রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায়োগিক থিয়েটার সামাজিক পরিবর্তনে প্রভাব

মো. মাহমুদল হক জিহাদ

মিয়ানমারের সীমান্ত পেরিয়ে অসংখ্য মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য গত ২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে গণ জোয়ারের মত বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশু, বৃদ্ধা, যুবক/যুবতী, বুড়ো/বুড়ি সবাই পৈতৃক ভিটেমাটি ছাড়ছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যা, ধর্ষণ, আগুন, নির্যাতন, গুলি ও পাশবিক অত্যাচারকে বিশ্বমানবতার সংগঠনগুলো মিয়ানমার সরকারের জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া বলে অভিহিত করছেন। বর্তমানে বারটি অস’ায়ী শরণার্থী ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাদের সামাজিক সমস্যার যেমন অন্ত নেই তেমনি উগ্রবাদী সংগঠনে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, শিশুশ্রম, যৌতুক প্রথা, মাদকাসক্তি, জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য, পরিবেশ বিপর্যয়, স্বাস’্য, প্রাকৃতিক ঝুঁকি, ধর্মীয় মতাদর্শিক সহিংসতা ইত্যাদি ইস্যুভিত্তিক প্রায়োগিক নাটকের কার্যক্রম তাদের সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।
গুণীজন বলেন, বাড়ি ও নাড়ির সম্পর্ক কখনো ছেদ করো না। আমরা যেখানে জন্মগ্রহণ করি এবং যে সমাজে বেড়ে উঠি সে পথের ঠিকানা কখনও ভুলা যায় না। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস’্য, বাসস’ান কিংবা আনন্দ বিনোদন মানুষের মৌলিক অধিকার। জীবন চলার পথে বিশ্বের প্রতিটি জাতি বর্ণের জন্য এটি প্রধান ও অপরিহার্য। কিন’ এই মৌলিক অধিকার ছেড়ে তারা আজ নতুন দেশের শরণার্থী। ভারতের সাবেক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম বলেছেন,‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে; স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক জাতিগত নিধনে নির্যাতিত ও ২৫ আগস্ট ২০১৮ থেকে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসতে থাকা বিতাড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায় শরণার্থী ক্যাম্পে রোজ দুঃস্বপ্ন দেখে। দেখে আসা নারকীয় বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ভয়াবহ মাত্রা আর সুন্দর জীবন গঠনের আতংকে এগারো লক্ষ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। ক্যাম্পে তাদের মানসিক, আত্মিক ও সামাজিক পরিবর্তনে প্রায়োগিক থিয়েটারের বিভিন্ন আঙ্গিকের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায়োগিক থিয়েটার এর পদ্ধতির মাধ্যমেই নির্যাতিত, অবহেলিত মানুষকে সচেতন ও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিভিন্ন থিয়েটার টেকনিক প্রয়োগ করা হয় সমস্যাগুলো বিবেচনা করে। কারণ, প্রায়োগিক থিয়েটারই ইস্যুভিত্তিক সমস্যা সমাধানে সামাজিক পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনার স্মৃতিগুলোকে স্বপ্নে দেখে রোজ ঘুম ভাঙছে। ক্যাম্পের প্রতিটা মানুষেরই মিয়ানমারের আর্মি নির্যাতন ও জীবন সম্পর্কে আলাদা আলাদা সংজ্ঞা, লোমহর্ষক গল্প, নির্বিচারে গুলি, ধর্ষণ, গলা কেটে কেটে গণহত্যা, নির্যাতন আর মানবতার চরম অবক্ষয় দেখার ভয়ানক অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশ বা জন্মস’ান ভিটে বাড়ি ছেড়ে নতুন ঘনবসতি সমাজের বাসিন্দা। যাদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি কাজ করছে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন সংগঠন। একটাই লক্ষ্য তাদের সামাজিক, মানসিক ও আত্মিক উন্নয়ন করা।
অ্যাপ্লাইড থিয়েটার বা প্রায়োগিক নাট্যকলা বলতে যে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়, তা হলো বিশ শতকের ষাটের দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে সমাজ পরিবর্তনে নাট্য উপস’াপনায় নতুন নতুন আঙ্গিকের নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার সাথে নাটক পরিবেশনার রীতিও পরিবর্তিত হতে থাকে।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের শিক্ষা ও নাগরিকত্ব অধিকার নেই। শুধুমাত্র শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত না হওয়ার কারণে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। এজন্য তাদের মানবিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া জরুরি। তাই দরকার সঠিক শিক্ষা। আর এ নির্যাতিতদের শিক্ষা ও সচেতনায়ন বৃদ্ধি করার জন্য প্রায়োগিক থিয়েটারের বিভিন্ন আঙ্গিক জরুরি। পৃথিবীতে জাতিভেদে ভিন্ন ভাষা, শিক্ষা, নাটকের আঙ্গিক, সংস্কৃতি ও নানান সমস্যা নিয়ে প্রায়োগিক নাটক উপস’াপন করা হয়। প্রত্যেক নাটক এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিন’ একই। তা হল নির্যাতিতদের ভিতরকার মানবচিন্তা চেতনাকে জাগ্রত করা। এর ফলে সে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব জেগে উঠে। জাতিগত নিধন ও মানবতার চরম অবক্ষয়ের সাক্ষী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নাটকের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে নিপীড়ন ব্যবস’া থেকে উত্তরণের জন্য পাওলো ফ্রেইরের শিক্ষা দর্শন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে, এদের অর্ধেকের বেশি শিশু। ড্রামা থেরাপি প্রোগ্রামে শিল্পকলা একাডেমির প্রধান লক্ষ্য ছিলো রোহিঙ্গা শিশুদের বিনোদন দেওয়া। প্রথম দিকে দেশি, বিদেশি ও স’ানীয় মানুষ মূলত খাদ্য এবং বাসস’ান সম্পর্কিত সহযোগিতা করেছিল। তখনই সামাজিক পরিবর্তন ও শিশুদের মানসিক বিকাশে শিল্পকলা একাডেমি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের নিয়ে ড্রামা থেরাপি কার্যক্রম পরিচালনা করে। নির্যাতনের শিকার শিশুদের আনন্দদানের মাধ্যমে ট্রমাটাইজড অবস’া থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে মূলত এই কার্যক্রম। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকার কর্তৃক যে বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছিলো রোহিঙ্গা শিশুরা প্রায় সবাই সেই নির্যাতনের শিকার।
ড্রামা থেরাপি নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও কাজের ধারাবাহিকতায় মিউজিক থেরাপিও যুক্ত হয়। এই প্রোগ্রামে শিশুদের ভিতরকার প্রতিভা বের করে আনা মূল লক্ষ্য ছিলো। তারা রোহিঙ্গা, বার্মিজ ও ইংরেজি ভাষায় গান, কবিতা ইত্যাদি পরিবেশন করে। এরমধ্যে কয়েকজন এমন কিছু গান গেয়েছে যাতে তাদের উপর নির্যাতনের কিছু চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। নির্যাতনের কারণে বেশিরভাগ শিশু বলতে পারছে না তার গ্রাম ও এলাকার নাম।
উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয় শিবিরগুলো নান্দনিক ড্রামা থেরাপি প্রদান করা হয়। কিছুক্ষণের জন্য এ আয়োজন শিশুদের দুঃস্বহ স্মৃতি, কষ্ট, দুঃখকে ভুলিয়ে দিচ্ছে মুহূর্তে। মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতনের কারণে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। এজন্য আয়োজন হয়েছে এক্রোবেটিক শো ও পিপলস থিয়েটারের পরিবেশনা। ১০-১২ মিনিটের অভিনয়ের মাধ্যমে শতশত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে। এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষক ও কমিউনিটির সাথে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায়োগিক থিয়েটার ও সামাজিক পরিবর্তনে প্রভাব কেন প্রায়োগিক ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম তার বাস্তবিক বিষয়টি তুলে ধরা ও যুক্তিকতা নিরূপন করাই প্রধান উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক ও বিশেষ বুলেটিন সংবাদপত্র ছাড়াও বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং ক্যাবল চ্যানেলের খবরের ভিত্তিতে জানা যায়, ‘জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন রোহিঙ্গাদের উপর এ ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতা, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপ্রধান, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর নিষ্ঠুর, মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীও সম্প্রতি শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন।
‘মার্কিন মানবাধিকার সংস’া ‘হলোকাস্ট মিউজিয়াম’ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার সংস’া ‘ফোরটিফাই গ্রুপ’ এক যৌথ অনুসন্ধানের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার ‘জোরালো প্রমাণ’ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস’া হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার যৌন নিপীড়নের আলামত হাজির করেছে। এসব অমানবিক অত্যাচার-অনাচারের শিকার হয়ে যারা বেঁচে আছে, তারা মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের শিকার বলে জানান মনোবিশ্লেষকরা।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনের শ্লোগানে যুক্ত হয়েছে নারকীয় বীভৎসতা। যে সমস্ত শিশুরা মা, বাবা, দাদা, দাদী, আত্মীয়, ভাই-বোন কিংবা গুলি খাওয়া লাশের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছে। নিজ হাতে মাটিতে চাপা দিয়েছে প্রিয় মানুষদের আর তাই তাদের মানসিক বর্তমান অবস’া প্রতিশোধ, স্বাধীনতা অর্জন করা ছাড়া আর কিছু নয়। স্বজন হারানো কান্না আর জীবনের অধীর বাস্তবতায় একটু শান্তির অপেক্ষায় এই সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো। এখন সুস’ বিনোদনের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি খুবই জরুরি। কিন’ সুস’ বিনোদন তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা হয়ত সম্ভব নয়, তবে প্রায়োগিক নাট্যকলার মাধ্যমে যুক্ত করা সম্ভব। তবে এখানে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য থিয়েটারের কোন পদ্ধতি কিভাবে প্রয়োগ করা যায় তা আবিষ্কার করা জরুরি। (চলবে)