রোল : ২৭

রুমানা নাওয়ার

মহুয়া আপা ক্লাসে ঢুকতেই সব ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে কেউ  সালাম কেউবা সুপ্রভাত বলতে লাগলো। আপা কুশল বিনিময় পর্ব সেরে সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে বসার অনুরোধ জানিয়ে উপসি’তি নিশ্চিত করতে রোল কল করতে শুরু করলো।

ক্রমান্বয়ে ডাকতে ডাকতে সাতাশ এ সাদিয়া সুলতানা ডাকতেই সব ছাত্রীরা হৈচৈ করে উঠলো।

মহুয়া আপা  এটেন্ডেন্স ডাকা বন্ধ করে সবাইকে চুপ থাকতে  বলে বিবি হাফসা নামের ছাত্রীটাকে ডাকে।

সাদিয়ার কি হলো রে? মেয়েটাতো স্কুল কামাই করে না।

আপা সাদিয়াকে নাকি গতকাল স্কুল থেকে যাওয়ার পথে কতগুলো ছেলে কি করছে?

এত ছোট মেয়েটাকে কে কি করবে? কী বলিস?

ওকে জ্বীনে নাকি গলা চেপে ধরছে। তারপর উঠায় নিয়ে গেছে কোথায়। ও নাকি দু চারদিন স্কুলে আসবে না।

এগুলো কী বলো এটা বলে মহুয়া আপা পাঠে মনোনিবেশ করলো। ক্লাস শেষে সবার উদ্দেশে বললো

সাদিয়াকে বলো কাল স্কুলে আসতে।

মহুয়া আপা অনন্যা টিচারের সাথে কথাটা আলাপ করতে পিয়ন তসলিম বলে বসলো আপা বাদ দেন তো ওসব। সাদিয়া মেয়েটা তো পাগল। কি বলতে কি বললো। বাচ্চারা এটা নিয়ে হৈহৈ করছে। তসলিমের কথায় সবাই আশ্বস্ত হলো। যাক কোন বিপদ হয়নি মেয়েটার। একটু উদাসিন খেয়ালি গোছের মেয়েটা। বয়স কতই বা হবে?

তৃতীয় শ্রেণি তে পড়ে এরকম একটা মেয়ের বয়স বড়জোর আট অথবা নয়। সাদিয়ার ও তাই।

মা সাদিয়াকে নিয়ে তার নানার বাড়িতে থাকে। ওর বাবা ওদের খোঁজ নেয় না। আর একটা বিয়ে করেছে তাই সাদিয়ার মা মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেয়।

সাদিয়ার মা মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে। আর মেয়েটাকে স্কুলে পাঠায়। মেয়ে তার পড়াশোনা করে মায়ের দুঃখ যদি দূর করতে পারে। এ আশায় দিন গোনে।

পরদিন মহুয়া আপা ক্লাসে ঢুকতেই সবাই চিৎকার করে ওঠে আপা সাদিয়া আসছে।

মহুয়া আপা যথারীতি ক্লাসের পাঠ চুকিয়ে সাদিয়াকে কাছে ডাকে।

তোমার কি হয়েছে সাদিয়া। গতকাল স্কুলে আসো নাই কেন?

মেয়েটা কথা বলে ভেঙে ভেঙে। পুরো বাক্য একবারে বলতে পারে না।

স্কুল থেকে যাওয়ার পথে গত বৃহস্পতিবারে পুলের ওপর ছয়টা ছেলে আমাকে হাত ধরে টানাটানি করছে।

ছেলেগুলোকে তুমি চেনো?

হমম আপা চিনি।

কে কে ছিলো নাম বলতে পারবা?

আমাদের বাড়ির তিনজনকে চিনি। সাব্বির ভাইয়া নিয়াজ মামা সোহেল ভাইয়া।

আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার জায়গায় গিয়ে বসো।

মহুয়া আপা আর কিছু জিঙেস না করে ক্লাস শেষ করলো একটানে। তার ভিতর তখন হাঁতুড়ি পেটার শব্দ।

নানা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ভোঁ ভোঁ করে।

টিফিন পিরিয়ডে সাদিয়াকে ডাকলো আপা। সবাই তখন মাঠে আর কেউবা টিফিন খাওয়াতে ব্যস্ত। ফাঁকা একটা ক্লাস রুমে সাদিয়াকে নিয়ে বসালো। কীভাবে শুরু করবে বুঝতে পারলো না মহুয়া আপা। এসব পরিসি’তিতে আর পড়েনি তো আপা। কোনো ভনিতা না করে মায়াময় কণ্ঠে জিঙেস করলো ছেলেগুলো তোমাকে আদর টাদর করছে।

হমমমম করছে। আমায় টেনে টেনে একটা দেয়ালের পাশে নিয়ে গেছে।

তারপর?

আমার প্যান্ট জামা খুলে সবাই কী জানি একটা করলো। আমি চিৎকার করে কাঁদলে মুখ চেপে ধরে রাখে।

শেষে একজন ফোনে কথা বলতে গেলে আমি পালিয়ে চলে আসি। বাড়িতে মায়েরে বলতে গেলে আমার মামী শুনে ফেলে। তারপর পুরো বাড়ির সবাই মা রে অনেক কথা বলে। মা য় আমার খালি কাঁদে আমার মায় আমাকে বলছে সেগুলো কাউকে না বলতে।

আপা আপনি কাউকে বলিয়েন না যেন।

চোখ ফেটে কান্না আসে মহুয়ার। মেয়েটাকে বুকে টেনে নেয় পরম মমতায়। একধরনের কষ্ট অনুভব করেন বুকের কাছে।

কিছুই কি করার নেই মহুয়ার?

এ অবুঝ মেয়েটির সাথে যা করা হলো তা কি জেনেও নীরবে মেনে নেবে মহুয়া?

মহুয়ার ভিতর থেকে একধরনের তাড়না অনুভব হলো। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ভুলতে পারলো না সাদিয়াকে। সারারাত পায়চারী করে কাটালো। ঘুম আসলো না একটুও। বুকটায় পাথরচাপা কষ্ট। কী করবে কী করতে পারে এসব ভাবতে ভাবতে কখন সকাল হয়ে গেলো টেরই পেলোনা মহুয়া।

পাখিদের কিচিরমিচির আর সুবেহ সাদেকের নূরানি আলোয় চারিদিক ফর্সা হতে চললো। মুয়াজ্জিন সুললিত কণ্ঠে আল্লাহু আকবর বলে সুর তুললো এলাকার মসজিদটায়। মহুয়া আর বিছানায় থাকতে পারলো না। শেষ রাতের দিকে একটু তন্দ্রার মতো এসেছিল আযানের সুরে ভেঙে গেলো তা। আস্তে আস্তে বিছানা ছাড়লো। জানালার পর্দা সরিয়ে আলোর ভোরটাকে দেখলো। বাতাসটা ও কি শান্তিময়। গা জুড়িয়ে দিলো  পরশে। বাবা বলতো ফজরের সময় যে বাতাস বয় তা নূরানি বাতাস। ফেরেশতারা তখন নেমে আসে দুনিয়ায়। এ বাতাসটা গায়ে মাখলে অসুখ বিসুখ রোগ বালাই কম হয়। মনটাও পুত পবিত্র হয়ে যায়। হঠাৎ করে বাবাকে মনে পড়ায় মহুয়ার মনটা বেদনায় মূষড়ে পড়লো।

বাবা আমার ঘর বাহির দাপিয়ে বেড়ানো বাবা। সারাজীবন এত পরিশ্রম করে যাওয়া মানুষটা আর কিছুকাল বেঁচে থাকলে কি হতো?

বাবার স্মৃতিতে বুকটা ভার হয়ে আছে।

জানালার কাছ থেকে সরে আসলো মহুয়া। হকার আর ফেরিওয়ালার ডাকে সকাল তখন মুখরতায়। বুয়া এসে চা বসালো রুটি বানালো। ঘর ঝাঁট বিছানা পত্তর গোছাতে লেগে গেলো। মহুয়াকে বললো টেবিলে আপনের নাস্তা দিয়া রাখছি। খাইয়া নেন। রুটি ভাজি ঠান্ডা হইয়া গেলে খেয়ে মজা পাইবেন না। আমি বাসি কাপড়গুলো ধুইয়ে ফেলি ততক্ষণে।

মহুয়া আয়নার সামনে দাঁড়ালো  খানিক খাওয়ার টেবিলে যাওয়ার আগ মূহূর্তে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে অনেককাল আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো মহুয়ার।

সাত আট বছরের একটা ফ্রক পরা মেয়ে খেলছিলো কানামাছি খেলা। সমবয়সী বন্ধুদের সাথে। বিকালের আলো মরে যাওয়া সময়। আঁধার ঘনিয়ে আসছিলো অল্প বিস্তর। চোখ বাঁধা হলো ফ্রক পরা মেয়েটির। পালা এসেছিলো তার। সবাই এদিক ওদিক দৌড়ে পালালো। ধরা পড়ার ভয়ে। মেয়েটি খুঁজতে লাগলো হাতরিয়ে হাতরিয়ে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলো হঠাৎ একজনকে। আনন্দ চিৎকার দিয়ে চোখ থেকে বাঁধন খুলতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। চিৎকার করার আগেই মুখ চেপে ধরলো ভূতসদৃশ মানুষটি। খড়ের গাদার আড়ালে নিয়ে প্রজাপতি মেয়েটার রঙিন পাখনাগুলো ভেঙে দিলো দৈত্য। মেয়েটি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো। এ কথা কাউকে বলতে পারেনি সেদিনের ছোট্ট মেয়েটি। কিছুটা লজ্জায় কিছুটা ঘৃণায়।

দীর্ঘ পঁচিশ বছর মহুয়া এ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। ভুলে যেতে চাইলেও ভুলতে পারে না। মহুয়ার স্বৃতিতে সে দৈত্যকায় পুরুষটি। স্বপনে জাগরণে তাড়া করে তাকে। সাদিয়ার জন্য আবার মনটা কেমন করে উঠলো ।

মেয়েটির জন্য কিছু করতে পারলে একটু সান্ত্বনা মিলবে মহুয়ার। স্কুলে গিয়ে এলাকার গণ্যমান্য সবাইকে ডাকলো। ম্যানেজিং কমিটির লোকসহ। সাদিয়ার পুরো ব্যাপারটা বললো তাদের। এরকম বাচ্চা মেয়েও যেখানে নিরাপদ নয় সেখানে শিক্ষার আলোয় আলোকময় কীভাবে হবে অত্র অঞ্চল। প্রশ্ন রাখলো মহুয়া সবার উদ্দেশে। মুরব্বী এবং নেতা গোছের কিছু মানুষ খুবই জোরালো বক্তব্য রাখলো। মহুয়ার খুবই ভালো লাগলো তাদের কথা শুনে। এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় এনে জরিমানা ধার্য করা হলো।

সবকিছুই ঠিকঠাক মতো সম্পন্ন হলো। শাস্তিও পেলো দোষীরা। কিন’ এর কিছুদিন পর হঠাৎ করে মহুয়ার বদলির আদেশ হলো। অনিয়ম এবং দূর্নীতির অভিযোগে শাস্তিমূলক ট্রান্সফার দেয়া হলো অনেক দূরে। যার জন্য মহুয়া কখনো প্রস্তুত ছিলো না। তবুও মন খারাপ বা দুঃখ পেলো না একটু। একটা ভালো কাজের একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ তো করে যেতে পারলো এ ভেবে। মহুয়া একটা স্বস্তির হাসি দিলো বিজয়ের আনন্দে।