রোধ হচ্ছে না প্রশ্ন ফাঁস সঠিক উপায় বের করতে হবে

এফ এম ফৌজি চৌধুরী

প্রশ্ন ফাঁস কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। এবার এসএসসির শুরুতেই লাগাতার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রশ্ন ফাঁস কেন হয় এর উত্তর কিন’ আমাদের জানা। যারা প্রশ্ন ফাঁস করে তাদের কেউ কেউ ধরাও পড়ে বলে জেনেছি। ওদের সাজা কি হয়? কেন হয় না? আইন প্রয়োগ হয় না বলেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে তো ঘটছেই । রোধ করা যাচ্ছে না।
প্রশ্ন পত্র ফাঁস নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলো কেন? সংশ্লিষ্টদের তাবৎ হুঙ্কার আশ্বাস ভবিষ্যদ্বাণী সবটাই যেন অকার্যকর মনে হচ্ছে। সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বার বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠছে।
এতে আমরাই লজ্জা পাচ্ছি। সংশ্লিষ্টরা লজ্জিত কি না তাই এখন প্রশ্ন? বাজে একটি ঘটনা বার বার ঘটছে তাও আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে এটা কি করে সম্ভব? সংশ্লিষ্টরা কি না দেখার ভান করছেন? সবাই জানে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে।
পরীক্ষার্থী, অভিভাবকরাও বলছেন, যে প্রশ্ন তারা অনলাইনে পেয়েছে তার সঙ্গে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নে পুরোপুরি মিলও আছে। সবাই দেখছেন, জানছেন কিন’ কর্তৃপক্ষ কেন দেখছেন না? প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সংশ্লিষ্টরা এর দায় কেন নিচ্ছেন না? এমনটা চলতে থাকলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস’া ভেঙে পড়বে, শিক্ষার মান বলে কিছু থাকবে না। প্রকৃত শিক্ষিত জাতি থেকে বঞ্চিত হবে দেশ । আর তা দেশের জন্য ভয়ানক একটা সংবাদ।
যে কোনো কারণেই হোক না কেন, যদি শিক্ষা পরিসি’তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। আর তা নিরসনের কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, নানামুখী পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ গ্রহণের পরও যখন প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি রোধ করা যাচ্ছে না, তখন নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সৃষ্ট এই পরিসি’তি এক গভীর সংকটকেই স্পষ্ট করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা এবং তদন্ত কমিটির কাজ শুরুর মধ্যেই ইংরেজি প্রথম পত্র ও গণিত প্রশ্নও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার তথ্য এসেছে।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায় বৃহস্পতিবার বাংলা প্রথমপত্র ২৪ মিনিট আগে এবং শনিবার বাংলা দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্ন ফাঁস হয় পরীক্ষার ৪৫ মিনিট আগে। এসব প্রশ্ন বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষণীয় যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কড়াকড়িতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা ভিন্ন কৌশলে প্রশ্ন দিচ্ছে এমন বিষয়ই সামনে এসেছে। আমরা বলতে চাই, যখন আবারো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে এবং ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা- তখন পরিসি’তি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস’া গ্রহণের বিকল্প নেই। আমলে নেয়া দরকার, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় উদ্বিগ্ন অভিভাকরাও।
কেননা, নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেও প্রশ্ন ফাঁসে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাসহ চাকুরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিজ্ঞাপন আকারে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ থেকে প্রচার করা হচ্ছে বলেও জানা যায়। এমনকি নিদিষ্ট মোবাইল ফোন নম্বরও দেয়া হচ্ছে।
তারপরও ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরতে প্রশাসন ব্যর্থ হচ্ছে কেন? এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে। অভিভাবকরা এমনটিও বলছেন যে, যদি এভাবে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ না করা যায় তাহলে পরীক্ষা আয়োজন করে কী লাভ। আমরা মনে করি, সার্বিকভাবে এই বাস্তবতাকে অনুধাবন করে দ্রুত প্রশ্ন ফাঁস রোধে উপায় বের করতেই হবে।
বলাই বাহুল্য, প্রশ্ন ফাঁসসংক্রান্ত সামগ্রিক যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তা কোনোভাবেই স্বস্তিকর নয় বরং একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছেই, যে পরিসি’তির নিরসন অপরিহার্য। সংশ্লিষ্টদের আমলে নেয়া দরকার, প্রশ্ন ফাঁস হলে, যারা সারা বছরে লেখাপড়া করে তাদের চেয়েও প্রশ্ন পাওয়া শিক্ষার্থীরা ভালো পরীক্ষা দেয়-আর এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় বলেও অভিভাবকদের মধ্যে আশঙ্কা কাজ করছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস শিক্ষাব্যবস’ার ক্ষেত্রে এমন এক অধ্যায়কে সামনে আনছে যার প্রভাব অত্যন্ত ভয়ানক। দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহামারীতে আক্রান্ত সব স্তরের পাবলিক পরীক্ষা, স্কুল-কলেজের বার্ষিক পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা এবং চাকরির পরীক্ষা । একটি দেশে যদি এইরূপ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটতে থাকে তবে তা কী ধরনের বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তা বিবেচনা করা জরুরি।
অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁস দিবালোকের মতো সত্য হলেও জাতির মেরুদণ্ডঘাতী এ ব্যাধি রোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেও তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। আমরা মনে করি, প্রশ্ন ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনা যখন একের পর এক ঘটেই চলেছে- তখন তা নিরসনে সামগ্রিক পরিসি’তি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে যে কোনো মূল্যে উপায় বের করতে হবে।
ভুলে যাওয়া যাবে না, এই পরিসি’তি রোধ না হলে পুরো শিক্ষাব্যবস’ার মানই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
কোচিং ও প্রশ্ন ফাঁসের এই সর্বনাশা খেলাই পুরো শিক্ষা ব্যবস’াকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত করে তুলেছে। এই কারণে প্রকৃত মেধা, সৃজনশীলতার বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে। কোচিং বাণিজ্য, গাইড বই, প্রশ্ন ফাঁস প্রভৃতির ভয়াল থাবা সুদূর শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল অবধি বিস্তৃত। এতে শহর আর গ্রাম সর্বত্রই শিক্ষায় বিপর্যয়, মেধা মননের বিপর্যয়কে প্রতিহত করে প্রকৃত মেধার বিকাশের ক্ষেত্রে অনৈতিকভাবে সর্বনাশা এই সব প্রবণতা অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দুষ্ট ক্ষত নিয়েই বেড়ে উঠছে।
সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, প্রশ্ন ফাঁসসংক্রান্ত পরিসি’তি থেকে দ্রুত বের হতে না পারলে ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস’ার জন্য তা হবে অশনিসংকেত। প্রশ্ন ফাঁসের এ প্রবণতা রোধ না হলে কেউ কেউ সহজেই বৈতরণী পার হবে, মেধাবী না হয়েও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে, চাকরির জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে- আর এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সত্যিকারের মেধাবীরা বঞ্চিত হবে, তা কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়।
সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন ফাঁসসংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখে সৃষ্ট পরিসি’তি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সামগ্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, এমনটি আমাদের প্রত্যাশা। প্রশ্ন ফাঁসের ফলে একটি নীতিহীন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এটা আর চলতে দেয়া যায় না। এটা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তিনিশ্চিত করা জরুরি।