রোহিঙ্গা ইস্যুতে ক্ষতির মুখে পড়বে বিমসটেক

সুপ্রভাত ডেস্ক

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বর্তমান সম্পর্কের উন্নয়ন না হলে সাকের্র মতো ক্ষতির মুখে পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যোগাযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কিছুদিন আগে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, চলমান রোহিঙ্গা সংকটের কারণে দেশ দুটির মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দুই দেশই তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার সুযোগ হারাচ্ছে। এমন অচলাবস’া আরও বেশ কিছুদিন চলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস’াটি।
নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপ চললেও ভারতীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার আপাতত তেমন কোনও সহজ সমাধান দেখা যাচ্ছে না। আর রাজনৈতিক ও অন্যান্য পার্থক্য থাকার পরও দুই দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতা না করলে তা ভারত ও থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতেও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলে বিরূপ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। এজন্য ক্ষেপণাস্ত্র, গ্রেনেড, রকেট লাঞ্চারসহ অন্যান্য অস্ত্র কিনে নিজেদের সশস্ত্র শক্তি বৃদ্ধি করছে মিয়ানমার। বাংলাদেশকে মোকাবিলার লক্ষ্যেই দেশটি এসব অস্ত্র কিনেছে বলেও মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
সমুদ্র সীমানা বিষয়টি মীমাংসার আগে বাংলাদেশ নিজেদের জলসীমাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল। মিয়ানমার সীমান্তে এমন ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সমুদ্র সীমানার বিষয়টি অনেক আন্তরিকভাবে মীমাংসা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিষয়ে কলকাতাভিত্তিক বিশ্লেষক শুভরঞ্জন দাসগুপ্তও এডিবির আশঙ্কার কথাই আবারও সামনে আনেন। বড় ধরনের আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্প ও অন্যান্য নীতিনির্ধারণী উদ্যোগসহ বহুল প্রতীক্ষিত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শুভরঞ্জন বলেন, ‘সংবেদনশীলতা ও যত্নের সঙ্গে সমাধান না করলে রোহিঙ্গা ইস্যুটিই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে অসি’তিশীলতার কারণ হয়ে উঠবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফেরত নিতে হবে। বাংলাদেশ আর তাদের গ্রহণ করবে না। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেওয়া ও রাখাইন রাজ্যে তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত নিতে বাধ্য করতে অবশ্যই কিছু আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আসতে হবে। আর কোনও কিছু হলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
কলকাতার এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কোনও বিস্তৃত চুক্তি না হলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বিমসটেকসহ অন্যান্য প্রস্তাবিত চুক্তি শুধু লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর বিমসটেক চুক্তিও সার্কের মতো গল্পে পরিণত হবে। তাতে শুধু ভিন্ন শিরোনাম যোগ হবে। ’
কাশ্মির বিষয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে মতবিরোধের কারণেই সার্ক দেশগুলোর মধ্যে প্রস্তাবিত আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। এর সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুটির বড় পার্থক্য হলো-বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক মতামত বাংলাদেশের পক্ষে। যদিও চীন বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের নিন্দা জানায়নি। আর মিয়ানমারের রাজনৈতিক উপদেষ্টা অং সান সু চিকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর রাখাইনে ফেরত নিতে পারবেন না। বিষয়টি বাস্তবায়ন করা ভবিষ্যতেও মিয়ানমারের যেকোনও সরকারের পক্ষেই কঠিন হবে।
দাসগুপ্ত মনে করেন, সামনের দিনে চীন ও ভারতের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ একটা গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর উপায় বের করার চেষ্টা করবে। তবে মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খুশি নয়। তারপর থেকে ভারত মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনীতিকভাবে বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, আর বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তবে ভারতের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা বিষয়টির সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে চীনের মধ্যস’তার প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া বাংলাদেশের তেমন কোনও উপায় থাকবে না। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এমন আলোচনা হলে ভারত মোটেও খুশি হবে না।
বিশ্লেষকরা বলেন, বিমসটেক ক্ষতিগ্রস্ত হলে থাইল্যান্ডের ‘লুকওয়েস্ট’ উদ্যোগের কিছু না হলেও, ভারতের লুকইস্ট নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসেতু। ইতোমধ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কিছু প্রশ্ন তোলায় দেশটির মধ্য দিয়ে এডিবি পরিচালিত ভারতের মোহেরা থেকে থাইল্যান্ডের মায়ে সট পর্যন্ত ১৩৬০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ স’গিত হয়ে আছে।
ভারত সড়ক নির্মাণে মিয়ানমারকে সহায়তা করছে। ইতোমধ্যে তামু থেকে কালেওয়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণে এক হাজার ১১৭ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে। এখন তারা মিয়ানমারের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের জন্য অপেক্ষা করছে।
ভারত ও থাইল্যান্ড দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সড়ক যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে কম্বোডিয়া, লাউস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছে। তবে এটাসহ অন্যান্য প্রকল্পের সফলতা মিয়ানমারের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে। তারা প্রকল্পগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেবে, আর বাংলাদেশের সঙ্গে মতবিরোধ কমাতে কী কী উদ্যোগ নেবে সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।