রোকেয়ার আলো এবং আমাদের আলো-অন্ধকার

আবুল মোমেন

বাংলাদেশে গত পঁচিশ বছরের মধ্যে চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অসম মেয়াদের মোট চার বছর ব্যতীত বাকি একুশ বছর ধরে সরকার-প্রধান নারী। আর বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, প্রধান বিরোধী দলের নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদের উপনেতা ইত্যাদি রাষ্ট্রের অনেকগুলো শীর্ষ পদে নারীরাই অধিষ্ঠিত। উত্তরোত্তর ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে রাষ্ট্রের প্রায় সর্বময় নির্বাহী ক্ষমতা পুঞ্জিভূত হয়ে পড়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সাতজন সচিব, পুলিশের অতিরিক্ত মহা পরিদর্শক, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক, দুটি পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাষ্ট্রদূত প্রমুখের কথা বলা যায়। একে কি সুলতানার স্বপ্ন বাস্তবায়নের আলামত বলা যায়? বিষয়টা বুঝে দেখা দরকার।
মানুষের মুক্তির নিদান শিক্ষা – এ কথা রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন তেমনি নারীর মুক্তির উপায় হিসেবে রোকেয়াও ভেবেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘শিক্ষা বিস্তারই এইসব অত্যাচার নিবারণের একমাত্র মহৌষধ! অন্ততপক্ষে বালিকাদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দিতেই হইবে। শিক্ষা অর্থে আমি সুশিক্ষার কথা বলি; গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দু’ছত্র কবিতা লিখিতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষা – যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে, তাহাদিগকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং আদর্শ মাতা রূপে গঠিত করিবে।’
তিনি সঠিকভাবেই জানেন নারী কেন স্বাধীনতার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে শিক্ষার অভাবে। নারীর এই বঞ্চনা ও অযোগ্যতা এবং সে কারণে স্বাধীনতা হারানোর জন্যে তিনি দায়ি করেছেন ‘অদূরদর্শী পুরুষের ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার’ বাসনাকে।
পুরুষের এই স্বার্থচিন্তার অবসান চান রোকেয়া। কেননা তিনি তো চান নারী-পুরুষের সমতা। সুলতানার একচ্ছত্র নারী আধিপত্যের জগতে ভালোভাবে উঁকি দিলে আমরা দেখতে পাব রোকেয়া বাস্তব পৃথিবীতে নারীর অবমাননা ও নিগ্রহের জন্যে পুরুষের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থায় যাননি। এ কল্প-জগতের পুরুষ, গবেষক সুদক্ষিণা ঘোষের মতে, ‘নারীর কাছে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেনি, শত্রু হয়ে ওঠেনি, বরং হয়েছে রক্ষণযোগ্য, কারণ সেই পুরুষেরা নিজেদের ক্ষুধা ও লোভ সংবরণে অক্ষম।’ না বাস্তব বিশ্বের ‘পুরুষেরই লোভ-দ্বন্দ্ব ঘেরা পৃথিবীর একটা নারীশাসিত প্রতিরূপ নয় রোকেয়ার ষধফু ষধহফ, রোকেয়া সেখানে গড়েছেন নারী পুরুষের মিলিত বাসভূমি, শুধু যোগ্যতা অনুযায়ী বিভাজন করে নিয়েছেন কাজের সীমানা আর পরিসর।’
যাহোক একবার একালের প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়ার শিক্ষাব্রত এবং নারীমুক্তির সাধনা কতটা সফল হয়েছে তা বিচার করে দেখা যায়। তাঁর কাম্য ছিল মুক্তির জন্যে মেয়েদের অন্তত প্রাথমিক পর্যন্ত বিদ্যাচর্চা করতে হবে। পরিসংখ্যান বলে আজ বাংলাদেশে প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শত ভাগ – সম্ভবত এখন তা শতকরা ৯৭। বেগম রোকেয়ার আমলে মুসলিম জনসংখ্যার ক্ষেত্রে এ হার ছিল অতি নগণ্য। আশি বছরে এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, যদিও প্রাথমিকের সমাপনী পর্যায়ে পৌঁছাবার মধ্যেই ঝরে পড়ার হার কম নয় – কুড়ি-একুশ ভাগ, এবং এদের বেশির ভাগই মেয়েশিশু। তদুপরি এই শিক্ষার মান নিয়ে অত্যন্ত সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে। তবে নারীমুক্তির সাথে অন্য যেসব আর্থিক ও সামাজিক সূচকে অগ্রগতির সম্পর্ক গভীর সেগুলোর খবর কিন্তু বেশ ভালো। যদিও রোকেয়ার বিয়ে হয়েছিল ষোল বছর বয়সে, মতান্তরে আঠারো বছরে, কিন্তু সেকালে বারো তেরো বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়াই ছিল দস্তুর। আজ আইন অনুযায়ী আঠারো বছর পর্যন্ত ওরা শিশু এবং এর আগে বিয়ে করা বা বিয়ে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অবশ্য রোকেয়ার কাম্য ছিল একুশ বছর হোক বিয়ের বয়স। বাস্তবতায় এখনও আঠারো বছরই টিকিয়ে রাখা কঠিন – দেখা যাচ্ছে সমাজ ও সরকার উভয়েই বিয়ের বয়স ষোলতে নামানোর ফন্দি-ফিকির একেবারে বন্ধ করেনি। আজ মেয়েদের প্রথম সন্তান ধারণের বয়সও অনুপাতে বেড়েছে, দাম্পত্য জীবনে সন্তান ধারণের সংখ্যা কমেছে। প্রসবকালীন পরিচর্যার সুযোগ বেড়েছে, সন্তান ধারণের সংখ্যা ও সময় নির্ধারণে নিজস্ব সিদ্ধান্তে চলার সুযোগ কিছুটা হলেও বেড়েছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, গর্ভকালীন অপুষ্টি ও পরিচর্যা ও চিকিৎসা-সহায়তাহীন ভোগান্তির ভবিতব্য কমে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা পেশাজীবী এবং উপার্জনশীল নারীর সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়েছে। শিক্ষার কোনো কোনো স্তরে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে সংখ্যায় এবং ফলাফলে এগিয়ে আছে। ইদানীং কোনো কোনো বছর কয়েকটি বোর্ডে প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি দুটিতেই মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ছেলেদের চেয়ে বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত পাঁচ বছরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করে যারা ডিন পদক লাভ করেছে তাদের মধ্যে মেয়েরা অধিক সংখ্যায় জায়গা করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে তিনটি ক্ষেত্রের অবদান সবচেয়ে বেশি, যথা – তৈরি পোশাক. কৃষি ও বিদেশের শ্রমবাজার, তার মধ্যে প্রথমটিতে নারীরাই সিংহভাগ কর্মী, দ্বিতীয়টিতে তাদের ভূমিকা প্রায় পুরুষের সমকক্ষ আর তৃতীয়টিতে ক্রমেই তাদের জন্যেও চাহিদা তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে।
কর্মক্ষেত্রে নারীর ভোগান্তির কথা জেনেও বলব এই পরিবর্তনগুলো নিঃসন্দেহে বেগম রোকেয়াকে স্বস্তি দিত, তবে পুরুষের তুলনায় নারীর মজুরি কম হওয়া নিয়ে তাঁর আফশোস একালেও ঘুচত না। অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষেত্রে এই যে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটছে তাতে যারা সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বা যারা উপকৃত হচ্ছে তারা সম্ভবত বেগম রোকেয়ার বাণীর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। বাস্তব ও বৈষয়িক এসব উন্নয়ন রোকেয়া যে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সে পথে এগুনোর ভিত্তি হিসেবে নিশ্চয় কাজ করবে। হয়ত তখনও রোকেয়া তাদের অপরিচিতাই থেকে যাবেন।
বছর পনের আগে এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রদত্ত নারীর অধিকার বিষয়ক একটি বক্তৃতায় নারীর জীবনের ছয়টি শৃঙ্খলের কথা বলেছিলাম সবিস্তারে। এখানে তার উল্লেখমাত্র করি- জৈবিক বা যৌন শৃঙ্খল, পরিবার, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র। প্রথম শৃঙ্খলটি যেহেতু জৈবিক তাই এতে সমতা প্রতিষ্ঠা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হবে না, সচেষ্ট প্রয়াসের প্রয়োজন হবে, বিশেষত পুরুষের দিক থেকে। কিন্তু বাকি শৃঙ্খলসমূহ তৈরিতে পুরুষের সক্রিয় ভূমিকা ছিল, এবং তা তো এখনও বজায় রয়েছে। এঙ্গেলস-এর একটি উদ্ধৃতি বিষয়টা বুঝতে সহায়তা করবে। তিনি লিখেছেন – men took command in the home also; the woman was degraded and reduced to servitude; she became the slave of his lust and a mere instrument for the production of children. এঙ্গেলস এও লক্ষ্য করেছেন বিবাহে নারীর অপর ভূমিকা হল সম্পদ হিসেবে, যার ওপর পুরুষের আধিপত্য এখনও একচেটিয়াভাবে অক্ষুণ্ন। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেত্রী নারী, সরকারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী নারী হওয়া সত্ত্বেও আমরা টের পাই নারীর ওপর কার্যকর সনাতন শৃঙ্খলগুলো কিছুতেই আলগা হয় না। সিডো সনদ পূর্ণাঙ্গ পাশ করতে কিংবা ১৯৯৭ সনে গৃহীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়নে, পারিবারিক আইন সংস্কারে, নারী নির্যাতন মামলার বিচার ও নিষ্পত্তিতে রাজনৈতিক সামাজিক ধর্মীয় নানান রকমের প্রতিবন্ধক আমরা আজও বহাল দেখতে পাই।
বেগম রোকেয়া পুরুষ ও নারীর সমঝোতায় একটি উদার সমাজের কথা ভেবেছেন। তিনি ধর্মেরও উদার মানবিক রূপটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। আধুনিক নারীবাদী লেখিকা জুলিয়া আনাস সনাতন ও উদারবাদী সমাজের পার্থক্য দেখিয়ে লিখেছেন – A society is traditional if the fact of having two norms for the likes of men and women produces a strongly enforced actual divisions of activities and living ; it is liberal if this division of actual activities is weakly enforced.
রোকেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে আমাদের সমাজকে সনাতন মানসিকতা নারী-পুরুষ বিভাজনের বৃত্ত থেকে মুক্ত করে উদার মানবতার সমন্বিত ধারায় আনতে হবে। সনাতন সমাজে নারীর কিছু পরিণতি প্রায় সর্বাংশে নির্ধারিত – বিবাহ, মাতৃত্ব তো বটেই এমনকি চাকুরি বা পেশার ক্ষেত্রেও তার নিয়তি যেন কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাঁধা। তার জন্যে পোশাক, চলাফেরা, আচরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে শালীনতার ধর্মশাসিত বিধান প্রযোজ্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা নারীর স্বাধীন অভিপ্রায় উপেক্ষিত থাকছে। শালীনতার দাবি সাংস্কৃতিকভাবে সমতাভিত্তিক সমমর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু তার ব্যাখ্যায় পুরুষের একচ্ছত্র অভিপ্রায় ও বিধান কিংবা ধর্মের দোহাই তার অধিকারকে নিশ্চিতভাবে ক্ষুণ্ন করে। রোকেয়ার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন তখনই যথার্থ হবে যখন আমরা সমতার ভিত্তিতে একটি উদার মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।