স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান বিদেশি নাগরিক হলে ওই নাগরিক প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না, মূলত সুচিকে কেন্দ্র করেই আগে সামরিক কর্তৃপক্ষ শাসনতন্ত্রে ঐ ধারা সংযোজন করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সুচির অনুগত সহকর্মী এবং বন্ধু থিন কিয়াও পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
মিয়ানমারের জনগণ দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, কষ্টলব্ধ গণতন্ত্র যা নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে সেটির সুরক্ষা এবং বিকাশে মিয়ানমারের জনগণ, রাজনৈতিক দলকে ধৈর্য ধরেই অগ্রসর হতে হবে।
সুচি এবং তার দলের কাজ হবে মিয়ানমারের সকল দল, মত ও নৃ-গোষ্ঠীর জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আর্থ-সামাজিক বিকাশে অগ্রসর হওয়া। সামরিক শাসনে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার নিপীড়নও কম হয়নি। লক্ষ লক্ষ লোক প্রতিবেশি দেশগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে এ প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর এক বড়ো অংশ অত্যাচার নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন সময়। কিছু ফেরত গেলেও আগে থেকে অনুপ্রবেশকারী এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েক লাখ হবে। আমরা আশা করি মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে রোহিঙ্গাসহ সকল নৃ-ও সামাজিক গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং তারা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করবে।
মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে দীর্ঘদিনের। মাঝেমধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চললেও আমরা আশা করবো দু দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে সম্পর্কের উন্নতি হবে। মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের অবসান হয়েছে, তবে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা চোরাচালান একটি বড়ো সমস্যা, আমরা চাই মাদকের উৎপাদন বন্ধে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দ্রুত প্রত্যাবাসনেও মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার গুরুত্ব দেবে বলে?আমরা আশাকরি। বলে আমাদের প্রত্যাশা বাণিজ্য। যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন, পর্যটন দু দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা মিয়ানমারের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট থিন কিয়া ও অং সান সু চির গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় সাফল্য কামনা করি।

আপনার মন্তব্য লিখুন